রমজান এলেই আলো-উৎসবের যে আবহ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে, তার জীবন্ত রূপ দেখা যায় কায়রোর পুরোনো শহরে। সরু গলি, ব্যস্ত হাটবাজার আর শতাব্দী প্রাচীন কারিগরদের হাতে গড়া রঙিন ফানুসে ভরে ওঠে নগরীর আকাশ। ফাতেমীয় যুগ থেকে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও রমজানের আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রমজান মাস উদযাপন ও রমজানের প্রস্তুতিতে কায়রোর পুরোনো শহরের কোনো তুলনা নেই। একেকটি গলি ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে উৎসবের নানা দৃশ্য। কেউ বাড়ি বা দোকানের সামনে বসে লোহা কিংবা তামা দিয়ে ফানুসের কাঠামো বানাচ্ছেন, কোথাও নারীরা একসঙ্গে বসে কাপড়ের খাপ সেলাই করছেন, শিশুরা ব্যস্ত ফানুসে বাল্ব লাগাতে।

বাজারজুড়ে রমজানের গল্প ছড়িয়ে আছে নানা রূপে। কোথাও ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে লেখা বার্তা, কোথাও গ্রামবাংলার আবহে রমজান বরণের চিত্র। গুরিয়ার আল-শামা প্রাচীন এলাকায় আধুনিক নকশার মোমবাতির ঝলকানি জানান দেয়, পুরো এলাকা রমজানের অপেক্ষায়।
কায়রোর ঐতিহাসিক মোমবাতির বাজার বা সুক আল-শামাইন-এর ইতিহাস ফাতেমীয় যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। তখন বাব জুয়াইলার আশপাশে গড়ে ওঠে মোমবাতি তৈরির বিশেষ বাজার। রাস্তাঘাট, অভিজাতদের প্রাসাদ আলোকিত করতে মোমবাতিই ছিল প্রধান ভরসা। রমজান ও ঈদের সময় বিশাল আকারের মোমবাতি ও ফানুসের শোভাযাত্রা বের হতো, যা পুরো মাসজুড়ে নগর আলোকিত রাখত।
পরবর্তীকালে আইয়ুবি ও মামলুক যুগেও এই ঐতিহ্য অব্যাহত ছিল। ইতিহাসবিদ মাকরিজি তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, রমজানের চাঁদ দেখার রাত থেকেই তারাবির নামাজে বড় বড় মোমবাতি জ্বালানোর রেওয়াজ ছিল মিসরে।
সময়ের পরিবর্তনে ও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার ফলে মোমবাতির বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান টিকে আছে। তবে ইতিহাস পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আজও বাব জুয়াইলার পাশে নাফিসা আল-বাইদা নামের একটি দোকান সেই ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করছে।

এই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মোমবাতি বিক্রি করেন মোহাম্মদ নামে একজন।কেউ খোঁজেন ফানুসের ভেতর বসানোর মোমবাতি, কেউ চান মামলুকি নকশার ফানুস, আবার কেউ খুঁজেন আধুনিক ধাঁচের ফানুস। স্থানীয়রা মজা করে আইকিয়া ফানুস বলেন এসবকে।
মোহাম্মদ জানান, শপিং মলে যেসব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোমবাতি চড়া দামে বিক্রি হয়, সেগুলোর অনেকটাই এখানেই তৈরি হয়, কিন্তু দাম থাকে তার দশ ভাগের এক ভাগ।
রমজানের জন্য এখন ছোট বৈদ্যুতিক মোমবাতিরও চাহিদা বেড়েছে। এগুলো তাপ ছাড়াই মোমবাতির মতো আলো দেয়, ফলে পুরোনো ধাঁচের ফানুস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
রমজানের ফানুস শুধু ব্যবসা নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। পরিবারগুলো রবিউল আউয়াল থেকেই প্রস্তুতি নেয়, রজব মাসে অর্ডার সরবরাহ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই শিল্পে নতুন গতি এনেছে। অনেক নারী ফানুস কিনে ঘরে সাজিয়ে অনলাইনে বিক্রি করছেন। কায়রোর অলিগলিতে ফানুসের এই আলো শুধু রমজানের সাজ নয়, শতাব্দীজুড়ে বয়ে চলা ইতিহাস ও আনন্দের প্রতীক।
ধর্ম ডেস্ক 

























