নির্বাচনের সময় নানা কথা বলে বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “আপনারা নির্বাচনের সময় নানা কথা বলে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, হাতেপায়ে ধরে ভোট নিলে, এখন বেইমানি করে কেন? তাঁর দলের আরেকজন গডফাদার বলেছেন, কমপক্ষে ৯৫টি আসনে হেরে যাওয়া বিএনপিকে আমরাই ভোট দিয়ে জিতিয়েছি।”
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছে। জামায়াত নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিস্টের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে—এমন অভিযোগও করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নাউজুবিল্লাহ। একজনের গায়ে কোনো কাপড় নেই, আরেকজনের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় আছে। তো যার গায়ে কাপড় নেই, সে বলছে, ওই দেখো, ওর গায়ে কোনো জামা নেই।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সময় বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চেয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেছেন, হাতেপায়ে ধরে ভোট নেওয়ার পর এখন বেইমানি করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের আরেক নেতা দাবি করেছেন, অন্তত ৯৫টি আসনে বিএনপিকে জিততে আওয়ামী লীগ ভোট দিয়েছে। নাটোরের বিএনপিদলীয় এক সংসদ সদস্যও দলের সাফল্যের পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবদানের কথা বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন নেতাকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া হচ্ছে। এরপর বলা হচ্ছে, সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে এবং জামায়াত অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, “সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে, তাহলে আপনারা সরকারে এসেছেন কেন? এই টাকা ঢোকা ঠেকাতে পারেন না কেন? ওপার থেকে অস্ত্র ও মাদক আসে কেন? ঠেকাতে পারেন না কেন? যে সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ঠেকানোর যোগ্যতা নেই, সেই সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই।”
জনগণকে বিভিন্ন ধরনের কার্ড দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, “জনগণকে কার্ড দেবেন, দিচ্ছেন, দিন। কিন্তু কয়জনকে কার্ড দিয়েছেন? কয়জনকে দেবেন? কখন দেবেন? এর আগে গরিব-ধনী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার ঘাড়ে করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। আপনাদের দুর্নীতির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন, একটার পর একটা। মানুষের জীবন এখন অতিষ্ঠ।”
তিনি বলেন, প্রবাসে অস্থিরতার কারণে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে আসছেন। তাঁদের জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ারও কোনো পরিকল্পনা নেই। চাঁদাবাজির কারণে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এক টাকার জিনিস তিন টাকায় কিনতে হচ্ছে।
শফিকুর রহমান বলেন, “দুই দিন আগে গণমাধ্যমে দেখলাম, পঞ্চগড়ে চারটি লাউ নাকি এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষিরা উপযুক্ত দাম না পেয়ে মনের জ্বালায় এগুলো খাল-বিলে ফেলে দিচ্ছেন। রাজধানীতে আপনারা এক টাকায় কি একটি লাউ কিনতে পারেন? ৪০, ৫০, ৬০ টাকা লাগে। ওই চাঁদাবাজদের কারণে এই কর আপনাদের ওপর বসেছে।”
চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করতে না পারার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, রাড্ডা মেডিকেল সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে উন্মুক্ত সেবা দিয়ে আসছিল। সেখানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে শুধু পদত্যাগ করানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অপরাধের জন্য তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়নি কেন।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারির কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ। অনেক জায়গায় বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁদের দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে। সাত মাসের সরকার কীভাবে এত দ্রুত ভুলত্রুটি করেছে, মানুষের ওপর করের বোঝা বেড়েছে, বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোকজনকে বসানো হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে—এসব প্রশ্ন তোলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের সালাউদ্দিন সাহেব খুবই পারদর্শী লোক, সব মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে। এমনকি আইন মন্ত্রণালয়, শেষ পর্যন্ত দেখলাম ধর্ম মন্ত্রণালয়ও। কিন্তু শুধু নিজের মন্ত্রণালয় দেখার সুযোগ পান না।”
তিনি আরও বলেন, সংসদে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকের বড় চালান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকার মধ্য দিয়ে আসে। এ ছাড়া দিনের বেলায় ৫০টি ট্রাকে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পথ পরিহার করে সরকারকে নিজ দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “তা না হলে সরে দাঁড়ান।”
জামায়াতের আমির বলেন, “আমাদের বার্তা স্পষ্ট। আমরা কোনো দলীয় দাবি বা ১১-দলীয় জোটের কোনো দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমরা নেমেছি জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে। প্রতিটি দাবি জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দাবি বাস্তবায়নে আমাদের বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমরা কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করি।”
তিনি বলেন, “জন্ম যখন নিয়েছি, আমরা জানি মৃত্যু আমাদের সঙ্গেই। কিন্তু অপমানের মৃত্যুবরণ করতে চাই না। জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করে সেই মৃত্যু কবুল করতে চাই। সেটি হবে গর্বের। আমাদের নেতারা দেখিয়ে দিয়েছেন, কোনো অপশক্তির কাছে তাঁরা মাথা নত করেননি। আমরাও করব না, ইনশাআল্লাহ।”
লংমার্চ প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, প্রথম লংমার্চে জনগণের সাড়া ছিল কি না, তার সাক্ষী জনগণই। ভারত নিয়ে নানা হুমকি-ধমকি দেওয়া হলেও লংমার্চে জনগণের সাড়া নেই বলে দাবি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “যে লংমার্চে জনগণের কোনো সাড়া নেই, সেটি নিয়ে এত পেরেশানি কেন?”
তিনি আরও বলেন, জামায়াত নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছে এবং বিশৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে না। কেউ যেন তাদের ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে।
শফিকুর রহমান বলেন, “গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা অতীতের গুনে ধরা, বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চান না। তাঁরা পরিবর্তন ও সংস্কার চান।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















