ঢাকা ০৮:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হোসেনপুর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ স্বপ্নভঙ্গের মূল্য: ব্রুনাই থেকে ফিরে আসা শ্রমিকদের মানবিক বেদনা, রাষ্ট্রের দায় ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রশ্ন থামছে না বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলী শহিদুলের বিরামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি কর্মসংস্থান ব্যাংক গাংনী উপজেলা শাখায় বাড়ছে খেলাপি ঋণ, নিরব ব্যবস্থাপক সাইদ প্রশাসকদের সমন্বিত উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন গতি এসেছে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবে: ডা. জুবাইদা রহমান এবার মোদির বাসভবনের সামনে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিক্ষোভ ভোলায় পূবালী ব্যাংকের ক্যাশলেস বাংলাদেশ ক্যাম্পেইন নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান রিজভীর

কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, তবু বহাল সিডিএর প্রকৌশলীরা

শাসন থেকে বিতাড়িত পুরনো সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যেন পরিণত হয়েছিল দুর্নীতির পুষ্ট ডিপোতে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প, চকচকে নকশা, আর ‘উন্নয়নের মোড়কে’ লুটপাটের মহোৎসব— এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু অভিযোগ, তদন্ত আর মামলার পাহাড় জমলেও একটিবারের জন্যও নড়েনি সিডিএর দুধর্ষ প্রকৌশলিদের আসন!

চেয়ার বদলায়, দুর্নীতিবাজ বদলায় না, সিন্ডিকেটে বন্দি
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ— নামটা শুনলেই কাগজে-কলমে “উন্নয়ন” শব্দটা চোখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে? এটি এখন একটি ‘দুর্নীতির হেভেন’। ফাইলের নিচে কোটি কোটি টাকা, আর শহরের মাথার ওপর অপরিকল্পিত ভবন— এটাই সিডিএর সিগনেচার!

১৬ বছর ধরে যারা ক্ষমতার ছায়ায় ছিল, তাদের জন্য এই সংস্থা হয়ে উঠেছিল আয়বৃদ্ধির সবচেয়ে নিরাপদ উৎস। কিছু প্রকৌশলী এতই ধূর্ত, তারা বদলির বদলে চেয়ারেই পেরেক মেরে দিয়েছেন! তাদের বদলি যায়নি ১৫ থেকে ১৯ বছরেও। এরা এতটাই শক্ত সিন্ডিকেট নতুন করে কাউকে পদায়ন করতেও দিচ্ছেন না।

সিডিএর ১৫ প্রকৌশলী’র আমলনামা
অভিযোগের তালিকায় একেবারে ওপরের সারিতে আছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামস। ২০০৮ সালে তিনি নগরীর অক্সিজেন-কাপ্তাই সংযোগ সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে দুদকের মামলায় জড়ান। তদারকির ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি ৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে অনুকম্পা চান এবং সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে মার্জনা প্রার্থনা করেন। কাজী হাসান বিন শামস স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের অধ্যাদেশ ২০০৮ এর ২৮(৩) এর অধীনে প্রদত্ত বিবরণে তা স্বীকারও করেন। পরে কমিশন তা গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা দেয়। এখনো বহাল তবিয়তে নিজের চেয়ার আগলে রেখেছেন!

তিনি একা নন, আরও ১৪ জন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী, এস্টিমেটর, সহকারী প্রকৌশলী ও অথরাইজড অফিসার আছেন দুর্নীতির মামলার তালিকায়। দুর্নীতির বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একাধিক প্রকৌশলীর সন্তান আমেরিকায় পড়াশোনা করছে, কেউ নির্মাণ করেছে বহুতল ভবন, আবার কারো কারো অর্থ পাড়ি দিয়েছে বিদেশে!

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
তাঁরা হলেন-চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন্ শামস্, চলতি দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-২ এ.এ.এম হাবিবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাং মনজুর হাসান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম, চলতি দায়িত্বের নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দিন, চলতি দায়িত্বের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ, অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসান, সহকারী প্রকৌশলী আ হ ম মিছবাহ্ উদ্দিন, সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইলিয়াছ আকতার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ওসমান সিকদার, উপ সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক, এস্টিমেটর রুপন কুমার চৌধুরী, এস্টিমেটর সৈয়দ গোলাম সরোয়ার ও উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম।

এদের মধ্যে আবার উপ সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক, এস্টিমেটর সৈয়দ গোলাম সরোয়ার ও উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ তিন জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছিলো। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিডিএ’র সংস্থাপন শাখার সেকশন অফিসার শাহীন আক্তার। সেগুলো রহস্যজনকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়— কে দিচ্ছে এই দুর্নীতিরীদের ছাতার নিচে আশ্রয়?

