ঢাকা ০৭:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৫ বছরেই দ্বিগুণ হতে পারে সোনার দাম জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত যেতে বাধ্য হবো ভারতে আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৮ সংবাদপত্রের কালো আইন সংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৬১৬ কোটি, বাকিরা কে কত? এটা সেই দেশ, যে দেশ বারবার প্রতিরোধ করেছে, প্রতিরোধ করতে জানে: রিজভী কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধ, ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প ১০৯ কোটিতে উন্নীত ফরিদপুরে জমি মাপকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকসহ পরিবারারের সদস্যদের উপর হামলা, আহত-৫  মৌলভীবাজারে একই পরিবারের ১১ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর পাশে জেলা প্রশাসন ফুলবাড়ী ২৯ বিজিবি’র উদ্যোগে সীমান্তবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ
জাগৃকের দুই প্রকৌশলীর খামখেয়ালিপনায় ক্ষতি ১৭ কোটি টাকা

কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধ, ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প ১০৯ কোটিতে উন্নীত

চট্টগ্রামের ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে সরকারি আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সোহেল সরকার এবং পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দুই কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সরকারের অন্তত ১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মূলত ৯২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ব্যয় পরে বাড়িয়ে ১০৯ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পের পরিধিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না আসলেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন ভবনের কাজ অসমাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে আধুনিক আবাসন সুবিধা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর চারটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পে মোট ৩৪২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯২ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যয় ১৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১০৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব কাজের সামঞ্জস্য নেই। তারা বলছেন, প্রকল্প এলাকায় অতিরিক্ত কোনো ভবন নির্মাণ, নকশায় মৌলিক পরিবর্তন কিংবা দৃশ্যমান অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের প্রমাণ নেই। ফলে অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শুরুতে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী সোহেল সরকার। তার সময়েই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে রাজশাহীতে বদলি করা হলে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দায়িত্ব পরিবর্তনের পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান অনিয়মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি; বরং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
প্রকল্পের অগ্রগতির সরকারি বিবরণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ভবন ১/এ এবং ১/বি-এর দশম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে এবং ভবনের ভেতরে ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজ চলমান। অন্যদিকে ভবন ২ ও ভবন ৩-এর অষ্টম তলার ছাদ ঢালাই শেষ হলেও নবম তলার ছাদ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছিল। অর্থাৎ চারটি ভবনেরই উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ তখনও চলমান ছিল।

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন ভবনের কাঠামো, ইটের কাজ, প্লাস্টার, ফিনিশিং এবং অন্যান্য প্রকৌশলগত কাজ চলমান ছিল, তখন কীভাবে প্রকল্পকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হিসেবে দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হলো? তাদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল ভাউচার, কারিগরি পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং কাজের অগ্রগতির সনদ। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা এবং বিল পরিশোধের বৈধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকলেও কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম কোনো একক কর্মকর্তার পক্ষে করা সম্ভব নয়; বরং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন ও তদারকির দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের ব্যয় ১৭ কোটি টাকা বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে তার সুস্পষ্ট কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক কারণ থাকতে হয়। সেই সঙ্গে সংশোধিত ব্যয়ের বিপরীতে অতিরিক্ত কী কাজ হয়েছে, তারও বিস্তারিত হিসাব নথিতে উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু এ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের দৃশ্যমান প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে কার্যকর তদারকি থাকলে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই শতভাগ বিল ছাড় হওয়ার সুযোগ ছিল না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি যথাযথভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই করতেন, তাহলে অসমাপ্ত প্রকল্পে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের ঘটনা ঘটত না।
সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে সাধারণত প্রতিটি ধাপের কাজ পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা কাজের পরিমাণ নিশ্চিত করেন। এরপর সেই পরিমাণ অনুযায়ী বিল প্রস্তুত ও অনুমোদন হয়। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এ প্রকল্পে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের সুযোগেই অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে।

