ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দুই দেশের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সবুজ হাইড্রোজেন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলে উভয় দেশই লাভবান হবে।
বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ভারত অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বিষয়ক এক ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মোদি। বুধবার রাতে তিনি মেলবোর্নে পৌঁছান। মোদি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার উন্নত প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ভারতের জ্বালানি খাতের রূপান্তর আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে। তিনি কম-কার্বন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন প্রকল্পেও দুই দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও খনিজ খাতে যৌথভাবে কাজ করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তার ভাষায়, এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসায়ীদের ভারতের সড়ক, বন্দর, রেলপথ এবং নগর অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য ভারত একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির দেশ।
তাই অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগকারীদের সামনে ভারতের বাজার বড় সুযোগ তৈরি করছে।
মোদির এই সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন ভারত ও অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করতে চায়। ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণে দেশটি অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ইউরেনিয়াম মজুদের দিকে নজর দিচ্ছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়াও তাদের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় পেনশন তহবিল ‘অস্ট্রেলিয়ানসুপার’ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে আরো ৫০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার বিনিয়োগ করবে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। এদিকে অস্ট্রেলিয়ান ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ পত্রিকা জানিয়েছে, ভারতকে ইউরেনিয়াম রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৪ সালে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হলেও এরপর ইউরেনিয়াম রপ্তানি সীমিত ছিল। কারণ, এই জ্বালানি শুধু শান্তিপূর্ণ কাজে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ তাকে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে ‘জীবন্ত সেতু’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, মোদির নেতৃত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আজ বৃহস্পতিবার দুই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর ভারত অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রবাসী সম্প্রদায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৩ সালের সফরের ধারাবাহিকতায় এবারও মেলবোর্নের একটি বড় স্টেডিয়ামে প্রবাসী ভারতীয়দের সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে মোদির। সেখানে হাজারো মানুষের উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম জানিয়েছে, কিছু বিক্ষোভের আশঙ্কা থাকায় স্টেডিয়ামের আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিদেশ সফরে বড় জনসমাবেশে বক্তব্য দেওয়া মোদির জন্য নতুন নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ভারতীয়দের বড় বড় সমাবেশে তিনি ভাষণ দিয়েছেন। তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরের সময়ও সিডনির একটি বড় ইনডোর স্টেডিয়ামে হাজারো সমর্থক তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
ইন্দোনেশিয়া সফর শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছান মোদি। ইন্দোনেশিয়ায় তিনি কৃষি ও প্রতিরক্ষা খাতে একাধিক চুক্তি সই করেন। এর মধ্যে ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি চুক্তিও ছিল। অস্ট্রেলিয়া সফর শেষ করে শুক্রবার দুপুরে তিনি নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন। এরপর সেখান থেকে ভারতে ফিরবেন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 






















