ঢাকা ০২:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা এমডি মুজিবুরের জনতা ব্যাংকে লুটপাট বরগুনার গৌরীচন্নায় প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলো তিন জমজ বোন মেরামতের নামে কোটি টাকা হরিলুটের অভিযোগ নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুলের বিরুদ্ধে কমলনগরে বিদ্যালয় নির্মানে রডের বদলে বাঁশ, ঘুষ খেয়ে বিল পাস করে মোজাহিদ রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১২০ কোটি টাকার ভুয়া সম্পদ, উধাও ব্যাংক তহবিল বেক্সিকোর শাইনপুকুরকে এলসি খোলার সুযোগ মদনে টিসিবির ডিলার নিয়োগে অনিয়ম চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের যুদ্ধে পাঠাচ্ছে হক ইন্টারন্যাশনাল স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুলের বিরুদ্ধে দরকষাকষি করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ হারের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে যা বললেন এমবাপ্পে

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১২০ কোটি টাকার ভুয়া সম্পদ, উধাও ব্যাংক তহবিল

মারাত্মক আর্থিক কারসাজি, অস্তিত্বহীন সম্পদ, উধাও ব্যাংক তহবিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা আইনি দায় রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-কে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী এবং গোপনীয় নিরীক্ষকদের প্রতিবেদন গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে পলিসিধারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করার একটি পরিকল্পিত কার্যক্রম প্রকাশ পায়।
লক্ষ লক্ষ টাকার ভুয়া সম্পদ তৈরি করে, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডারদের অবৈধ লভ্যাংশ প্রদানের জন্য কৃত্রিম মুনাফা তৈরি করেছে।

এই পুঞ্জীভূত জালিয়াতির ফলে কোম্পানিটি তীব্র তারল্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, যা দেশের বৃহত্তর বীমা খাতের প্রতি জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন কোম্পানির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব এবং সাবেক চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মিতা—সন্দ্বীপের অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য (এমপি)—যার মেয়াদকাল দুর্নীতি, রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শন এবং লাগামহীন আর্থিক অপকর্মের অভিযোগে গভীরভাবে কলঙ্কিত।
সরকারি আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স মোট ৬১৮ কোটি টাকার সম্পদ দাবি করেছিল।
তবে, অডিট দল এবং আর্থিক বিশ্লেষকদের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় প্রকাশ পেয়েছে যে, এই নথিভুক্ত সম্পদের মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি টাকার কোনো বাস্তব বা যাচাইযোগ্য অস্তিত্বই নেই।

বীমা খাতে কর্পোরেট সুশাসনের জন্য নির্ধারিত আদর্শ হিসাবরক্ষণ নীতি এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা অনুসারে, এই অস্তিত্বহীন সম্পদগুলো কোম্পানির লাইফ ফান্ড থেকে অবিলম্বে অবলোপন করা উচিত ছিল। এর পরিবর্তে, ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক ছায়ায় কোম্পানিটি ১২০ কোটি টাকাকে বৈধ সম্পদ হিসেবে খাতায় রেখে দেয় এবং তা ব্যবহার করে ২২.১৩ কোটি টাকার একটি কৃত্রিম উদ্বৃত্ত তৈরি করে।

এই মনগড়া মুনাফাটি এরপর পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ ঘোষণা ও বিতরণের জন্য ব্যবহার করা হয়, যা সাবেক আওয়ামী লীগ সাংসদের ঘনিষ্ঠ মহলকে ব্যাপকভাবে লাভবান করে। বাস্তবে, হিসাব থেকে ১২০ কোটি টাকার ভুয়া সম্পদ বাদ দিলে কোম্পানির প্রকৃত লাইফ ফান্ড কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৭৭ কোটি টাকায়। এর মোট পলিসিধারীর দায় ৪৭২ কোটি টাকার তুলনায় কোম্পানিটি মোটেই উদ্বৃত্তে চলছে না; বরং এটি ৯৮ কোটি টাকার এক বিশাল নিট আর্থিক ঘাটতির সম্মুখীন।