এদিকে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্ত, বিল অনুমোদন এবং ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, তদন্তের আওতায় প্রকল্পের মূল নকশা, সংশোধিত নকশা, ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন, মেজারমেন্ট বুক, বিল ভাউচার, তদারকি প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতির ছবি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি ও নথিপত্রের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থ অপচয় এবং আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী সোহেল সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প নিয়ে বিদ্যমান বিতর্কের অবসান ঘটে এবং জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর হয়।
সরকারি অর্থে পরিচালিত আবাসন প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা। তাই এ ধরনের প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি প্রকল্পের বিষয় নয়; বরং এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রশ্নও বটে। এখন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু এবং প্রকৃতপক্ষে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৫ বছরেই দ্বিগুণ হতে পারে সোনার দাম

জাগৃকের দুই প্রকৌশলীর খামখেয়ালিপনায় ক্ষতি ১৭ কোটি টাকা

কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধ, ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প ১০৯ কোটিতে উন্নীত

আপডেট সময় ০৬:১৫:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে সরকারি আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সোহেল সরকার এবং পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দুই কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সরকারের অন্তত ১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মূলত ৯২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ব্যয় পরে বাড়িয়ে ১০৯ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পের পরিধিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না আসলেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন ভবনের কাজ অসমাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফিরোজশাহ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেটে আধুনিক আবাসন সুবিধা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর চারটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পে মোট ৩৪২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯২ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যয় ১৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১০৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব কাজের সামঞ্জস্য নেই। তারা বলছেন, প্রকল্প এলাকায় অতিরিক্ত কোনো ভবন নির্মাণ, নকশায় মৌলিক পরিবর্তন কিংবা দৃশ্যমান অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের প্রমাণ নেই। ফলে অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শুরুতে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী সোহেল সরকার। তার সময়েই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে রাজশাহীতে বদলি করা হলে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দায়িত্ব পরিবর্তনের পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান অনিয়মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি; বরং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
প্রকল্পের অগ্রগতির সরকারি বিবরণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ভবন ১/এ এবং ১/বি-এর দশম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে এবং ভবনের ভেতরে ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজ চলমান। অন্যদিকে ভবন ২ ও ভবন ৩-এর অষ্টম তলার ছাদ ঢালাই শেষ হলেও নবম তলার ছাদ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছিল। অর্থাৎ চারটি ভবনেরই উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ তখনও চলমান ছিল।

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন ভবনের কাঠামো, ইটের কাজ, প্লাস্টার, ফিনিশিং এবং অন্যান্য প্রকৌশলগত কাজ চলমান ছিল, তখন কীভাবে প্রকল্পকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হিসেবে দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হলো? তাদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল ভাউচার, কারিগরি পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং কাজের অগ্রগতির সনদ। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা এবং বিল পরিশোধের বৈধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকলেও কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম কোনো একক কর্মকর্তার পক্ষে করা সম্ভব নয়; বরং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন ও তদারকির দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের ব্যয় ১৭ কোটি টাকা বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে তার সুস্পষ্ট কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক কারণ থাকতে হয়। সেই সঙ্গে সংশোধিত ব্যয়ের বিপরীতে অতিরিক্ত কী কাজ হয়েছে, তারও বিস্তারিত হিসাব নথিতে উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু এ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের দৃশ্যমান প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে কার্যকর তদারকি থাকলে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই শতভাগ বিল ছাড় হওয়ার সুযোগ ছিল না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি যথাযথভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই করতেন, তাহলে অসমাপ্ত প্রকল্পে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের ঘটনা ঘটত না।
সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে সাধারণত প্রতিটি ধাপের কাজ পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা কাজের পরিমাণ নিশ্চিত করেন। এরপর সেই পরিমাণ অনুযায়ী বিল প্রস্তুত ও অনুমোদন হয়। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এ প্রকল্পে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের সুযোগেই অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে।

এদিকে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্ত, বিল অনুমোদন এবং ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, তদন্তের আওতায় প্রকল্পের মূল নকশা, সংশোধিত নকশা, ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন, মেজারমেন্ট বুক, বিল ভাউচার, তদারকি প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতির ছবি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি ও নথিপত্রের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থ অপচয় এবং আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী সোহেল সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প নিয়ে বিদ্যমান বিতর্কের অবসান ঘটে এবং জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর হয়।
সরকারি অর্থে পরিচালিত আবাসন প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা। তাই এ ধরনের প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল পরিশোধ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি প্রকল্পের বিষয় নয়; বরং এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রশ্নও বটে। এখন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু এবং প্রকৃতপক্ষে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না।