ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আল মোস্তফা গ্রুপের এমডির মামলা-বাণিজ্য: চেকের জালে বন্দি ব্যবসায়ীরা ডব্লিউএইচওর নিয়োগে জালিয়াতি, চার্জশিটের অনুমোদন পেল দুদক তিন বছর পর ভারতে ফিরছে আইপিএলের নিলাম ফায়ার সার্ভিসে ডিডি ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ মুম্বাইয়ে টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, আহত ২ ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, বিতরণ মাত্র ১৯ শতাংশ ট্রাম্পের মুখপাত্র জাকারিয়ার চাকরিচ্যুতি নিয়ে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য রাজশাহীতে শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ড্যাপের বিতর্কিত গেজেট বাতিল চায় আইপিডি মধ্যপাড়া পাথর খনির এমডি পদে পুনরায় যোগ দিলেন প্রকৌশলী ডি. এম. জোবায়েদ হোসেন

আল মোস্তফা গ্রুপের এমডির মামলা-বাণিজ্য: চেকের জালে বন্দি ব্যবসায়ীরা

ব্যবসায়িক লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে জমা রাখা ব্যাংক চেক অপব্যবহার করে ধারাবাহিক মামলা দায়ের, ব্যবসায়ী হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রভাব খাটানোর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় অবস্থিত আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি না করে উল্টো সিকিউরিটি চেকের ভিত্তিতে একের পর এক মামলা ঠুকে দেওয়ার চিত্র সামনে এসেছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উদ্ভূত ব্যবসায়িক সংকট আড়াল করতেই পাওনা আদায়ের নামে সংঘবদ্ধ ‘মামলা-বাণিজ্য’ ও ব্ল্যাকমেইলিং চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আল মোস্তফা গ্রুপ একই চেকের বিপরীতে একাধিক মামলা দায়ের এবং কথিত মিথ্যা জিআর মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করছে। প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য তারা একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে। এমনকি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নাম ভাঙিয়ে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ভয় দেখানোর মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, হক ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার বাদী করা হয়েছে আল মোস্তফার অফিসের এক পিয়নকে। হক ফুড কর্তৃপক্ষের দাবি, মামলায় উল্লেখিত ঘটনার দিন সংশ্লিষ্ট এমডি বাংলাদেশেই অবস্থান করছিলেন না, যা মামলাটির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার বড় প্রমাণ।

ব্যবসায়ীদের হয়রানির পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিপন্ন করে অনিয়ম-দুর্নীতির রাজত্ব কায়েমের অভিযোগও রয়েছে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। উপজেলার বৈদ্যারবাজার এলাকার সাতভাইয়াপাড়া ও চর লাউয়াদী মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি না কিনে এবং মেঘনা নদীর তীরবর্তী সরকারি খাস জমি ও হালট দখল করে তারা গত এক সপ্তাহ ধরে অবৈধভাবে বালু ভরাট চালিয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই এলাকার প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজী আজিজুল্লাহর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের স্ত্রী সুরাইয়া করিম মুন্নীর আইনি বিরোধ চলছিল। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন এবং জমিটিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সুরাইয়া করিম সেটি আল মোস্তফা গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে মোস্তফা কামাল স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রকে বালু ভরাটের দায়িত্ব দেন।

স্থানীয় ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বিরোধপূর্ণ এই জমিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফের নেতৃত্বে গঠিত এক সিন্ডিকেট জোরপূর্বক বালু ভরাট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ভুক্তভোগী জমি মালিক হাজী আজিজুল্লাহ অভিযোগ করেন যে, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ বা ভূমি অফিস কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এদিকে দখলের কোপ পড়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও; দোকানপাট ভেঙে জায়গা খালি করে দিতে স্থানীয় সাব্বির আহমেদসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, যার ফলে তাদের সাধারণ জীবনযাপন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে এখন বসতভিটা ও খামার হারানোর চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং এবং হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে আর কল রিসিভ করেননি। ঘটনাটির আড়ালে থাকা প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী সমাজ ও ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন, লেনদেনের প্রকৃত লেজার পরীক্ষা করা, একই চেকের বিপরীতে বারবার দায়ের করা মামলাগুলোর আইনি পর্যালোচনা করা এবং সরকারি নদী-খাস জমি দখলকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আল মোস্তফা গ্রুপের এমডির মামলা-বাণিজ্য: চেকের জালে বন্দি ব্যবসায়ীরা

