রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাসে ভূমি উন্নয়নের আড়ালে সংঘটিত গাছ নিধনকে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক। বিভিন্ন নথি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দাবি উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তালিকাভুক্ত হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছের কোনো হিসাব মিলছে না। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মূল্যবান গাছ বন বিভাগের অনুমতি ও যথাযথ নিলাম প্রক্রিয়া ছাড়াই কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারের কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ২০৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণের আগে জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ জরিপে সেখানে মোট ২৫ হাজার ৮৪২টি ফলজ ও বনজ গাছ তালিকাভুক্ত করা হয়। তালিকায় আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, নিম, অর্জুন, কড়ই, তেঁতুল, সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছের উল্লেখ ছিল। সরকারি নথিতে এসব গাছের মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং জমির মালিকদের গাছের ক্ষতিপূরণ বাবদ জেলা প্রশাসন মোট ২ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় গাছ কাটার কাজ। অভিযোগকারীদের দাবি, গাছ কাটার আগে বন বিভাগের অনুমোদন কিংবা উন্মুক্ত নিলামের যে বিধান রয়েছে, তা অনুসরণ করা হয়নি। বরং ধাপে ধাপে বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে গোপনে বিক্রি করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক ট্রাকে করে গাছ সরিয়ে নেওয়া হলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নিলামের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তিন দফায় গাছ নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম দফায় ১ হাজার ৮৫৩টি, দ্বিতীয় দফায় ৭১৩টি এবং তৃতীয় দফায় ৭৬টি গাছ নিলামে বিক্রি করা হয়। তিন দফায় মোট ২ হাজার ৬৪২টি গাছ বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
তবে এখানেই দেখা দেয় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, প্রাথমিক জরিপে তালিকাভুক্ত গাছের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৮৪২টি। নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৪২টি। পরে ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, অবশিষ্ট রয়েছে আনুমানিক ৫০০টি গাছ। অর্থাৎ নিলামকৃত গাছ এবং বিদ্যমান গাছ মিলিয়ে হিসাব দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২টি। সে হিসাবে তালিকাভুক্ত গাছের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ৭০০টির কোনো অস্তিত্ব বা হিসাব পাওয়া যায় না।
এই বিশাল সংখ্যক গাছ কোথায় গেল—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি। অভিযোগকারীদের মতে, এ গাছগুলোই পরিকল্পিতভাবে কেটে বিক্রি করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সরকারি নথিতে যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেই হিসাবে এবং পরবর্তীতে নিলামে বিক্রির অর্থ বিবেচনা করলে প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকার গাছের কোনো হিসাব পাওয়া যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, ভূমি উন্নয়নের নামে পরিচালিত পুরো কার্যক্রমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক। তিনি একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছিলেন। ফলে প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, গাছ অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমের সামগ্রিক তদারকির দায়িত্ব তাঁর ওপরই বর্তায় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গাছ কাটার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের আম বিক্রি, জমি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা জবাবদিহি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনকে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় যেখানে সারিবদ্ধভাবে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছ ছিল, সেখানে এখন বিশাল অংশ ফাঁকা। অনেক স্থানে কেবল গাছের পুরোনো গোড়ার চিহ্ন দেখা যায়। পরিবেশবিদদের মতে, যদি তালিকাভুক্ত অধিকাংশ গাছ সত্যিই অপসারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে এর পরিবেশগত প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে। একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গে এমন ব্যাপক গাছ নিধনের অভিযোগ সাংঘর্ষিক বলেও তারা মত দেন।
অন্যদিকে, অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ক্যাম্পাস উন্নয়নের প্রয়োজনেই নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী গাছ কাটা হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ক্যাম্পাসে ৫১ শতাংশ অবকাঠামো এবং ৪৯ শতাংশ সবুজায়ন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবি, নিলাম ছাড়া গোপনে গাছ বিক্রি কিংবা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাছ রয়েছে এবং প্রকৌশল দপ্তর এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারবে।
তবে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যদি প্রকৃতপক্ষে ২৫ হাজার ৮৪২টি গাছের অধিকাংশ বৈধ প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই গাছগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিলাম রেকর্ড, বন বিভাগের অনুমোদন, বিক্রয়মূল্য এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন। তাঁদের মতে, এ তথ্য প্রকাশ করা হলে পুরো বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে গাছের প্রকৃত সংখ্যা, অপসারণের প্রক্রিয়া, বিক্রির অর্থ এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব কার ছিল—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, জনস্বার্থেরও বিষয়। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
একদিকে নথিভুক্ত গাছের সংখ্যা, নিলামে বিক্রি হওয়া গাছ এবং বর্তমানে বিদ্যমান গাছের হিসাবে বড় ধরনের ব্যবধানের কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করছে। ফলে পুরো বিষয়টির সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