তদন্তের নামে নাটক?
সিডিএর দুর্নীতির তদন্তে গঠিত মন্ত্রণালয়ীয় কমিটি ৭ মাসেও একটিও বৈঠক করতে পারেনি। কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখে গত ২৩ এপ্রিল কমিটি পুনর্গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নতুন কমিটির আহ্বায়ক করা হয় উন্নয়ন অনুবিভাগ-১ এর অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনকে এবং সদস্যসচিব সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে।

কমিটিতে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইদ মাহবুব মোরশেদ, উপসচিব মো. নাজমুল আলম, স্থপতি সৈয়দা জারিনা হোসাইন ও সৈয়দ কুদরত আলী। উপসচিব ড. মো. নুরুল আমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সিডিএর বিগত সরকারের আমলে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও অভিযোগ যাচাই করে দুই মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রয়োজনে কমিটি কারিগরি বিশেষজ্ঞের মতামতও নিতে পারবে।

অন্যদিকে, বছরের পর বছর একই পদে থেকে ‘চাকরিতে পাকা’ হয়ে ওঠা প্রকৌশলীরা এখন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ। মন্ত্রণালয় তখন ‘সন্তুষ্ট নয়’ বলে পুরনো কমিটি বাতিল করে নতুন করে কমিটি গঠন করে ২৩ এপ্রিল। কিন্তু সেই নতুন কমিটিরও নানা অজুহাত। প্রশ্ন উঠেছে— এটা কি নিছক গাফিলতি, না দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে উচ্চপর্যায়ের ছত্রছায়া?

নতুন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বদলি হয়ে গেছেন, সদস্যরা কেউ জানেন না কবে হবে সভা। সিডিএ সচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব রবীন্দ্র চাকমা বলেন, ‘কমিটি গঠন করা হলেও তদন্ত কার্যক্রম এগোয়নি। কারণ কমিটির আহ্বায়ক মো. আব্দুল মতিনকে মন্ত্রণালয় অন্যত্র বদলি করেছে। শিগগিরই নতুন আহ্বায়ক নিয়োগ দেওয়া হবে, তখন কাজ শুরু হবে।’

অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্য মো. নাজমুল আলম বলেন, ‘দুই মাসে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ থাকলেও কাজ বড়, সময় লাগবেই।’ কিন্তু ইতোমধ্যে সেই দুই মাসও পার হয়েছে।

ঘরের শত্রু বিভীষণ, তদন্তেও তদবির
সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিগত সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন অনৈতিক উপায়ে। এখন সেই অর্থেই তাঁরা আবার তদবির চালাচ্ছেন— নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে, তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করতে। অবস্থাটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ‘তদবির’ হয়ে উঠেছে দুর্নীতির এক নম্বর নিরাপত্তা কবচ।

দায়সারা জবাব
সিডিএ এর উচ্চ পদস্ত প্রকৌশলী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, “সিডিএ আগের মতো নেই। আমরা কাজে বিশ্বাসী, শিগগিরই তা দৃশ্যমান হবে।” কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে কোথায়— মাটিতে না দুর্নীতির গর্তে?

সিডিএ চেয়ারম্যান বদলায়, বদলায় না দুর্নীতির কর্তারা
সিডিএ এখন ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নয়, বরং অনেকের চোখে ‘চট্টগ্রাম দুর্নীতি সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ’। উন্নয়নের নামে চলে কোটি কোটি টাকার মিথ্যে গল্প, অথচ নগরবাসী আজও পাননি পরিকল্পিত নগরায়ণের সুফল। আর তদন্ত? তা এখন ‘সিস্টেমেটিক ধামাচাপার’ আরেক নাম। অথচ বিগত ১৬ বছরে কত চেয়ারম্যান এসেছে আর গেছেন। সত্য হলো বদল হয়েছে চেয়ারম্যান বদলায়নি দুর্নীতি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ দিয়েছে সরকার, তাঁর প্রতি জনগণের বহুল আশা- প্রত্যাশা, সে প্রত্যাশা যে জনবান্ধব ও সেবামূলক হয় এমন দাবি জনগণের।

