ঢাকা ০৮:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার। মনোহরগঞ্জে সন্ত্রাসী কায়দায় গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ পিএসএলের বাকি অংশে খেলা হচ্ছে না নাহিদ-মুস্তাফিজের কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনিয়মকেই নিয়মে পরিনত করছেন মাদারীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেরোবিতে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে আসা তরুণীর লাশ মিলল হোটেলের বাথরুমে বড়লেখা উপজেলা পৌর ছাত্রদল ও বড়লেখা উপজেলা শাখার ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তনু হত্যায় গ্রেপ্তার হাফিজুরের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ বিসিকের টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ! ঘোড়াশালে চাঁদাবাজ মহিউদ্দিনের দাপট, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের অভিযোগ

কেরানীগঞ্জ বিআরটিএ পরীক্ষা নামে করে যাচ্ছেন দুর্নীতি মামুনের নেতৃত্ব

ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয় এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ তিনি নামমাত্র লাইসেন্স পরীক্ষার আড়ালে দালালচক্রের মাধ্যমে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ যেখানে ন্যায্যভাবে লাইসেন্স পেতে চান, সেখানে মামুনের সিন্ডিকেট ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। দালালের মাধ্যমে টাকা না দিলে পাস নয়, ঘুষ না দিলে ফাইল চলে না—এমন এক প্রশাসনিক সন্ত্রাস গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।
নামমাত্র পরীক্ষা, কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য : বিআরটিএর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত ও প্রায়োগিক পরীক্ষা গাবতলী ও তেজগাঁওয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন নিয়ম ভেঙে দালালদের মাধ্যমে গোপনে পরীক্ষা নেন। দালালরা মোবাইল ফোনে রোল নম্বর পাঠায়, বিকাশে টাকা নেয়, আর কিছু সময় পরেই পরীক্ষার্থী ‘পাস’ হয়ে যায়— এইভাবেই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয় তাঁর জ্ঞাতসারে। গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, লাইসেন্সপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট নয় তবে প্রতিটি ফাইল থেকে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এই অর্থ ভাগাভাগি হয় দুই ভাগে—এক ভাগ দালালদের হাতে, আর বাকি অংশ সহকারী পরিচালক মামুনের পকেটে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিআরটিএর অফিসকে কার্যত নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
‘দালাল ছাড়া পাস নয়’ ভয়াবহ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ : কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায় বিআরটিএ কার্যালয়ে গেলে সাধারণ মানুষের প্রথমেই দেখা হয় দালালদের সঙ্গে। এই দালালরাই হলেন সহকারী পরিচালক মামুনের ‘অফিসের বাহিরের কর্মচারী’। তারা প্রতিটি প্রার্থীর কাছে যায়, বলে “স্যারের সঙ্গে আমাদের কথা আছে, দালালের মাধ্যমে আসলে পাস নিশ্চিত।” যারা এই পথে যেতে রাজি হন না, তাদের ফলাফল হয় ‘ফেল’। একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমি নিজের চেষ্টায় তিনবার পরীক্ষা দিয়েছি, ভালো দিয়েছি—তবুও ফেল। পরে দালালের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা দিলে অনলাইনে পাস দেখায়।” আরেকজন বলেন, “অফিসে গেলে মামুন স্যারকে পাওয়া যায় না। দালাল বলে, টাকা ছাড়া কিছুই হবে না।” এভাবে সহকারী পরিচালক মামুন একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন, যারা কেরানীগঞ্জ অফিসের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ‘অফিসে পাওয়া যায় না’—দালালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে অফিসে সচরাচর পাওয়া যায় না। তিনি প্রায়ই নিজেকে “প্রভাবশালী কর্মকর্তা” হিসেবে দাবি করেন এবং বলেন, “আমার ওপর অনেকেই আছে, কিছুই হবে না।” গণমাধ্যমের প্রতিনিধি বা সাধারণ মানুষ তাঁকে দেখতে গেলে অফিস কর্মচারীরা বলেন “স্যার বাইরে মিটিংয়ে আছেন।” কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি আসলে অফিসের আশেপাশেই থাকেন এবং দালালদের মাধ্যমেই সব পরিচালনা করেন। দালালরা প্রতিদিন তাঁর নির্দেশে কতজন পাস করবে, কার ফলাফল ফেল হবে সব তথ্য জানে এবং ফোনে নির্দেশ পায়।
