ঢাকা ০৮:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কুমিল্লা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১২৪ কেজি গাঁ’জা ও ১০০ পিস ইয়াবা জব্দ, আটক ১ ওদুুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় বালিয়া থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেল মেধাবী ছাত্র রাকিব ব্রাহ্মণপাড়ায় ২০ কেজি গাঁ’জা’সহ অটোরিকশা জব্দ, গ্রেপ্তার ১ জিপিএ-৫ পেয়েও আনন্দ নেই, শিহাবের কৃতিত্বে কাঁদছে শোকাহত পরিবার বয়সকে হার মানিয়ে ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন আলী আকবর যে পথে আপা হেঁটেছিল, সেই পথে আপনারা হাঁটছেন: ডা. শফিকুর রহমান সবশেষ মামলায় জামিন পেলেন সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক খাদ্য অধিদপ্তর ঠিকাদার সমিতির নতুন সভাপতি সাগর, সম্পাদক মাসুদ, সাংগঠনিক কোয়েল মহেশখালীতে এসএসসি ফলাফলে পাশের হারে আইল্যান্ড হাই স্কুল ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচিতে বেতাগীতে চারা বিতরণ করলেন জেলা প্রশাসক

বয়সকে হার মানিয়ে ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন আলী আকবর

প্রবাদ আছে-ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, বয়স কখনো স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না। এবার তা প্রমাণ করলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার ৫৪ বছর বয়সী আলী আকবর। জীবনের নানা ব্যস্ততা ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে শেষ বয়সে এসে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
আলী আকবর বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তার ডাকনাম আলী আজম। চাকরির সুবাদে তিনি রাজশাহীতে বসবাস করায় সেখানকার নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।

আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। পরে বিয়ে করেন। সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম নেয়।

সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে যখন আরও হিমশিম খেতে হচ্ছিল, তখন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান।

আলী আকবর বলেন, ‘আমার বড় মেয়েকে নার্স এবং ছোট ছেলেকে এমবিবিএস ডাক্তার বানিয়েছি। এখন আমার ছেলে সরকারি ডাক্তার হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাদের বিয়ে-শাদিও দিয়েছি। এখন আমি ও আমার স্ত্রী বিগত দিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে সুখে সংসার করছি।’

তিনি বলেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে আবারও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাই ঘরে বসে না থেকে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলী আকবর বলেন, ‘পড়াশোনার জন্য কোনো বয়স লাগে না। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে প্রয়োজন মনোবল ও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা। অযথা মোবাইল গেম ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগী হলেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব- আমি নিজেই তার প্রমাণ।’

আলী আকবরের ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন বলেন, তার বাবা মাঝে-মধ্যেই নিজের পড়াশোনার ইচ্ছার কথা বলতেন। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটন এবং সন্তানদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বে নিজের শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা মাঝে মাঝে বলতেন, তার পড়াশোনার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এখন আমি একজন ডাক্তার, আমার স্ত্রীও ডাক্তার। আমার বড় বোন নার্সিং পেশায় চাকরি করছেন এবং বোনজামাই শিক্ষক।’

ডা. ইসমাইল হোসেন আরও বলেন, বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে গত ১৫ তারিখে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এবার তিনি এসএসসি পাস করেছেন। সামনে তাকে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

‘আমার বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যেন তিনি সুস্থ থাকেন এবং তার পড়াশোনার স্বপ্ন আরও এগিয়ে নিতে পারেন’, বলেন ডা. ইসমাইল হোসেন।
আলী আকবরের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুমিল্লা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১২৪ কেজি গাঁ’জা ও ১০০ পিস ইয়াবা জব্দ, আটক ১

বয়সকে হার মানিয়ে ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন আলী আকবর

আপডেট সময় ০৭:২৬:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

প্রবাদ আছে-ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, বয়স কখনো স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না। এবার তা প্রমাণ করলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার ৫৪ বছর বয়সী আলী আকবর। জীবনের নানা ব্যস্ততা ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে শেষ বয়সে এসে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
আলী আকবর বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তার ডাকনাম আলী আজম। চাকরির সুবাদে তিনি রাজশাহীতে বসবাস করায় সেখানকার নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।

আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। পরে বিয়ে করেন। সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম নেয়।

সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে যখন আরও হিমশিম খেতে হচ্ছিল, তখন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান।

আলী আকবর বলেন, ‘আমার বড় মেয়েকে নার্স এবং ছোট ছেলেকে এমবিবিএস ডাক্তার বানিয়েছি। এখন আমার ছেলে সরকারি ডাক্তার হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাদের বিয়ে-শাদিও দিয়েছি। এখন আমি ও আমার স্ত্রী বিগত দিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে সুখে সংসার করছি।’

তিনি বলেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে আবারও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাই ঘরে বসে না থেকে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলী আকবর বলেন, ‘পড়াশোনার জন্য কোনো বয়স লাগে না। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে প্রয়োজন মনোবল ও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা। অযথা মোবাইল গেম ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগী হলেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব- আমি নিজেই তার প্রমাণ।’

আলী আকবরের ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন বলেন, তার বাবা মাঝে-মধ্যেই নিজের পড়াশোনার ইচ্ছার কথা বলতেন। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটন এবং সন্তানদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বে নিজের শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা মাঝে মাঝে বলতেন, তার পড়াশোনার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এখন আমি একজন ডাক্তার, আমার স্ত্রীও ডাক্তার। আমার বড় বোন নার্সিং পেশায় চাকরি করছেন এবং বোনজামাই শিক্ষক।’

ডা. ইসমাইল হোসেন আরও বলেন, বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে গত ১৫ তারিখে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এবার তিনি এসএসসি পাস করেছেন। সামনে তাকে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

‘আমার বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যেন তিনি সুস্থ থাকেন এবং তার পড়াশোনার স্বপ্ন আরও এগিয়ে নিতে পারেন’, বলেন ডা. ইসমাইল হোসেন।
আলী আকবরের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ।