সংবাদ শিরোনাম ::
আইজিপির সঙ্গে জাতিসংঘ বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাক্ষাৎ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করলেন আইসিসির তিন বিচারক গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতায় বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হোটেল রুমে স্বামী, পাকিস্তান নারী ক্রিকেট দলের ঘরে বিবাদ ১ টাকার দুর্নীতি বের করতে পারলে ইস্তফা দেবো: হাসনাত  আশুরা মানুষকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখায় : রাষ্ট্রপতি তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী চীন নরসিংদীতে কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে নিক্ষেপ, যুবক আটক ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত আটকা বহু, উদ্ধারে আসছেন না কেউ বরগুনায় সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে প্যানেল চেয়ারম্যান (ইউপি সদস্যের) বিরুদ্ধে মামলা

বড়লেখা ভূমি অফিসে মজিদের ঘুষ বানিজ্য, নিরব এসিল্যান্ড

মৌলভীবাজারের বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, হয়রানি এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এতে করে তহশিলদার মজিদ মিয়া দিনদিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভূমি উন্নয়ন কর আদায় থেকে শুরু করে নামজারি ও পর্চা সংক্রান্ত সেবা পেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘুষ দাবি, কাগজপত্রে ইচ্ছাকৃত ত্রুটি ধরিয়ে হয়রানি এবং বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখার মতো অভিযোগ উঠেছে মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম সম্পর্কে বারবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং জেলা প্রশাসন কার্যত নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। প্রশাসনের এই গা-ছাড়া মনোভাবের সুযোগেই তহশিলদার মজিদ মিয়া সরকারি অফিসকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

‘তদন্ত হয়নি, বরং উৎসাহ পেয়েছেন’ গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় “বড়লেখায় তহশিলদারের ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হলেও রহস্যজনক কারণে তখন কোনো তদন্ত হয়নি। এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগীরা বলছেন, বরং সেটি যেন মজিদ মিয়াকে আরও উৎসাহিত করেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আবু হাসান, ভুক্তভোগী হুমায়ুন কবির, জাহেদুর রহমান জাহেদ ও জাহাঙ্গীর হোসেন সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ করেছেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে। এর পরেই জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বুধবার সকাল ১১টায় রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর শারমিন সুলতানা অভিযোগের তদন্ত শুরু করেন।

তদন্তকে স্বাগত জানালেও অভিযোগকারীরা বলছেন, শুধু ব্যক্তির দায় দিলেই চলবে না—সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ডের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

এসিল্যান্ড কতটা দায়মুক্ত? ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন তহশিলদার যদি বছরের পর বছর এমন দুর্নীতি চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোথায় ছিলেন? অভিযোগকারীদের দাবি, এসিল্যান্ড শুধু ফাইল দেখে সিদ্ধান্ত দেন না—বরং তহশিলদারের ঘুষ-ভিত্তিক রিপোর্টের উপরেই চোখ বন্ধ করে সিল মেরে দেন।

ভূমি আইন অনুযায়ী, নামজারির চূড়ান্ত অনুমোদন এসিল্যান্ডের হাতেই। অথচ, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভুল ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্টের ভিত্তিতে নামজারি বাতিল করেছেন সহকারী কমিশনার। পরে পুনরায় আবেদন করলে সেই ভুলই সংশোধন হয়—যা প্রমাণ করে পূর্বের সিদ্ধান্তে যথাযথ যাচাই হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী হুমায়ুন কবির বলেন, “তহশিলদার ভুল রিপোর্ট দেন, আর এসিল্যান্ড তাতে সই করে দেন। এভাবে একজন সাধারণ মানুষকে হয়রানির চক্রে ফেলা হচ্ছে, অথচ কারও জবাবদিহি নেই।”

দুর্নীতিকে আড়াল না করে দায়িত্ব নিতে হবে ,স্থানীয়রা বলছেন, শুধু নিচুতলার কর্মচারী বা কর্মকর্তার ঘুষের দায় দিয়ে দায়সারা করা যাবে না। এসিল্যান্ড, ইউএনও, এমনকি জেলা প্রশাসন যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে একজন তহশিলদার এতটা বেপরোয়া হতে পারতেন না।

বড়লেখার মহদিকোনায় অবৈধভাবে কৃষিজমির মাটি কাটার ঘটনা চাপা দেওয়ার অভিযোগেও মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে অসহযোগিতার প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন জাহেদুর রহমান জাহেদ। তার ভাষায়, “তহশিলদার অপরাধীদের আগেই খবর দিয়ে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং এসিল্যান্ডকে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছেন।”

প্রশাসনের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতা শুধু দুর্নীতিকে প্রশ্রয়ই দেয় না, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে। জনগণের প্রাপ্য সেবা পেতে যদি ঘুষ দিতে হয় বা মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, তবে দোষ শুধু একজন তহশিলদারের নয়—এর দায় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর।