আর্থিক বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা সতর্ক করেছেন যে, শূন্য থেকে কৃত্রিম উদ্বৃত্ত তৈরি করা একটি গুরুতর আর্থিক অপরাধ। এই চর্চাটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত, ভঙ্গুর অবস্থাকে আড়াল করে এবং এর মূলধন শুষে নেয়, যা পুরো তহবিলটিকে সম্পূর্ণরূপে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলার আসন্ন ঝুঁকি তৈরি করে।
আর্থিক খতিয়ানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক লাল সংকেতগুলোর মধ্যে একটি হলো কোম্পানির ব্যাংক আমানতের অবস্থা। রূপালী লাইফ বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৯১.৫১ কোটি টাকা রাখার দাবি করেছিল, যার মধ্যে স্পেশাল নোটিস ডিপোজিট (এসটিডি) অ্যাকাউন্টে ৬৯.০৩ কোটি টাকা এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ২২.৪৮ কোটি টাকা রয়েছে বলে উল্লেখ করে।

তবে, নিরীক্ষকরা যখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাথে সরাসরি এই হিসাব যাচাই করেন, তখন তারা সশরীরে মাত্র ৪৭.৫১ কোটি টাকা খুঁজে পান। বাকি ৪৪ কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল, যার কোনো বৈধ রসিদ, লেনদেনের প্রমাণ বা আইনি নথি ছিল না।
এই বিশাল ঘাটতির কারণে নিরীক্ষা দলটি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে একটি গুরুতর ‘শর্তসাপেক্ষ মতামত’ (Qualified Opinion) দিতে বাধ্য হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই উধাও হয়ে যাওয়া নগদ টাকা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যাংক ব্যালেন্স সংক্রান্ত একই ধরনের গরমিল বারবার নিরীক্ষকদের নজরে আসে—যা প্রতিষ্ঠানটির ওপর মাহফুজুর রহমান মিতার প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণের সাথে সরাসরি জড়িত—তবুও পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ কখনোই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

উপরোক্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। মন্তব্য জানতে চেয়ে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি থেকে কোম্পানির দাপ্তরিক মেইলে একটি ই-মেইল পাঠানো হলেও কেউ সাড়া দেননি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা এমডি মুজিবুরের জনতা ব্যাংকে লুটপাট

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১২০ কোটি টাকার ভুয়া সম্পদ, উধাও ব্যাংক তহবিল

আপডেট সময় ১২:৫৬:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

মারাত্মক আর্থিক কারসাজি, অস্তিত্বহীন সম্পদ, উধাও ব্যাংক তহবিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা আইনি দায় রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-কে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী এবং গোপনীয় নিরীক্ষকদের প্রতিবেদন গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে পলিসিধারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করার একটি পরিকল্পিত কার্যক্রম প্রকাশ পায়।
লক্ষ লক্ষ টাকার ভুয়া সম্পদ তৈরি করে, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডারদের অবৈধ লভ্যাংশ প্রদানের জন্য কৃত্রিম মুনাফা তৈরি করেছে।

এই পুঞ্জীভূত জালিয়াতির ফলে কোম্পানিটি তীব্র তারল্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, যা দেশের বৃহত্তর বীমা খাতের প্রতি জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন কোম্পানির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব এবং সাবেক চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মিতা—সন্দ্বীপের অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য (এমপি)—যার মেয়াদকাল দুর্নীতি, রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শন এবং লাগামহীন আর্থিক অপকর্মের অভিযোগে গভীরভাবে কলঙ্কিত।
সরকারি আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স মোট ৬১৮ কোটি টাকার সম্পদ দাবি করেছিল।
তবে, অডিট দল এবং আর্থিক বিশ্লেষকদের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় প্রকাশ পেয়েছে যে, এই নথিভুক্ত সম্পদের মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি টাকার কোনো বাস্তব বা যাচাইযোগ্য অস্তিত্বই নেই।