বিকাশ ও এসএমএসে ঘুষ আদানপ্রদান : মামুনের সিন্ডিকেট ঘুষ আদানপ্রদানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিকেও কাজে লাগিয়েছে। প্রার্থীর মোবাইলে প্রথমে আসে রোল নম্বরের এসএমএস, এরপর আসে বার্তা—“বিকাশে টাকা পাঠান, তাহলেই পাস।” একজন ভুক্তভোগী জানান, “আমাকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয় বিকাশে। টাকা পাঠানোর পর দুই ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে পাস দেখায়।” এভাবে বিআরটিএর পরীক্ষায় দুর্নীতির ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। বিকাশে লেনদেনের পরিমাণ প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকায় দাঁড়ায় বলে অভিযোগ।
অফিসের চারপাশে ‘ঘুষের দোকানপাট’ : কেরানীগঞ্জ অফিসের চারপাশে বেশ কিছু দোকান ও ছোট অফিস রয়েছে, যেগুলো বিআরটিএর কার্যক্রমের সঙ্গে অঘোষিতভাবে যুক্ত। এই দোকানগুলো আসলে সহকারী পরিচালক মামুনের দালালদের “অফিস”। প্রার্থীদের এসব দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে ফরম পূরণ, মেডিকেল, ফাইল তৈরি সবই হয় অতিরিক্ত টাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “এগুলো আসলে মামুনের ছায়া অফিস। সকালে তালিকা আসে, কারা পাস পাবে সেটা দালালরা জানে।” এভাবেই সরকারি দপ্তরটি এখন ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
‘মামুন স্যারের ঘরে ফাইল উঠলে কাজ নিশ্চিত’ : অফিসের ভেতরে কাজ করা কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মামুন স্যারের টেবিলে ফাইল উঠলে পাস নিশ্চিত। কিন্তু যদি তাঁর টেবিল পর্যন্ত না যায়, তাহলে ফলাফল আসে ফেল।” তারা আরও জানান, “ফাইল তুলতে হলে আগে দালালদের মাধ্যমে টাকা দিতে হয়। তারপর মামুন স্যার সই দেন।” এমন অভিযোগ প্রমাণ করে যে, তিনি অফিসের সব কার্যক্রম নিজের হাতে নিয়েছেন এবং ঘুষ ছাড়া কিছুই অনুমোদন করেন না।
কর্মকর্তা মামুনের প্রভাব এতটাই যে, স্থানীয় প্রশাসন থেকেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বলেন, “দুদকে অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সবাই ভয় পায়।” বিআরটিএর অন্যান্য কর্মকর্তারাও মুখ বন্ধ রাখছেন, কারণ মামুন নাকি ‘উপর মহলে যোগাযোগ’ রাখেন। তাই কেউ তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে বদলির ভয় পায়।
বিগত কয়েক বছরে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা পড়েছে দালালদের মাধ্যমে লাইসেন্স বাণিজ্য, বিকাশে ঘুষ গ্রহণ, অফিসে উপস্থিত না থেকে বাইরে থেকে সিন্ডিকেট পরিচালনা, সাংবাদিকদের হয়রানি, সাধারণ প্রার্থীদের ইচ্ছাকৃত ফেল দেখানো তবুও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
দালালের বয়ান: ‘সব কিছু মামুন ভাইয়ের মাধ্যমে হয়’ গোপনে কথা বললে এক দালাল জানান, “আমরা শুধু যোগাযোগ করাই। সবকিছু মামুন ভাই জানেন। টাকা কোথায় যাবে, কাকে পাস করাতে হবে—সব ওনার নির্দেশে হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রতিদিন বিকাশে টাকা পাই, অফিসে জমা দিই। বাকিটা ভাগ হয়।” এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, সহকারী পরিচালক মামুন শুধুমাত্র দুর্নীতির অনুমোদন দেননি, বরং তিনি নিজেই এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকর্তাদের কারণে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। যারা ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পাচ্ছেন, তারা আসলে অযোগ্য চালক—এবং তারাই দুর্ঘটনার বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “যখন লাইসেন্স ঘুষে পাওয়া যায়, তখন রাস্তায় নিরাপত্তা বলে কিছু থাকে না। সহকারী পরিচালক মামুনের মতো কর্মকর্তারা আসলে দেশের জন্য বিপদ।”