অপেক্ষায় তদন্ত রিপোর্ট রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর শারমিন সুলতানা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার তাঁর কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিযুক্ত তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়া ও অভিযোগকারীদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে অভিযুক্ত মজিদ মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আইজিপির সঙ্গে জাতিসংঘ বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাক্ষাৎ

বড়লেখা ভূমি অফিসে মজিদের ঘুষ বানিজ্য, নিরব এসিল্যান্ড

আপডেট সময় ০৯:১২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫

মৌলভীবাজারের বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, হয়রানি এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এতে করে তহশিলদার মজিদ মিয়া দিনদিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভূমি উন্নয়ন কর আদায় থেকে শুরু করে নামজারি ও পর্চা সংক্রান্ত সেবা পেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘুষ দাবি, কাগজপত্রে ইচ্ছাকৃত ত্রুটি ধরিয়ে হয়রানি এবং বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখার মতো অভিযোগ উঠেছে মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম সম্পর্কে বারবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং জেলা প্রশাসন কার্যত নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। প্রশাসনের এই গা-ছাড়া মনোভাবের সুযোগেই তহশিলদার মজিদ মিয়া সরকারি অফিসকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

‘তদন্ত হয়নি, বরং উৎসাহ পেয়েছেন’ গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় “বড়লেখায় তহশিলদারের ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হলেও রহস্যজনক কারণে তখন কোনো তদন্ত হয়নি। এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগীরা বলছেন, বরং সেটি যেন মজিদ মিয়াকে আরও উৎসাহিত করেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আবু হাসান, ভুক্তভোগী হুমায়ুন কবির, জাহেদুর রহমান জাহেদ ও জাহাঙ্গীর হোসেন সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ করেছেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে। এর পরেই জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বুধবার সকাল ১১টায় রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর শারমিন সুলতানা অভিযোগের তদন্ত শুরু করেন।

তদন্তকে স্বাগত জানালেও অভিযোগকারীরা বলছেন, শুধু ব্যক্তির দায় দিলেই চলবে না—সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ডের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

এসিল্যান্ড কতটা দায়মুক্ত? ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন তহশিলদার যদি বছরের পর বছর এমন দুর্নীতি চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোথায় ছিলেন? অভিযোগকারীদের দাবি, এসিল্যান্ড শুধু ফাইল দেখে সিদ্ধান্ত দেন না—বরং তহশিলদারের ঘুষ-ভিত্তিক রিপোর্টের উপরেই চোখ বন্ধ করে সিল মেরে দেন।

ভূমি আইন অনুযায়ী, নামজারির চূড়ান্ত অনুমোদন এসিল্যান্ডের হাতেই। অথচ, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভুল ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্টের ভিত্তিতে নামজারি বাতিল করেছেন সহকারী কমিশনার। পরে পুনরায় আবেদন করলে সেই ভুলই সংশোধন হয়—যা প্রমাণ করে পূর্বের সিদ্ধান্তে যথাযথ যাচাই হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী হুমায়ুন কবির বলেন, “তহশিলদার ভুল রিপোর্ট দেন, আর এসিল্যান্ড তাতে সই করে দেন। এভাবে একজন সাধারণ মানুষকে হয়রানির চক্রে ফেলা হচ্ছে, অথচ কারও জবাবদিহি নেই।”

দুর্নীতিকে আড়াল না করে দায়িত্ব নিতে হবে ,স্থানীয়রা বলছেন, শুধু নিচুতলার কর্মচারী বা কর্মকর্তার ঘুষের দায় দিয়ে দায়সারা করা যাবে না। এসিল্যান্ড, ইউএনও, এমনকি জেলা প্রশাসন যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে একজন তহশিলদার এতটা বেপরোয়া হতে পারতেন না।

বড়লেখার মহদিকোনায় অবৈধভাবে কৃষিজমির মাটি কাটার ঘটনা চাপা দেওয়ার অভিযোগেও মজিদ মিয়ার বিরুদ্ধে অসহযোগিতার প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন জাহেদুর রহমান জাহেদ। তার ভাষায়, “তহশিলদার অপরাধীদের আগেই খবর দিয়ে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং এসিল্যান্ডকে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছেন।”

প্রশাসনের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতা শুধু দুর্নীতিকে প্রশ্রয়ই দেয় না, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে। জনগণের প্রাপ্য সেবা পেতে যদি ঘুষ দিতে হয় বা মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, তবে দোষ শুধু একজন তহশিলদারের নয়—এর দায় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর।

অপেক্ষায় তদন্ত রিপোর্ট রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর শারমিন সুলতানা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার তাঁর কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিযুক্ত তহশিলদার মোহাম্মদ মজিদ মিয়া ও অভিযোগকারীদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে অভিযুক্ত মজিদ মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।