চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সরেজমিন তদন্ত করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-২ শাখা থেকে ৯ জুলাই ২০২৬ জারি করা এক স্মারকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করতেই তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালে চাকরি থেকে অব্যাহতি, পরবর্তীতে চাকরিতে প্রত্যাবর্তন, ২০২০ সালে পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ, প্রশাসনিক বদলি, পুনরায় চট্টগ্রামে পদায়ন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা—সব মিলিয়ে প্রায় এক দশক ধরে এই দম্পতিকে ঘিরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
নতুন করে বিষয়টি সামনে আসে ২০২৬ সালের ২৫ জুন। ওই দিন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা/মন্ত্রী বরাবর চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে মেহেদী চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি একটি লিখিত আবেদন জমা দেন।
ওই আবেদনে মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে তাঁদের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরে বদলি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ফাইল বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তাঁরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়। অতীতেও তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে আবেদনকারী দাবি করেন।
একই আবেদনে শাহীন উল ইসলামের কর্মকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় নগরের সড়ক বাতি বন্ধ রাখার ঘটনায় তিনি বিতর্কে জড়ান। ওই ঘটনায় তাঁকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হলেও সেখানে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পদোন্নতি পান। সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বে উঠেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া ২০১৭ সালে এক সংখ্যালঘু কর্মকর্তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাঁকে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল বলে আবেদনে দাবি করা হয়। তবে পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের আদেশে তিনি চাকরিতে ফিরে আসেন।
অভিযোগ রয়েছে, শাহীন উল ইসলামের প্রভাবের কারণে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মুক্তা অস্থায়ী সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৩ সালে স্থায়ী না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ২৫০ কোটি টাকার ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ’ প্রকল্পের পরিচালক করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পেতে স্থায়ী কর্মকর্তা হওয়া এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন এমন দাবি তুলে এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখার ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে প্রশাসনিক কারণে মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাশেমকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। অন্যথায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য করা হবে। বদলি হওয়া কর্মকর্তারা নতুন কর্মস্থল থেকেই বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন এবং তাঁদের জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও অবসর সুবিধা মূল কর্মস্থলের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
একই প্রজ্ঞাপনে রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জীন কুমার দাশকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) হিসেবে পদায়নের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
বদলির প্রায় দুই মাস পর ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে একটি পত্র পাঠান। ওই চিঠিতে বলা হয়, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের কারণে চসিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়েছে। এতে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সরকারিভাবে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ের চারটি জিওবি প্রকল্প এবং একটি বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকৌশলী সংকটের কারণে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে বদলি হওয়া দুই প্রকৌশলীকে পুনরায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।
আবেদনকারী মেহেদী চৌধুরীর দাবি, ওই প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী পুনরায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে যোগ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এদিকে, ২০২৬ সালের ২৫ জুন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংস্থাপন শাখা থেকে জারি করা এক স্মারকে জানানো হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুরকৌশল) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। ওই আবেদনে তিনি ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অথবা বিদেশ গমনের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য মালয়েশিয়ায় অবস্থানের অনুমতি প্রার্থনা করেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আবেদনটি সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠান।
শাহীন উল ইসলাম চৌধুরীর কর্মজীবন শুরু হয় চসিকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের সুপারিশে। তিনি প্রথমে দৈনিক বেতনের ভিত্তিতে বিল্ডিং সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে অস্থায়ী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে উন্নীত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তুলনামূলক কম সময়ে ধারাবাহিক পদোন্নতি পেয়ে তিনি ২০২৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। এ নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া দম্পতির সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট, উচ্চমূল্যের ব্যক্তিগত গাড়ি, সন্তানদের ব্যয়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা, বোয়ালখালী উপজেলায় জমি, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। আত্মীয়দের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদ ক্রয় ও অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনিক ও প্রকৌশলী সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, দম্পতির পদোন্নতি ও সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তাঁদের প্রভাবের কারণে প্রকৌশল বিভাগের কার্যক্রম, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় নাগরিকদের পক্ষ থেকেও তাঁদের সম্পদ, বিদেশে বিনিয়োগ এবং সরকারি প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সংবাদ শিরোনাম ::
১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়!
চসিকের শাহীন-মুক্তা দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:১৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- ৫২৭ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