একজন নাগরিক প্রতিনিধি বলেন, “সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। মামুনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনের প্রতি আস্থা থাকবে না।”

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার।

কেরানীগঞ্জ বিআরটিএ পরীক্ষা নামে করে যাচ্ছেন দুর্নীতি মামুনের নেতৃত্ব

আপডেট সময় ০৭:৩৯:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয় এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ তিনি নামমাত্র লাইসেন্স পরীক্ষার আড়ালে দালালচক্রের মাধ্যমে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ যেখানে ন্যায্যভাবে লাইসেন্স পেতে চান, সেখানে মামুনের সিন্ডিকেট ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। দালালের মাধ্যমে টাকা না দিলে পাস নয়, ঘুষ না দিলে ফাইল চলে না—এমন এক প্রশাসনিক সন্ত্রাস গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।
নামমাত্র পরীক্ষা, কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য : বিআরটিএর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত ও প্রায়োগিক পরীক্ষা গাবতলী ও তেজগাঁওয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন নিয়ম ভেঙে দালালদের মাধ্যমে গোপনে পরীক্ষা নেন। দালালরা মোবাইল ফোনে রোল নম্বর পাঠায়, বিকাশে টাকা নেয়, আর কিছু সময় পরেই পরীক্ষার্থী ‘পাস’ হয়ে যায়— এইভাবেই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয় তাঁর জ্ঞাতসারে। গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, লাইসেন্সপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট নয় তবে প্রতিটি ফাইল থেকে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এই অর্থ ভাগাভাগি হয় দুই ভাগে—এক ভাগ দালালদের হাতে, আর বাকি অংশ সহকারী পরিচালক মামুনের পকেটে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিআরটিএর অফিসকে কার্যত নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
‘দালাল ছাড়া পাস নয়’ ভয়াবহ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ : কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায় বিআরটিএ কার্যালয়ে গেলে সাধারণ মানুষের প্রথমেই দেখা হয় দালালদের সঙ্গে। এই দালালরাই হলেন সহকারী পরিচালক মামুনের ‘অফিসের বাহিরের কর্মচারী’। তারা প্রতিটি প্রার্থীর কাছে যায়, বলে “স্যারের সঙ্গে আমাদের কথা আছে, দালালের মাধ্যমে আসলে পাস নিশ্চিত।” যারা এই পথে যেতে রাজি হন না, তাদের ফলাফল হয় ‘ফেল’। একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমি নিজের চেষ্টায় তিনবার পরীক্ষা দিয়েছি, ভালো দিয়েছি—তবুও ফেল। পরে দালালের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা দিলে অনলাইনে পাস দেখায়।” আরেকজন বলেন, “অফিসে গেলে মামুন স্যারকে পাওয়া যায় না। দালাল বলে, টাকা ছাড়া কিছুই হবে না।” এভাবে সহকারী পরিচালক মামুন একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন, যারা কেরানীগঞ্জ অফিসের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ‘অফিসে পাওয়া যায় না’—দালালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে অফিসে সচরাচর পাওয়া যায় না। তিনি প্রায়ই নিজেকে “প্রভাবশালী কর্মকর্তা” হিসেবে দাবি করেন এবং বলেন, “আমার ওপর অনেকেই আছে, কিছুই হবে না।” গণমাধ্যমের প্রতিনিধি বা সাধারণ মানুষ তাঁকে দেখতে গেলে অফিস কর্মচারীরা বলেন “স্যার বাইরে মিটিংয়ে আছেন।” কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি আসলে অফিসের আশেপাশেই থাকেন এবং দালালদের মাধ্যমেই সব পরিচালনা করেন। দালালরা প্রতিদিন তাঁর নির্দেশে কতজন পাস করবে, কার ফলাফল ফেল হবে সব তথ্য জানে এবং ফোনে নির্দেশ পায়।
