কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে আসার পরই জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক নিয়ম তোয়াক্কা না করে অঘোষিত তদবিরের মাধ্যমে কমিশনারেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’র পদ বাগিয়ে নেন তিনি। অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ মাসোহারা আদায় এবং অর্জিত বিপুল অর্থ দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় স্ত্রীর নামে ভূ-সম্পত্তি কেনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
কোটি টাকার মাসোহারা ও ক্ষমতার অপব্যবহার
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন (০৮.০১.০০০০.০০১১.০৫.০০৪.২০২০-৬৪১, তারিখ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর থেকেই তিনি বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট শিথিল করা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতার অজুহাতে অনৈতিক আর্থিক সমঝোতা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রম থেকে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে, যা একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
গুলশানে স্ত্রীর নামে ভূ-সম্পত্তির পাহাড় ও নথিতে অসামঞ্জস্য
অভিযোগে জানা যায়, মাসুম (জন্ম: ০৭ জানুয়ারি ১৯৮২) তাঁর অনৈতিক উপার্জনের একটি বড় অংশ ব্যবহার করেছেন গৃহিণী স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে জমি কেনায়। লিপির কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও ভাটারা মৌজায় (জেএল নং ১৫, নামজারি খতিয়ান নং ২৯৭১৬, দাগ নং ২০৭৬৩) তাঁর নামে বিপুল সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে খুলনার সোনাডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা লিপির নামে এই ভূ-সম্পত্তি কেনা হয়।
সরকারি নথিপত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জমির পরিমাণের ক্ষেত্রে মারাত্মক গরমিল দেখা গেছে:
মূল নামজারি খতিয়ান: ০.৪০০০ একর (৪০ শতাংশ বা ২৪ কাঠা)।
ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: ৪.৯৬ একর (প্রায় ৩০০ কাঠা)।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ভাটারা এলাকায় কাঠাপ্রতি জমি ৬০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা হিসেবে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা। অপরদিকে, ডিজিটাল রেকর্ডে প্রদর্শিত ৪.৯৬ একর জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। একজন রাজস্ব কর্মকর্তার প্রকাশ্য বৈধ আয় দিয়ে রাজধানীর মতো জায়গায় এত টাকার সম্পদ কেনা অসম্ভব বলে খোদ বন্ড কমিশনারেটের ভেতরেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানেও সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব
কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শীর্ষ প্রশাসনিক কেন্দ্রে বসে ফাইল আটকে মাসোহারা আদায়ের ফলে একদিকে রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বন্ড সুবিধার চরম অপব্যবহার ঘটছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা পুরো কমিশনারেটের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। এই পদে বসে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি করা হলে তা আর ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে রূপ নেয়।
দুদকের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং ‘ঘুষ কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করছেন। এনবিআরের ভাবমূর্তি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সুরক্ষায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ ও দণ্ডবিধির আওতায় অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্টরা বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন:
• পরিবারসহ তাঁর সব ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অবিলম্বে জব্দ ও যাচাই করা।
• ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসংক্রান্ত লেনদেনের নথি এবং মাসুমের স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিং অডিট করা।
• সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবানবন্দি নেওয়া এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR) পর্যালোচনা করা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















