ঢাকা ০৪:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির জনজীবন, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ প্রেমিককে কুপিয়ে জখম, ক্ষোভে প্রেমিকার চাচা-ফুফুর বাড়িতে আগুন আফতাব নগরে সাব রেজিস্ট্রার মাইকেলের ২৯ ফ্ল্যাট! ভৈরব থেকে নিখোঁজ কিশোর রামিম সন্ধান চায় পরিবার টংঙ্গী মুজিব নগর সাবরেজিস্টার আবু হেনা মোস্তফা কামাল এর বিরুদ্ধে ঘুষ দুনীতির সমাচার ঢাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা : শিক্ষক কারাগারে বোরহানউদ্দিনে মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী আটক গোপালগঞ্জে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচন উপলক্ষে সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত ৭ বিভাগে কালবৈশাখি ঝড়ের আভাস নওগাঁয় কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু

নাজির তামজিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিস দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, ভূপত্র উত্তোলন কিংবা ভূমি সংক্রান্ত নানাবিধ আইনি সেবার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ভূমি অফিসকে ঘিরে জনমনে যে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন অফিসের নাজির তামজিদুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়দের কাছে তামজিদ নামেই বেশি পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখার একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে কার্যত কোনো কাজই তামজিদুল ইসলামের অনুমতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। সরকারি নির্ধারিত ফি থাকলেও বাস্তবে আবেদনকারীদের কাছ থেকে তার ইচ্ছামতো অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এই অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়, নানা অজুহাতে আবেদন ফেরত দেওয়া হয় কিংবা আবেদনকারীদের বারবার অফিসে ঘুরতে বাধ্য করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, তিনি বছরে খুব বেশি বার ভূমি অফিসে যান না। কিন্তু প্রতিবারই তাকে নাজির তামজিদের লোকজনের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়—“কিছু খরচ” না করলে কাজ হবে না। তার ভাষায়, এমনকি হাটবাজার সংক্রান্ত ছোটখাটো দরখাস্তও তিন থেকে চারশ টাকা ছাড়া নড়ে না। সরকারি ফি কত, তা কেউ জানতে চাইলেও স্পষ্ট করে বলা হয় না। বরং বলা হয়, “যা বলা হচ্ছে দিয়ে দেন, নইলে ফাইল চলবে না।”

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নামজারি আবেদনের জন্য যেখানে সরকারি ফি তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে তামজিদুল ইসলাম সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ টাকা আদায় করেন। ভূপত্র বা ভিপি আবেদন করতে গেলে দিতে হয় প্রায় ১,০০০ টাকা। কোনো আপত্তি দরখাস্ত দাখিল করতে চাইলে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খতিয়ান অনুমোদনকে ঘিরে, যেখানে নাজির তামজিদুল ইসলাম প্রায় ৬,০০০ টাকা দাবি করেন। জমির পরিমাণ বেশি হলে এই অঙ্ক ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত গড়ায় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি খতিয়ান নেওয়ার সময় ডিসিআর বাবদও ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অনেকে জমি সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে গিয়ে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দালালের আশ্রয় নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন সেবার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূমি অফিস ঘিরে একটি অনিয়মতান্ত্রিক ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তামজিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও কম নয়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি ভূমি অফিসের সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে অফিসের প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। কে কখন অফিসে এলেন, কে কার সঙ্গে কথা বললেন—সবকিছু তার নজরে থাকে। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ আবেদনকারী পর্যন্ত সবাই এক ধরনের মানসিক চাপে থাকেন। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না বলে অভিযোগ।

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ভূমি অফিসে কার্যত “নাজির রাজত্ব” কায়েম হয়েছে। তার কথার বাইরে কেউ যেতে পারে না। এমনকি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলতে চান, তাহলেও তাদের নানাভাবে চাপে রাখা হয়। ফলে অফিসের ভেতরে একটি নীরব আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, তামজিদুল ইসলাম আদালতের ১৪৪ ও ১৪৫ ধারার মামলা সংক্রান্ত বিষয়েও প্রভাব বিস্তার করেন। স্থানীয়দের দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধে তিনি নিজের স্বার্থ কিংবা ঘনিষ্ঠদের স্বার্থ রক্ষায় বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রস্তুত করেন, যা পরবর্তীতে মামলার গতিপথ প্রভাবিত করে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন নয়, তবুও একাধিক ভুক্তভোগী একই ধরনের অভিযোগ করায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

তামজিদুল ইসলামের জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মূল্য প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং তার হাতে থাকা স্মার্টফোনের বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। স্থানীয়দের দাবি, একজন নাজিরের সরকারি বেতন ও ভাতার সঙ্গে এই বিলাসী জীবনযাপন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা মনে করছেন, ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমেই তিনি এই জীবনযাপন করছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ভূমি অফিসে গেলেই মনে হয় আমরা অপরাধী, আর নাজিরই সবকিছুর মালিক। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে তার বিলাসী জীবন চলছে। আমরা শান্তিতে সরকারি সেবা নিতে পারছি না।

এই পরিস্থিতিতে পেকুয়ার একাধিক সচেতন নাগরিক দুদকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে তামজিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করা হয়েছে এবং তদন্ত চলাকালীন তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করারও দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, তিনি পদে বহাল থাকলে সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও বলছেন, শুধু একজন নাজিরের অনিয়ম নয়, এর মাধ্যমে পুরো ভূমি অফিস ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছে, সরকারি অফিস মানেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। এই মানসিকতা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে তারা মনে করেন।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিক অবিচার ও বৈষম্যকেও উসকে দেয়। যাদের টাকা আছে, তারা সহজেই কাজ করিয়ে নিতে পারেন, আর যারা গরিব, তারা ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এতে করে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ বিষয়ে তামজিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভূমি অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, অফিসে কাজ করতে গিয়ে নানা চাপ ও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।