সিস্টেমেটিক লুটেরাদের স্বর্গ
তবে বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের পদোন্নতি বন্ধ থাকলেও, তারা বুঝে গেছেন— পেনশন পান না-ই বা, ঘুষের খনি তো এখনো তাঁদের দখলে! তাই দুই হাতে টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন শেষ সময়টা কাজে লাগিয়ে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হোসেনপুর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, তবু বহাল সিডিএর প্রকৌশলীরা

আপডেট সময় ০২:৪৯:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

শাসন থেকে বিতাড়িত পুরনো সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যেন পরিণত হয়েছিল দুর্নীতির পুষ্ট ডিপোতে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প, চকচকে নকশা, আর ‘উন্নয়নের মোড়কে’ লুটপাটের মহোৎসব— এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু অভিযোগ, তদন্ত আর মামলার পাহাড় জমলেও একটিবারের জন্যও নড়েনি সিডিএর দুধর্ষ প্রকৌশলিদের আসন!

চেয়ার বদলায়, দুর্নীতিবাজ বদলায় না, সিন্ডিকেটে বন্দি
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ— নামটা শুনলেই কাগজে-কলমে “উন্নয়ন” শব্দটা চোখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে? এটি এখন একটি ‘দুর্নীতির হেভেন’। ফাইলের নিচে কোটি কোটি টাকা, আর শহরের মাথার ওপর অপরিকল্পিত ভবন— এটাই সিডিএর সিগনেচার!

১৬ বছর ধরে যারা ক্ষমতার ছায়ায় ছিল, তাদের জন্য এই সংস্থা হয়ে উঠেছিল আয়বৃদ্ধির সবচেয়ে নিরাপদ উৎস। কিছু প্রকৌশলী এতই ধূর্ত, তারা বদলির বদলে চেয়ারেই পেরেক মেরে দিয়েছেন! তাদের বদলি যায়নি ১৫ থেকে ১৯ বছরেও। এরা এতটাই শক্ত সিন্ডিকেট নতুন করে কাউকে পদায়ন করতেও দিচ্ছেন না।

সিডিএর ১৫ প্রকৌশলী’র আমলনামা
অভিযোগের তালিকায় একেবারে ওপরের সারিতে আছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামস। ২০০৮ সালে তিনি নগরীর অক্সিজেন-কাপ্তাই সংযোগ সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে দুদকের মামলায় জড়ান। তদারকির ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি ৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে অনুকম্পা চান এবং সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে মার্জনা প্রার্থনা করেন। কাজী হাসান বিন শামস স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের অধ্যাদেশ ২০০৮ এর ২৮(৩) এর অধীনে প্রদত্ত বিবরণে তা স্বীকারও করেন। পরে কমিশন তা গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা দেয়। এখনো বহাল তবিয়তে নিজের চেয়ার আগলে রেখেছেন!

তিনি একা নন, আরও ১৪ জন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী, এস্টিমেটর, সহকারী প্রকৌশলী ও অথরাইজড অফিসার আছেন দুর্নীতির মামলার তালিকায়। দুর্নীতির বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একাধিক প্রকৌশলীর সন্তান আমেরিকায় পড়াশোনা করছে, কেউ নির্মাণ করেছে বহুতল ভবন, আবার কারো কারো অর্থ পাড়ি দিয়েছে বিদেশে!

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
তাঁরা হলেন-চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন্ শামস্, চলতি দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-২ এ.এ.এম হাবিবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাং মনজুর হাসান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম, চলতি দায়িত্বের নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দিন, চলতি দায়িত্বের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ, অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসান, সহকারী প্রকৌশলী আ হ ম মিছবাহ্ উদ্দিন, সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইলিয়াছ আকতার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ওসমান সিকদার, উপ সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক, এস্টিমেটর রুপন কুমার চৌধুরী, এস্টিমেটর সৈয়দ গোলাম সরোয়ার ও উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম।

এদের মধ্যে আবার উপ সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক, এস্টিমেটর সৈয়দ গোলাম সরোয়ার ও উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ তিন জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছিলো। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিডিএ’র সংস্থাপন শাখার সেকশন অফিসার শাহীন আক্তার। সেগুলো রহস্যজনকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়— কে দিচ্ছে এই দুর্নীতিরীদের ছাতার নিচে আশ্রয়?