বিকাশ ও এসএমএসে ঘুষ আদানপ্রদান : মামুনের সিন্ডিকেট ঘুষ আদানপ্রদানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিকেও কাজে লাগিয়েছে। প্রার্থীর মোবাইলে প্রথমে আসে রোল নম্বরের এসএমএস, এরপর আসে বার্তা—“বিকাশে টাকা পাঠান, তাহলেই পাস।” একজন ভুক্তভোগী জানান, “আমাকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয় বিকাশে। টাকা পাঠানোর পর দুই ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে পাস দেখায়।” এভাবে বিআরটিএর পরীক্ষায় দুর্নীতির ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। বিকাশে লেনদেনের পরিমাণ প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকায় দাঁড়ায় বলে অভিযোগ।
অফিসের চারপাশে ‘ঘুষের দোকানপাট’ : কেরানীগঞ্জ অফিসের চারপাশে বেশ কিছু দোকান ও ছোট অফিস রয়েছে, যেগুলো বিআরটিএর কার্যক্রমের সঙ্গে অঘোষিতভাবে যুক্ত। এই দোকানগুলো আসলে সহকারী পরিচালক মামুনের দালালদের “অফিস”। প্রার্থীদের এসব দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে ফরম পূরণ, মেডিকেল, ফাইল তৈরি সবই হয় অতিরিক্ত টাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “এগুলো আসলে মামুনের ছায়া অফিস। সকালে তালিকা আসে, কারা পাস পাবে সেটা দালালরা জানে।” এভাবেই সরকারি দপ্তরটি এখন ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
‘মামুন স্যারের ঘরে ফাইল উঠলে কাজ নিশ্চিত’ : অফিসের ভেতরে কাজ করা কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মামুন স্যারের টেবিলে ফাইল উঠলে পাস নিশ্চিত। কিন্তু যদি তাঁর টেবিল পর্যন্ত না যায়, তাহলে ফলাফল আসে ফেল।” তারা আরও জানান, “ফাইল তুলতে হলে আগে দালালদের মাধ্যমে টাকা দিতে হয়। তারপর মামুন স্যার সই দেন।” এমন অভিযোগ প্রমাণ করে যে, তিনি অফিসের সব কার্যক্রম নিজের হাতে নিয়েছেন এবং ঘুষ ছাড়া কিছুই অনুমোদন করেন না।
কর্মকর্তা মামুনের প্রভাব এতটাই যে, স্থানীয় প্রশাসন থেকেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বলেন, “দুদকে অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সবাই ভয় পায়।” বিআরটিএর অন্যান্য কর্মকর্তারাও মুখ বন্ধ রাখছেন, কারণ মামুন নাকি ‘উপর মহলে যোগাযোগ’ রাখেন। তাই কেউ তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে বদলির ভয় পায়।
বিগত কয়েক বছরে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জমা পড়েছে দালালদের মাধ্যমে লাইসেন্স বাণিজ্য, বিকাশে ঘুষ গ্রহণ, অফিসে উপস্থিত না থেকে বাইরে থেকে সিন্ডিকেট পরিচালনা, সাংবাদিকদের হয়রানি, সাধারণ প্রার্থীদের ইচ্ছাকৃত ফেল দেখানো তবুও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
দালালের বয়ান: ‘সব কিছু মামুন ভাইয়ের মাধ্যমে হয়’ গোপনে কথা বললে এক দালাল জানান, “আমরা শুধু যোগাযোগ করাই। সবকিছু মামুন ভাই জানেন। টাকা কোথায় যাবে, কাকে পাস করাতে হবে—সব ওনার নির্দেশে হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রতিদিন বিকাশে টাকা পাই, অফিসে জমা দিই। বাকিটা ভাগ হয়।” এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, সহকারী পরিচালক মামুন শুধুমাত্র দুর্নীতির অনুমোদন দেননি, বরং তিনি নিজেই এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকর্তাদের কারণে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। যারা ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পাচ্ছেন, তারা আসলে অযোগ্য চালক—এবং তারাই দুর্ঘটনার বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “যখন লাইসেন্স ঘুষে পাওয়া যায়, তখন রাস্তায় নিরাপত্তা বলে কিছু থাকে না। সহকারী পরিচালক মামুনের মতো কর্মকর্তারা আসলে দেশের জন্য বিপদ।”
একজন নাগরিক প্রতিনিধি বলেন, “সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। মামুনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনের প্রতি আস্থা থাকবে না।”