ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয়কে ঘিরে নানা ধরনের অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। কাকরাইল ভিআইপি রোডসহ আশপাশের এলাকায় চলমান ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজে ধীরগতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানোর মতো নানা অভিযোগ এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে ঘুরছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং নাগরিকরা অভিযোগ জানাতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে নগরবাসীর প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া দূরের কথা, বরং নানা অনিয়মের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয়কে প্রায়ই অফিসে পাওয়া যায় না। বহুবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেন না বা সাড়া দেন না। অনেক নাগরিক ও ব্যবসায়ী অভিযোগ নিয়ে তার অফিসে গেলেও তাকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। এতে করে ড্রেনেজ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের বিষয়ে অভিযোগ বা সমস্যা সরাসরি জানানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি, দায়িত্বশীল একটি পদে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন অনুপস্থিতি এবং যোগাযোগহীনতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে।
ঢাকার শান্তিনগর ও কাকরাইল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই এসব এলাকায় পানি জমে রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিশেষ ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের আওতায় ভিআইপি রোডসহ আশপাশের এলাকায় ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইন সংস্কারের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কাজের ধীরগতি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবে প্রকল্পটি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।
কাকরাইল ভিআইপি রোডে চলমান ড্রেনেজ নির্মাণকাজে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ড্রেন নির্মাণে পর্যাপ্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে না এবং নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢালাইয়ের পর সঠিকভাবে কিউরিং করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন নির্মিত ড্রেন কতদিন টিকবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি নির্মাণমান নিয়ে এত অভিযোগ ওঠে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব ড্রেন নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, অনেক সময় রাতের অন্ধকারে পানি ও কাদার মধ্যেই ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছে। এতে নির্মাণের গুণগত মান আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৌশল নীতিমালা অনুযায়ী এমন পরিবেশে ঢালাই করা উচিত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব অনিয়মের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিও স্থানীয়দের ক্ষোভের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় রাস্তা কেটে ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু করা হলেও মাসের পর মাস কাজ শেষ করা হচ্ছে না। এতে করে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব গর্তের কারণে যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে এবং পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দোকানের সামনে রাস্তা কেটে রাখায় ক্রেতাদের আসা-যাওয়া কমে গেছে বলে অভিযোগ করছেন অনেক ব্যবসায়ী।
বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। খোঁড়াখুঁড়ি করা জায়গাগুলোতে পানি জমে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। অনেক সময় পথচারীরা গর্তে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরু করার সময় যদি সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি থাকত, তাহলে এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ ফেলে রাখা হতো না এবং মানুষের দুর্ভোগও কম হতো।
এদিকে বড় বাজেটের ড্রেনেজ ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ঘিরে অর্থ আত্মসাৎ ও বিল জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে। জানা গেছে, বড় অঙ্কের প্রকল্পগুলোতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, দরপত্রে অনিয়ম এবং কাজের প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের মতো নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কয়েকশ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন জোনে ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নতুন টেন্ডার আহ্বান করে। এসব কাজ সাধারণত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্যাকেজে ভাগ করে দেওয়া হয়। বড় প্রকল্পে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার প্রায় নিয়মিতই এসব কাজ পাচ্ছেন। এমনকি কালো তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদার নাম পরিবর্তন করে আবার কাজ পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকল্পের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কাজও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও সঠিক নকশা ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোথাও ড্রেনের প্রস্থ কম হচ্ছে, কোথাও আবার গভীরতা ঠিক রাখা হচ্ছে না। এতে করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। শুধুমাত্র খণ্ডিতভাবে কাজ করলে বা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। তারা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ তদারকি এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে চলমান কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এর সুফল জনগণ পাবে। কিন্তু যদি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ ওঠে এবং সেগুলোর সঠিক তদন্ত না হয়, তাহলে জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব অভিযোগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয়কে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
নগরবাসীর আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন প্রকৃত অর্থেই জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন শান্তিনগর ও কাকরাইল এলাকার মানুষের।
সংবাদ শিরোনাম ::
কাকরাইল ড্রেনেজ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ
ডিএসসিসির প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয়কে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৮:৩০:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
- ৫০৫ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

























