ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আতাহার-কে কেন্দ্র করে অনিয়ম-দুর্নীতি, বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগে প্রভাব বিস্তার এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র, অভিযোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অনুসন্ধানী দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন, নামে-বেনামে সম্পদ অর্জন, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বদলির ক্ষেত্রে অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অনিয়ম। এসব অভিযোগের পরও দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর কোনো সমাধান বা দৃশ্যমান তদন্ত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, আতাহার দীর্ঘদিন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন। ফায়ার সার্ভিসের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণ কাজ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, নিম্নমানের কাজ এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রকল্প থেকে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে নামে-বেনামে সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পরও একই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলো বলছে, আতাহার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিসে একটি ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যা বদলি, পদায়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফায়ার ফাইটার, লিডার, ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট স্টেশনে বদলি, সুবিধাজনক পদায়ন কিংবা কাঙ্ক্ষিত এলাকায় পোস্টিং পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। যারা অর্থ দিতে ব্যর্থ হন, তাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং দূরবর্তী বা অসুবিধাজনক স্থানে বদলির ভয় দেখানো হয়।
একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আসন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের পাস করানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সারাদেশে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রার্থী খোঁজার কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে নিয়োগ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমান মহাপরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও আতাহার এবং তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে পুরো অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হয় আতাহার-এর ঘনিষ্ঠ ফায়ার ফাইটার মো. সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে। বর্তমানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত থাকায় বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ স্থাপন এবং তদবির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এই প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন এবং অনেকে তাকে “ক্যাশিয়ার” হিসেবে অভিহিত করেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত ও প্রতিবেদনে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। বিশেষ করে একটি শিল্পগ্রুপের প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দীর্ঘদিনেও প্রকাশ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই তদন্ত প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট পক্ষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সেখানে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে আতাহার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পরিবারের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই পদ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত নথি বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বদলি, পদায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে বদলি, পদোন্নতি স্থগিত বা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে যদি অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে তা সরাসরি জনসাধারণের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে। তারা মনে করেন, দক্ষ জনবল নিয়োগ বাধাগ্রস্ত হলে দুর্যোগ মোকাবিলা ও জরুরি সেবা প্রদানে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা কমে যাবে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও হুমকির বিষয়টি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর একাধিক সাংবাদিককে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন এটি একটি পরিকল্পিত ভয়ভীতি প্রদর্শনের অংশ।
সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরে একটি জটিল প্রশাসনিক ও আর্থিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আতাহার এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী। তারা বলছেন, যদি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত না করা হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত আতাহার অভিযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে হেয় করার জন্য একটি চক্র এসব প্রচার করছে। তিনি আরও বলেন, তিনি কোনো ধরনের বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন।
ফায়ার সার্ভিসের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অভিযোগকারীরা মনে করেন, পুরো বিষয়টি যদি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হয়, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তারা দ্রুত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সব অভিযোগ যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
সবশেষে অভিযোগকারীরা বলছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং জনআস্থা রক্ষার স্বার্থে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় ফায়ার সার্ভিসের মতো জীবনরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তা ও জরুরি সেবায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
ফায়ার সার্ভিসে অনিয়ম-দুর্নীতির সিন্ডিকেটের ‘মাস্টারমাইন্ড’ আতাহার
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৬:৩৭:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
- ৫৪১ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















