রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় বিলিয়ন ডলারের অতি-বিলাসবহুল প্রাসাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। গত এক সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্টের ওই অবকাশযাপনকেন্দ্রের মাত্র ১২ মাইল দূরে জেলেনঝিক এলাকায় ধারাবাহিক দুটি সফল ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। হামলায় পুতিনের প্রাসাদ রক্ষাকারী একটি এস-৪০০ বিধ্বংসী বিমানবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও এর লঞ্চ প্যাড ধ্বংস হয়ে যায়, যা টানা তিন ঘণ্টা ধরে দাউ দাউ করে জ্বলেছে বলে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফল হামলার পর কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত পুতিনের ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সুবিশাল রাজপ্রাসাদটি এখন কার্যত সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রমণের প্রথম ধাপে গত ৭ আগস্ট ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার ‘ভোলনা কুপোল গ্যারান্ট’ নামের একটি অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে। ২০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে স্টারলিংক যোগাযোগব্যবস্থা বিকল করতে এই রুশ প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হতো। এর পরপরই গত রবিবার পূর্ববর্তী দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে থাকা একটি এস-৪০০ বিমানবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও এর লঞ্চ প্যাডকে লক্ষ্যবস্তু করে দ্বিতীয় হামলাটি চালানো হয়।
ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার মেজর রবার্ট ব্রোভদি জানান, ধ্বংস হওয়ার ঠিক পূর্বে রবিবার রাতে এস-৪০০ ব্যবস্থাটি থেকে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এরপরই ইউক্রেনীয় হামলায় সেটি বিধ্বস্ত হয় এবং প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। সামরিক বিশ্লেষক ইয়ান মাতভেয়েভ স্যাটেলাইট চিত্র পর্যবেক্ষণ করে অন্তত একটি লঞ্চার ধ্বংসের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রাসাদটি এখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। কারণ, যেকোনো আকাশপথের হামলা ঠেকাতে এই এস-৪০০ ব্যবস্থার ওপরই রাশিয়া মূল নির্ভরতা রাখত।
রাশিয়ার ক্রাসনোদার ক্রাই অঞ্চলের জেলেনঝিক শহরের কাছে কৃষ্ণসাগর উপকূলে অবস্থিত ইতালীয় স্থাপত্যশৈলীর এই সুবিশাল প্রাসাদটির নির্মাণব্যয় আনুমানিক ১.২ বিলিয়ন ডলার। প্রয়াত রুশ বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির অ্যান্টি-করাপশন ফাউন্ডেশনের এক অনুসন্ধানে প্রথম এই প্রাসাদের গোপন তথ্য ফাঁস হয়। প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিময় বিস্তৃত এই রাজকীয় কমপ্লেক্সে একটি হকি রিংক, নিজস্ব সিনেমা হল এবং একাধিক বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ রয়েছে। পুরো এলাকাটি নো-ফ্লাই জোনের আওতায় রুশ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি-এর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ঘেরা থাকে।
এর আগে, চলতি মাসের ৩ আগস্ট প্রাসাদের অদূরে আর্খিপো-ওসিপোভকা সৈকত এলাকায় একটি ড্রোন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় তিন শিশুসহ অন্তত সাতজন প্রাণ হারান এবং ৪০ জনের বেশি আহত হন, যাকে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইউক্রেনের পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেছিল মস্কো।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী রাশিয়ার সীমানার বেশ গভীরে গিয়ে আক্রমণ জোরদার করেছে, যার মধ্যে গত সপ্তাহের ৬০০ মাইলেরও বেশি ভেতরের একটি ড্রোন হামলাও অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে রেডিও স্বোবোদার করা একটি তদন্তে দেখা যায়, পুতিনের আরেক আবাসস্থল ভালদাই হ্রদের প্রাসাদ ঘিরে ২৭টি আকাশ প্রতিরক্ষা টাওয়ার স্থাপনসহ সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়েছে। মে মাসে ফাঁস হওয়া এক ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার চেষ্টা এড়াতে রুশ প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন এবং টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাংকারে লুকিয়ে থাকার মতো চরম পথও বেছে নিচ্ছেন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

























