ঢাকা ০৩:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তাড়াইলে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা আত্রাইয়ে আনসার-ভিডিপির উদ্যোগে ১ হাজার তালবীজ রোপণ তাড়াইলে অস্তিত্বহীন পুকুরের নাম ভাঙিয়ে মাছ চুরির মামলা, হয়রানির অভিযোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় দূরদর্শী নীতি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ রাষ্ট্রপতির গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সুভাস্তু ডেভেলপমেন্টে দুদকের অনুসন্ধান ঝিনাইদহে সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, তালিকায় বিএনপি সভাপতির ভাই-শ্যালক ও কর্মচারী কুমিল্লায় বাস খাদে পড়ে হেলপার নিহত, আহত ৫ লালপুরে লাইসেন্স ছাড়া সার ও কীটনাশক বিক্রি, ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বাসসের পরিচালক হলেন করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসার সমাধান হবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়: নুর

ঝিনাইদহে সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, তালিকায় বিএনপি সভাপতির ভাই-শ্যালক ও কর্মচারী

ঝিনাইদহে সার ডিলারশিপ নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থবাণিজ্য, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন, সীমাহীন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এম. এ. মজিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ভাই, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী ও বাড়ির কাজের লোককে সার ডিলারশিপ পেতে সহযোগিতা করেছেন। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশিত হলে পুরো জেলাজুড়ে সচেতন মহল, বিএনপির নেতাকর্মী ও ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও কর্মকাণ্ডের ছবি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রকাশিত তালিকা ও নীতিমালার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপ পাওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। অথচ হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ঘটনাকে নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মনোনীত অধিকাংশ ডিলারের নিজস্ব উপযুক্ত সারগুদাম বা পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগও রয়েছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আমির হোসেনের নিজস্ব গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির আশ্রয়ে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ। আবার হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি পরিবারের সক্রিয় সদস্য সাকিব হোসেন।

মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচিতি বিশ্লেষণ করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. মজিদের ভাই আব্দুল লতিফ এবং জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়া ডিলারশিপ পেয়েছেন।

মহেশপুর উপজেলায় উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হাসানের ভাই ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা, পৌর এলাকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লা, যাদবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য সবুর খান এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে শাকিল রিয়াজ শুভর নাম রয়েছে তালিকায়।

কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এলাকায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে জেলা বিএনপির সভাপতির কর্মচারী আনোয়ার হোসেনকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমার কাছে পাঁচজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। আমি সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তথ্য দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, আমরা যেন আবার সেই ‘নৌকার তলে’ চাপা পড়েছি! এভাবে চললে বিএনপির রাজনীতি করার কোনো মানে হয় না। জেলা পর্যায় থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করার কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছেন।”

এদিকে, মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, “আমার বাবা এই ইউনিয়ন বিএনপির একজন ত্যাগী নেতা। তিনি দীর্ঘদিন এই ইউনিয়নে সাব-ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা আমার বাবার কাছ থেকে ডিলারশিপ কেড়ে নেন। এবার আমরা আশা করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ অনেক অযোগ্য মানুষ নিয়োগ পেয়েছেন।”

এ সময় আক্ষেপ করে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরও বলেন, “জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরাই এর সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা দলটিকে শেষ করে দিয়েছেন। পুরো মহেশপুর উপজেলা বিএনপি শেষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখনই হস্তক্ষেপ না করলে এবং তাঁদের না থামালে সব শেষ হয়ে যাবে। তাঁরা দলের কলঙ্ক। তাঁদের লাগাম টেনে ধরতে হবে।”

অন্যদিকে, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেন, “আমার শ্যালক নিজেই জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন, তাই তিনি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আর পুরো জেলার তালিকা কীভাবে বা কার মাধ্যমে হয়েছে, সে সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।”

অভিযোগের তীর হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীরের দিকে উঠলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন জানান, “আমার কাছে কোনো সার ডিলারের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জেনে জানাচ্ছি।”

এদিকে, সার ডিলারদের তালিকায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও এ নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এম. এ. মজিদের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি সার ডিলারশিপ নিয়োগে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাসিন্দা ও ঢাকা মহানগর ছাত্রদল নেতা রাফিকুল ইসলাম রাফি জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে সেই ফোনালাপ ভাইরাল হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এর পরপরই দলীয় পদ থেকে বহিষ্কৃত হন রাফিকুল ইসলাম রাফি।

এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে এনে আলোচনায় আসা ছাত্রদল নেতা রাফিকুল ইসলাম রাফি বলেন, “আমি সত্য তুলে ধরেছি। জেলা বিএনপির সভাপতি তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করিয়েছেন। তাতে কোনো দুঃখ নেই। আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বুকে লালন করি। এই জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশ নেতা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁরা দলকে ধ্বংস করছেন। আমরা তা কোনোভাবেই হতে দেব না।”

জেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. মজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রাফিকুল ইসলাম রাফি আরও বলেন, “পাঁচ আগস্টের পরে জেলাজুড়ে সর্বোচ্চ চাঁদাবাজি করেছেন এই এম. এ. মজিদ। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ঢাকায় ফ্ল্যাট ব্যবসা করা মজিদ জেলায় আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সার ডিলারশিপের নিয়োগবাণিজ্য তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি একজন চাঁদাবাজ। তাঁর কাছে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোনো মূল্য নেই। আমাদের একটাই দাবি—‘মজিদ হটাও, ঝিনাইদহ বাঁচাও।’”

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তাড়াইলে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

ঝিনাইদহে সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, তালিকায় বিএনপি সভাপতির ভাই-শ্যালক ও কর্মচারী

আপডেট সময় ০১:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ঝিনাইদহে সার ডিলারশিপ নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থবাণিজ্য, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন, সীমাহীন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এম. এ. মজিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ভাই, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী ও বাড়ির কাজের লোককে সার ডিলারশিপ পেতে সহযোগিতা করেছেন। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশিত হলে পুরো জেলাজুড়ে সচেতন মহল, বিএনপির নেতাকর্মী ও ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও কর্মকাণ্ডের ছবি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রকাশিত তালিকা ও নীতিমালার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপ পাওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। অথচ হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ঘটনাকে নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মনোনীত অধিকাংশ ডিলারের নিজস্ব উপযুক্ত সারগুদাম বা পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগও রয়েছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আমির হোসেনের নিজস্ব গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির আশ্রয়ে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ। আবার হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি পরিবারের সক্রিয় সদস্য সাকিব হোসেন।

মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচিতি বিশ্লেষণ করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. মজিদের ভাই আব্দুল লতিফ এবং জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়া ডিলারশিপ পেয়েছেন।

মহেশপুর উপজেলায় উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হাসানের ভাই ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা, পৌর এলাকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লা, যাদবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য সবুর খান এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে শাকিল রিয়াজ শুভর নাম রয়েছে তালিকায়।

কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এলাকায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে জেলা বিএনপির সভাপতির কর্মচারী আনোয়ার হোসেনকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমার কাছে পাঁচজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। আমি সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তথ্য দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, আমরা যেন আবার সেই ‘নৌকার তলে’ চাপা পড়েছি! এভাবে চললে বিএনপির রাজনীতি করার কোনো মানে হয় না। জেলা পর্যায় থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করার কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছেন।”

এদিকে, মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, “আমার বাবা এই ইউনিয়ন বিএনপির একজন ত্যাগী নেতা। তিনি দীর্ঘদিন এই ইউনিয়নে সাব-ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা আমার বাবার কাছ থেকে ডিলারশিপ কেড়ে নেন। এবার আমরা আশা করেছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ অনেক অযোগ্য মানুষ নিয়োগ পেয়েছেন।”

এ সময় আক্ষেপ করে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরও বলেন, “জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরাই এর সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা দলটিকে শেষ করে দিয়েছেন। পুরো মহেশপুর উপজেলা বিএনপি শেষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখনই হস্তক্ষেপ না করলে এবং তাঁদের না থামালে সব শেষ হয়ে যাবে। তাঁরা দলের কলঙ্ক। তাঁদের লাগাম টেনে ধরতে হবে।”

অন্যদিকে, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেন, “আমার শ্যালক নিজেই জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন, তাই তিনি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আর পুরো জেলার তালিকা কীভাবে বা কার মাধ্যমে হয়েছে, সে সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।”

অভিযোগের তীর হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীরের দিকে উঠলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন জানান, “আমার কাছে কোনো সার ডিলারের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জেনে জানাচ্ছি।”

এদিকে, সার ডিলারদের তালিকায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও এ নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এম. এ. মজিদের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি সার ডিলারশিপ নিয়োগে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাসিন্দা ও ঢাকা মহানগর ছাত্রদল নেতা রাফিকুল ইসলাম রাফি জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে সেই ফোনালাপ ভাইরাল হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এর পরপরই দলীয় পদ থেকে বহিষ্কৃত হন রাফিকুল ইসলাম রাফি।

এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে এনে আলোচনায় আসা ছাত্রদল নেতা রাফিকুল ইসলাম রাফি বলেন, “আমি সত্য তুলে ধরেছি। জেলা বিএনপির সভাপতি তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করিয়েছেন। তাতে কোনো দুঃখ নেই। আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বুকে লালন করি। এই জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশ নেতা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁরা দলকে ধ্বংস করছেন। আমরা তা কোনোভাবেই হতে দেব না।”

জেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. মজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রাফিকুল ইসলাম রাফি আরও বলেন, “পাঁচ আগস্টের পরে জেলাজুড়ে সর্বোচ্চ চাঁদাবাজি করেছেন এই এম. এ. মজিদ। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ঢাকায় ফ্ল্যাট ব্যবসা করা মজিদ জেলায় আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সার ডিলারশিপের নিয়োগবাণিজ্য তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি একজন চাঁদাবাজ। তাঁর কাছে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোনো মূল্য নেই। আমাদের একটাই দাবি—‘মজিদ হটাও, ঝিনাইদহ বাঁচাও।’”