গণপূর্ত অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঠিকাদারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গঠন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কয়েকজন ঠিকাদারের সহযোগিতায় একাধিক নারীর সঙ্গে কথিত “মুতা বিয়ে” করেন এবং সরকারি পদমর্যাদার প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৌশলী কামরুল হাসান স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা আওয়ামী লীগের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করতেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার দরিদ্র পরিবারের তরুণীদের সঙ্গে কামরুল হাসানের পরিচয় করিয়ে দিতেন। পরে নির্দিষ্ট অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করে কথিত “মুতা বিয়ে”র মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য সম্পর্ক স্থাপন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের একাধিক বিয়ে তিনি করেছেন এবং নোয়াখালী ছাড়াও কর্মস্থল পরিবর্তনের পরও একই ধরনের কর্মকাণ্ডের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
প্রসঙ্গত, মুতা বিয়ে বা নিকাহুল মুতা শিয়া ইসলামি আইনশাস্ত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্পাদিত এক ধরনের বৈবাহিক চুক্তি হিসেবে স্বীকৃত হলেও সুন্নি ইসলামি মতবাদে এটি বৈধ নয় এবং অধিকাংশ সুন্নি আলেম একে নিষিদ্ধ বলে মনে করেন।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নোয়াখালীর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ মামুন এসব কর্মকাণ্ডে প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নামে নোয়াখালীর মাইজদীতে নির্মিত একটি তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন সময়ে কামরুল হাসান অবস্থান করতেন।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকার বসুন্ধরা রিভারভিউ এলাকার সারীঘাট পয়েন্টে কামরুল হাসানের একটি দোতলা বাড়ি এবং কয়েক বিঘা জমি রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই বাড়ির একটি অংশ নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানেও তিনি বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিজের নামে সম্পদ না রেখে আত্মীয়স্বজনের নামেও বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন কামরুল হাসান। অভিযোগ অনুযায়ী, তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের স্ত্রীর নামেও সম্পদ রয়েছে। এছাড়া পিরোজপুরে তার স্ত্রী ডা. জান্নাতুল মাওয়া টুম্পার পরিচালনায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল, নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপে একটি নির্মাণাধীন রিসোর্ট এবং পিরোজপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়দের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের বৈধতা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালে অধস্তন এক উপসহকারী প্রকৌশলীর স্ত্রীর সঙ্গে কামরুল হাসানের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় পাঠিয়ে তার অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নারীর সঙ্গে সময় কাটাতেন তিনি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে ওই দম্পতির পারিবারিক সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৌশলী কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে এ ধরনের আরও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দাবি রাখে।
অন্যদিকে, বিসিএস ২৭তম ব্যাচের এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাব খাটাতেন।
এ বিষয়ে একটি নথিরও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক প্রত্যয়নপত্রে কামরুল হাসানকে বুয়েট ছাত্রলীগ শাখার ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