আল মোস্তফা গ্রুপের এমডির মামলা-বাণিজ্য: চেকের জালে বন্দি ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় ০২:১৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ব্যবসায়িক লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে জমা রাখা ব্যাংক চেক অপব্যবহার করে ধারাবাহিক মামলা দায়ের, ব্যবসায়ী হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রভাব খাটানোর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় অবস্থিত আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি না করে উল্টো সিকিউরিটি চেকের ভিত্তিতে একের পর এক মামলা ঠুকে দেওয়ার চিত্র সামনে এসেছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উদ্ভূত ব্যবসায়িক সংকট আড়াল করতেই পাওনা আদায়ের নামে সংঘবদ্ধ ‘মামলা-বাণিজ্য’ ও ব্ল্যাকমেইলিং চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আল মোস্তফা গ্রুপ একই চেকের বিপরীতে একাধিক মামলা দায়ের এবং কথিত মিথ্যা জিআর মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করছে। প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য তারা একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে। এমনকি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নাম ভাঙিয়ে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ভয় দেখানোর মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, হক ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার বাদী করা হয়েছে আল মোস্তফার অফিসের এক পিয়নকে। হক ফুড কর্তৃপক্ষের দাবি, মামলায় উল্লেখিত ঘটনার দিন সংশ্লিষ্ট এমডি বাংলাদেশেই অবস্থান করছিলেন না, যা মামলাটির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার বড় প্রমাণ।

ব্যবসায়ীদের হয়রানির পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিপন্ন করে অনিয়ম-দুর্নীতির রাজত্ব কায়েমের অভিযোগও রয়েছে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। উপজেলার বৈদ্যারবাজার এলাকার সাতভাইয়াপাড়া ও চর লাউয়াদী মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি না কিনে এবং মেঘনা নদীর তীরবর্তী সরকারি খাস জমি ও হালট দখল করে তারা গত এক সপ্তাহ ধরে অবৈধভাবে বালু ভরাট চালিয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই এলাকার প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজী আজিজুল্লাহর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের স্ত্রী সুরাইয়া করিম মুন্নীর আইনি বিরোধ চলছিল। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন এবং জমিটিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সুরাইয়া করিম সেটি আল মোস্তফা গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে মোস্তফা কামাল স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রকে বালু ভরাটের দায়িত্ব দেন।

স্থানীয় ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বিরোধপূর্ণ এই জমিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফের নেতৃত্বে গঠিত এক সিন্ডিকেট জোরপূর্বক বালু ভরাট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ভুক্তভোগী জমি মালিক হাজী আজিজুল্লাহ অভিযোগ করেন যে, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ বা ভূমি অফিস কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এদিকে দখলের কোপ পড়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও; দোকানপাট ভেঙে জায়গা খালি করে দিতে স্থানীয় সাব্বির আহমেদসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, যার ফলে তাদের সাধারণ জীবনযাপন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে এখন বসতভিটা ও খামার হারানোর চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং এবং হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে আর কল রিসিভ করেননি। ঘটনাটির আড়ালে থাকা প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী সমাজ ও ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন, লেনদেনের প্রকৃত লেজার পরীক্ষা করা, একই চেকের বিপরীতে বারবার দায়ের করা মামলাগুলোর আইনি পর্যালোচনা করা এবং সরকারি নদী-খাস জমি দখলকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।