প্রবাসে থাকা স্বামীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের কষ্টার্জিত অর্থ, যা ছিল একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—সেই অর্থই বিশ্বাস করে তুলে দেওয়া হয়েছিল আপন ছোট ভাইয়ের হাতে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই বোনের সর্বস্ব শেষ করে দিয়েছেন তিনি—এমনই অভিযোগ করেছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সুলতানা আক্তার লাখী। জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের কথা বলে একের পর এক কৌশলে বোনের ব্যাংক হিসাব ও নগদ অর্থ মিলিয়ে প্রায় ৭২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে তার ছোট ভাই মো. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো মারধর, প্রাণনাশ ও গুমের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), চাঁদপুর তদন্ত শুরু করলে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী সুলতানা আক্তার লাখী (৪১) হাজীগঞ্জ স্টেশন রোডের জনকল্যাণ ভবনের বাসিন্দা। তার স্বামী মো. সেলিম হোসেন দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে প্রবাসে কর্মরত ছিলেন। প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ তিনি নিয়মিত দেশে পাঠাতেন স্ত্রী লাখীর নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে। স্বামী-স্ত্রীর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিজস্ব জমি কেনা এবং একটি বাড়ি নির্মাণ করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই ঘটে যায় এই প্রতারণার ঘটনা।
পারিবারিক সম্পর্কের কারণে নিজের ছোট ভাই মো. কামাল হোসেনের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখেন সুলতানা আক্তার লাখী। ভাইয়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই তিনি নিজের ব্যাংক হিসাব তদারকি, জমি কেনা এবং বাড়ি নির্মাণের সব দায়িত্ব ভাইয়ের হাতে তুলে দেন। কামাল হোসেনও বোনকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি খুব দ্রুত জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে দেবেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন তো হয়নি বরং ধীরে ধীরে অর্থ আত্মসাতের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মামলার তদন্ত নথি ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত মো. কামাল হোসেন বিভিন্ন সময়ে চেক ব্যবহার করে বোনের এনসিসি ব্যাংক হাজীগঞ্জ শাখা থেকে মোট ৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং সোনালী ব্যাংক হাজীগঞ্জ শাখা থেকে ৩৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের কথা বলে ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি মোট ৪২ লাখ ৫ হাজার টাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এসব উত্তোলনের পক্ষে কোনো বৈধ দলিল, জমি রেজিস্ট্রেশন বা নির্মাণ কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও হাজীগঞ্জ পৌর ভবনের পেছনে একটি দোতলা রেডিমেট বাড়ি কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বোনের কাছ থেকে নগদে আরও ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে অভিযুক্ত কামাল হোসেন বোনের কাছ থেকে মোট ৭২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কোনো জমি কেনা হয়নি, নির্মাণ হয়নি কোনো বাড়িও। বারবার টাকা ও হিসাব চাইলে কামাল হোসেন নানা টালবাহানা শুরু করেন। এক পর্যায়ে টাকা ফেরত চাইতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি টাকা ফেরত চাইলে কামাল হোসেন বোনকে মারধর করেন এবং হত্যা ও গুম করার হুমকি দেন। ভুক্তভোগীর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সেই প্রভাব ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় আরও অভিযোগ করা হয়, চলতি বছরের ১৭ ডিসেম্বর সুলতানা আক্তার লাখীর স্বামী মো. সেলিম হোসেন প্রবাস থেকে দেশে নিজ গ্রামে গেলে অভিযুক্ত কামাল হোসেন তার নেতৃত্বে আরও কয়েকজন লোক নিয়ে তাকে মারধর করেন। শুধু তাই নয়, হাজীগঞ্জ পৌরসভার কিছু লোকজনকে ব্যবহার করে জায়গা বিক্রির নামে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সুলতানা আক্তার লাখী আদালতের শরণাপন্ন হন। তিনি হাজীগঞ্জ আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন, যার নম্বর সি আর মামলা নং– ৭৫/২৫। মামলাটি দায়ের করা হয় ০২/০২/২০২৫ ইং তারিখে। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা), ৫০৬(২) (প্রাণনাশের হুমকি) এবং ১০৯ (সহযোগিতা) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), চাঁদপুরকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআই চাঁদপুরের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি) এস. এম মোস্তাইন হোসেনের নির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে পরিদর্শন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তদন্তে টাকা আত্মসাতের সত্যতা পাওয়া গেছে। এনসিসি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত কামাল হোসেন বিভিন্ন তারিখে চেকের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলন করেছেন। এসব উত্তোলনের সঙ্গে জমি ক্রয় বা নির্মাণসংক্রান্ত কোনো নথি পাওয়া যায়নি। সাক্ষীদের বক্তব্যেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের সমর্থন মিলেছে।
ভুক্তভোগী সুলতানা আক্তার লাখী বলেন, “আমার স্বামীর রক্ত পানি করা টাকা বিশ্বাস করে নিজের ভাইয়ের হাতে দিয়েছিলাম। সে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। আজ আমি ন্যায়বিচার চাই।” তিনি আরও জানান, প্রতিনিয়ত হুমকি ও ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটছে তাদের। পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও তারা শঙ্কিত।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অনেকেই জানান, পারিবারিক সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এমন প্রতারণার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। একজন প্রবাসীর দীর্ঘদিনের উপার্জন আত্মসাৎ হওয়ার বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে অভিযোগ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ হলে মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। তবে আপন ভাইয়ের হাতে বোনের সর্বস্ব হারানোর এই ঘটনা এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার কতটা ন্যায়বিচার পায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