দুদক কিংবা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত শুরুর ঘোষণা না এলেও স্থানীয়দের আশা, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিস একসময় যেখানে সেবার প্রতীক ছিল, আজ সেখানে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তামজিদুল ইসলামকে কেন্দ্র করে ওঠা এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ অপেক্ষায় আছে—আইন ও ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি এই অভিযোগও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির জনজীবন, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ

নাজির তামজিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৬:৪৬:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিস দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, ভূপত্র উত্তোলন কিংবা ভূমি সংক্রান্ত নানাবিধ আইনি সেবার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ভূমি অফিসকে ঘিরে জনমনে যে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন অফিসের নাজির তামজিদুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়দের কাছে তামজিদ নামেই বেশি পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখার একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে কার্যত কোনো কাজই তামজিদুল ইসলামের অনুমতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। সরকারি নির্ধারিত ফি থাকলেও বাস্তবে আবেদনকারীদের কাছ থেকে তার ইচ্ছামতো অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এই অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়, নানা অজুহাতে আবেদন ফেরত দেওয়া হয় কিংবা আবেদনকারীদের বারবার অফিসে ঘুরতে বাধ্য করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, তিনি বছরে খুব বেশি বার ভূমি অফিসে যান না। কিন্তু প্রতিবারই তাকে নাজির তামজিদের লোকজনের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়—“কিছু খরচ” না করলে কাজ হবে না। তার ভাষায়, এমনকি হাটবাজার সংক্রান্ত ছোটখাটো দরখাস্তও তিন থেকে চারশ টাকা ছাড়া নড়ে না। সরকারি ফি কত, তা কেউ জানতে চাইলেও স্পষ্ট করে বলা হয় না। বরং বলা হয়, “যা বলা হচ্ছে দিয়ে দেন, নইলে ফাইল চলবে না।”

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নামজারি আবেদনের জন্য যেখানে সরকারি ফি তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে তামজিদুল ইসলাম সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ টাকা আদায় করেন। ভূপত্র বা ভিপি আবেদন করতে গেলে দিতে হয় প্রায় ১,০০০ টাকা। কোনো আপত্তি দরখাস্ত দাখিল করতে চাইলে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খতিয়ান অনুমোদনকে ঘিরে, যেখানে নাজির তামজিদুল ইসলাম প্রায় ৬,০০০ টাকা দাবি করেন। জমির পরিমাণ বেশি হলে এই অঙ্ক ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত গড়ায় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি খতিয়ান নেওয়ার সময় ডিসিআর বাবদও ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অনেকে জমি সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে গিয়ে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দালালের আশ্রয় নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন সেবার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূমি অফিস ঘিরে একটি অনিয়মতান্ত্রিক ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তামজিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও কম নয়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি ভূমি অফিসের সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে অফিসের প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। কে কখন অফিসে এলেন, কে কার সঙ্গে কথা বললেন—সবকিছু তার নজরে থাকে। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ আবেদনকারী পর্যন্ত সবাই এক ধরনের মানসিক চাপে থাকেন। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না বলে অভিযোগ।

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ভূমি অফিসে কার্যত “নাজির রাজত্ব” কায়েম হয়েছে। তার কথার বাইরে কেউ যেতে পারে না। এমনকি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলতে চান, তাহলেও তাদের নানাভাবে চাপে রাখা হয়। ফলে অফিসের ভেতরে একটি নীরব আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, তামজিদুল ইসলাম আদালতের ১৪৪ ও ১৪৫ ধারার মামলা সংক্রান্ত বিষয়েও প্রভাব বিস্তার করেন। স্থানীয়দের দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধে তিনি নিজের স্বার্থ কিংবা ঘনিষ্ঠদের স্বার্থ রক্ষায় বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রস্তুত করেন, যা পরবর্তীতে মামলার গতিপথ প্রভাবিত করে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন নয়, তবুও একাধিক ভুক্তভোগী একই ধরনের অভিযোগ করায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

তামজিদুল ইসলামের জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মূল্য প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং তার হাতে থাকা স্মার্টফোনের বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। স্থানীয়দের দাবি, একজন নাজিরের সরকারি বেতন ও ভাতার সঙ্গে এই বিলাসী জীবনযাপন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা মনে করছেন, ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমেই তিনি এই জীবনযাপন করছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ভূমি অফিসে গেলেই মনে হয় আমরা অপরাধী, আর নাজিরই সবকিছুর মালিক। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে তার বিলাসী জীবন চলছে। আমরা শান্তিতে সরকারি সেবা নিতে পারছি না।

এই পরিস্থিতিতে পেকুয়ার একাধিক সচেতন নাগরিক দুদকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে তামজিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করা হয়েছে এবং তদন্ত চলাকালীন তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করারও দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, তিনি পদে বহাল থাকলে সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও বলছেন, শুধু একজন নাজিরের অনিয়ম নয়, এর মাধ্যমে পুরো ভূমি অফিস ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছে, সরকারি অফিস মানেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। এই মানসিকতা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে তারা মনে করেন।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিক অবিচার ও বৈষম্যকেও উসকে দেয়। যাদের টাকা আছে, তারা সহজেই কাজ করিয়ে নিতে পারেন, আর যারা গরিব, তারা ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এতে করে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ বিষয়ে তামজিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভূমি অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, অফিসে কাজ করতে গিয়ে নানা চাপ ও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।

দুদক কিংবা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত শুরুর ঘোষণা না এলেও স্থানীয়দের আশা, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিস একসময় যেখানে সেবার প্রতীক ছিল, আজ সেখানে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তামজিদুল ইসলামকে কেন্দ্র করে ওঠা এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ অপেক্ষায় আছে—আইন ও ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি এই অভিযোগও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।