বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ এক সমস্যার নাম মাদকাসক্তি। মাদকের কড়াল গ্রাসে সম্ভাবনাময় তারুণ্যের বড় একটা অংশের কর্মদক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পৃথিবী। আর এই মাদকের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে গাঁজা। পুরো বিশ্বে সাড়ে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়মিত সেবন করছেন মাদকটি। আফিম, অ্যামফিটামিন, কোকেন ও এক্সট্যাসির মতো ভয়ংকর মাদকগুলোর সম্মিলিত সেবনকারীদের চেয়েও এই সংখ্যা অনেক বেশি।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই তথ্য।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশকের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ব্যবহারের হার ২০১৪ সালে যেখানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যার ৩.৮ শতাংশ মাদকটি সেবন করত, সেখানে ২০২৪ সাল নাগাদ তা ৪.৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই ১০ থেকে ১২ বছরে গাঁজা সম্পর্কে মানুষের ধারণার যেমন পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি পাচারের নতুন পদ্ধতির কারণে এর সেবনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউএনওডিসির মতে, গাঁজার উৎপাদন, পাচার এবং ব্যবহার—সবই বিবর্তিত হচ্ছে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, মাদকটির প্রতি মানুষের ধারণার চলমান পরিবর্তন। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার মতো অনেক দেশের বিচারব্যবস্থা গাঁজাকে বৈধকরণ এবং অপরাধমুক্তকরণের নীতি গ্রহণ করায় এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে, গাঁজার বেশিরভাগ পাচারই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে, উত্তর আমেরিকা থেকে অবাধ সরবরাহ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকার বাইরের ৫৭টি দেশ বা অঞ্চল গাঁজা জব্দের উৎস অঞ্চল হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেছে, যা পূর্ববর্তী দশকে ছিল মাত্র ১১টি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদিও বিশ্বব্যাপী গাঁজার ব্যবহার ব্যাপক, তবে গত এক বছরে গাঁজা ব্যবহারের হার উত্তর আমেরিকায় সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে কানাডার ৩২.৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৬.৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার দেখা গেছে। সব মিলিয়ে মহাদেশটিতে গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যা ৭ কোটির কাছাকাছি (৬ কোটি ৯৩ লাখ)।
মহাদেশের হিসেবে উত্তর আমেরিকার পরই সবচেয়ে বেশি গাঁজা সেবনকারী পাওয়া গেছে এশিয়ায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, মহাদেশটিতে নিয়মিত গাঁজা সেবন করে থাকেন ৬ কোটি ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ। গাঁজা সেবনের দিক থেকে পরের অবস্থানেই আছে আফ্রিকা। মহাদেশটিতে গাঁজায় আসক্ত ৬ কোটি ৫১ লাখেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে ইউরোপে ৩ কোটি ১৩ লাখ, দক্ষিণ আমেরিকায় ১ কোটি ৫৭ লাখ এবং ওশেনিয়ায় সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ গাঁজা সেবন করে থাকেন নিয়মিত।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড (১৪.১ শতাংশ), স্পেন (১২.৬ শতাংশ), উরুগুয়ে (১২.৩ শতাংশ) এবং অস্ট্রেলিয়াতেও (১১.৫ শতাংশ) গাজার ব্যাপক ব্যপ্তি লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশেও মাদক বিস্তারের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, দেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যাই প্রায় ৬১ লাখ। এছাড়া, ইয়াবা, অ্যালকোহল, কফ সিরাপ, হেরোইনসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক সেবন চলছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছে। এতে দেশের ৮ বিভাগে ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, ময়মনসিংহ (৬.০২ শতাংশ), রংপুর (৬.০০ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ) বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সর্বোচ্চ। তবে, সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী আছে ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২.৯ লাখ।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদকসেবীদের অধিকাংশই তরুণ। গবেষণা অনুসারে, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮-১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮-২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন সামাজিক কারণে মাদক সেবন বাড়ছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছে মাদক সহজলভ্য।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। সেবাদানের অভাবে অনেকেই মাদক ছাড়তে ব্যর্থ হচ্ছেন। ৬৯ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা চেয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। তাই রাজনৈতিক সংকল্প এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, বর্তমানে দেশের মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তির ঝুঁকি বেড়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ৭ বিভাগে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র চালুর অনুমোদন দিয়েছে। পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদক নির্মূল নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 





















