রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের সিদ্ধান্তে কোনো লিখিত পরীক্ষা বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের একাংশের দাবি, চাকরি নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে তারা টাকা দিয়েছেন। গড়ে ৭৫ হাজার টাকা হিসেবে ১৪৩ জনের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই আগে থেকে অস্থায়ী বা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী ছিলেন। তাদের পুনরায় আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে বহাল রাখতে ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করা হয়। অথচ সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী ডিপিএম কেবল বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগে কী এমন জরুরি পরিস্থিতি ছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া আনিসুর রহমানের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হয়েছে। কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসেন নিজেই বলেছেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা তাদের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি; রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান ৩০ জুন তাদের কাছে তালিকা পাঠিয়েছিলেন এবং সেই তালিকা অনুযায়ী চুক্তি করা হয়েছে। ফলে কারা নিয়োগ পাবেন, সে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেই এসেছে বলে অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী জানান, চাকরি বহাল রাখতে এবং ভবিষ্যতে বাদ না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। একজন বলেন, “বিষয়টি আনিসুর রহমান স্যারকে জানালে তিনি কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েই চাকরি নিতে হয়েছে।”
আরেকজনের অভিযোগ, “নির্বাচন কর্মকর্তারা সরাসরি টাকা না নিলেও কোম্পানির সঙ্গে তাদের যোগসাজশ ছিল। যারা টাকা দেয়নি, তাদের অনেকের চাকরি হয়নি।”
গত ৬ জুলাই রাজধানীর শ্যামলীতে কেএসএফ ট্রেডার্সের কার্যালয়ে নিয়োগপত্র নিতে গেলে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শেষ পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়েই অনেককে নিয়োগপত্র নিতে হয়েছে।
এদিকে, এই নিয়োগের আগেই গত ২৩ জুন রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন ভবনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালায়। নির্বাচন অফিসে বিভিন্ন সেবা নিতে ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে দুদক কর্মকর্তারা বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করেন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে পাঠানোর কথা জানান।
যদিও রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান নিয়োগে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, নিয়ম মেনেই ডিপিএম পদ্ধতিতে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা তার কার্যালয় থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে বলে কেএসএফ ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়া নিয়োগ, ডিপিএম পদ্ধতির ব্যবহার এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
সংবাদ শিরোনাম ::
নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসের ১৪৩ জন নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ বানিজ্য
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:৫৭:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- ৫৪১ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