বীমা খাতে কর্পোরেট সুশাসনের জন্য নির্ধারিত আদর্শ হিসাবরক্ষণ নীতি এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা অনুসারে, এই অস্তিত্বহীন সম্পদগুলো কোম্পানির লাইফ ফান্ড থেকে অবিলম্বে অবলোপন করা উচিত ছিল। এর পরিবর্তে, ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক ছায়ায় কোম্পানিটি ১২০ কোটি টাকাকে বৈধ সম্পদ হিসেবে খাতায় রেখে দেয় এবং তা ব্যবহার করে ২২.১৩ কোটি টাকার একটি কৃত্রিম উদ্বৃত্ত তৈরি করে।

এই মনগড়া মুনাফাটি এরপর পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ ঘোষণা ও বিতরণের জন্য ব্যবহার করা হয়, যা সাবেক আওয়ামী লীগ সাংসদের ঘনিষ্ঠ মহলকে ব্যাপকভাবে লাভবান করে। বাস্তবে, হিসাব থেকে ১২০ কোটি টাকার ভুয়া সম্পদ বাদ দিলে কোম্পানির প্রকৃত লাইফ ফান্ড কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৭৭ কোটি টাকায়। এর মোট পলিসিধারীর দায় ৪৭২ কোটি টাকার তুলনায় কোম্পানিটি মোটেই উদ্বৃত্তে চলছে না; বরং এটি ৯৮ কোটি টাকার এক বিশাল নিট আর্থিক ঘাটতির সম্মুখীন।

আর্থিক বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা সতর্ক করেছেন যে, শূন্য থেকে কৃত্রিম উদ্বৃত্ত তৈরি করা একটি গুরুতর আর্থিক অপরাধ। এই চর্চাটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত, ভঙ্গুর অবস্থাকে আড়াল করে এবং এর মূলধন শুষে নেয়, যা পুরো তহবিলটিকে সম্পূর্ণরূপে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলার আসন্ন ঝুঁকি তৈরি করে।
আর্থিক খতিয়ানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক লাল সংকেতগুলোর মধ্যে একটি হলো কোম্পানির ব্যাংক আমানতের অবস্থা। রূপালী লাইফ বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৯১.৫১ কোটি টাকা রাখার দাবি করেছিল, যার মধ্যে স্পেশাল নোটিস ডিপোজিট (এসটিডি) অ্যাকাউন্টে ৬৯.০৩ কোটি টাকা এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ২২.৪৮ কোটি টাকা রয়েছে বলে উল্লেখ করে।

তবে, নিরীক্ষকরা যখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাথে সরাসরি এই হিসাব যাচাই করেন, তখন তারা সশরীরে মাত্র ৪৭.৫১ কোটি টাকা খুঁজে পান। বাকি ৪৪ কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল, যার কোনো বৈধ রসিদ, লেনদেনের প্রমাণ বা আইনি নথি ছিল না।
এই বিশাল ঘাটতির কারণে নিরীক্ষা দলটি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে একটি গুরুতর ‘শর্তসাপেক্ষ মতামত’ (Qualified Opinion) দিতে বাধ্য হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই উধাও হয়ে যাওয়া নগদ টাকা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যাংক ব্যালেন্স সংক্রান্ত একই ধরনের গরমিল বারবার নিরীক্ষকদের নজরে আসে—যা প্রতিষ্ঠানটির ওপর মাহফুজুর রহমান মিতার প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণের সাথে সরাসরি জড়িত—তবুও পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ কখনোই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

উপরোক্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। মন্তব্য জানতে চেয়ে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি থেকে কোম্পানির দাপ্তরিক মেইলে একটি ই-মেইল পাঠানো হলেও কেউ সাড়া দেননি।