তদন্তের নামে নাটক?
সিডিএর দুর্নীতির তদন্তে গঠিত মন্ত্রণালয়ীয় কমিটি ৭ মাসেও একটিও বৈঠক করতে পারেনি। কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখে গত ২৩ এপ্রিল কমিটি পুনর্গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নতুন কমিটির আহ্বায়ক করা হয় উন্নয়ন অনুবিভাগ-১ এর অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনকে এবং সদস্যসচিব সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে।

কমিটিতে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইদ মাহবুব মোরশেদ, উপসচিব মো. নাজমুল আলম, স্থপতি সৈয়দা জারিনা হোসাইন ও সৈয়দ কুদরত আলী। উপসচিব ড. মো. নুরুল আমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সিডিএর বিগত সরকারের আমলে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও অভিযোগ যাচাই করে দুই মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রয়োজনে কমিটি কারিগরি বিশেষজ্ঞের মতামতও নিতে পারবে।

অন্যদিকে, বছরের পর বছর একই পদে থেকে ‘চাকরিতে পাকা’ হয়ে ওঠা প্রকৌশলীরা এখন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ। মন্ত্রণালয় তখন ‘সন্তুষ্ট নয়’ বলে পুরনো কমিটি বাতিল করে নতুন করে কমিটি গঠন করে ২৩ এপ্রিল। কিন্তু সেই নতুন কমিটিরও নানা অজুহাত। প্রশ্ন উঠেছে— এটা কি নিছক গাফিলতি, না দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে উচ্চপর্যায়ের ছত্রছায়া?

নতুন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বদলি হয়ে গেছেন, সদস্যরা কেউ জানেন না কবে হবে সভা। সিডিএ সচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব রবীন্দ্র চাকমা বলেন, ‘কমিটি গঠন করা হলেও তদন্ত কার্যক্রম এগোয়নি। কারণ কমিটির আহ্বায়ক মো. আব্দুল মতিনকে মন্ত্রণালয় অন্যত্র বদলি করেছে। শিগগিরই নতুন আহ্বায়ক নিয়োগ দেওয়া হবে, তখন কাজ শুরু হবে।’

অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্য মো. নাজমুল আলম বলেন, ‘দুই মাসে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ থাকলেও কাজ বড়, সময় লাগবেই।’ কিন্তু ইতোমধ্যে সেই দুই মাসও পার হয়েছে।

ঘরের শত্রু বিভীষণ, তদন্তেও তদবির
সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিগত সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন অনৈতিক উপায়ে। এখন সেই অর্থেই তাঁরা আবার তদবির চালাচ্ছেন— নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে, তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করতে। অবস্থাটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ‘তদবির’ হয়ে উঠেছে দুর্নীতির এক নম্বর নিরাপত্তা কবচ।

দায়সারা জবাব
সিডিএ এর উচ্চ পদস্ত প্রকৌশলী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, “সিডিএ আগের মতো নেই। আমরা কাজে বিশ্বাসী, শিগগিরই তা দৃশ্যমান হবে।” কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে কোথায়— মাটিতে না দুর্নীতির গর্তে?

সিডিএ চেয়ারম্যান বদলায়, বদলায় না দুর্নীতির কর্তারা
সিডিএ এখন ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নয়, বরং অনেকের চোখে ‘চট্টগ্রাম দুর্নীতি সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ’। উন্নয়নের নামে চলে কোটি কোটি টাকার মিথ্যে গল্প, অথচ নগরবাসী আজও পাননি পরিকল্পিত নগরায়ণের সুফল। আর তদন্ত? তা এখন ‘সিস্টেমেটিক ধামাচাপার’ আরেক নাম। অথচ বিগত ১৬ বছরে কত চেয়ারম্যান এসেছে আর গেছেন। সত্য হলো বদল হয়েছে চেয়ারম্যান বদলায়নি দুর্নীতি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ দিয়েছে সরকার, তাঁর প্রতি জনগণের বহুল আশা- প্রত্যাশা, সে প্রত্যাশা যে জনবান্ধব ও সেবামূলক হয় এমন দাবি জনগণের।

সিস্টেমেটিক লুটেরাদের স্বর্গ
তবে বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের পদোন্নতি বন্ধ থাকলেও, তারা বুঝে গেছেন— পেনশন পান না-ই বা, ঘুষের খনি তো এখনো তাঁদের দখলে! তাই দুই হাতে টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন শেষ সময়টা কাজে লাগিয়ে।