সংবাদ শিরোনাম ::
লীগপন্থী ঠিকাদারদের অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত পরিচালক আব্দুর রহিম বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য থেকে বনভূমি দখল: বন কর্মকর্তা হোসাইন নিশাতের ‘শত কোটির দুর্নীতি সাম্রাজ্য’ চাঁদা না পেয়ে অ’ন্তঃসত্ত্বা নারীকে মা’রধরের অভিযোগ, বিএনপি নেতা দোলনের বি’রুদ্ধে মা’মলা সরকারি জমিতে গড়ে উঠল বহুতল ভবন ‘সানভিউ বিধি ভেঙে আরএমও পদায়ন, ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে টেস্ট সিন্ডিকেটের অভিযোগ ইডকলে এনামুলের বিরুদ্ধে লুটপাটের রাজত্বের অভিযোগ সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক জালিয়াতি করে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বাশার-মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সিএন্ডএফ ক্লিয়ারিং বাণিজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দুই মাসে ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা টিকে গ্রুপের

বিধি ভেঙে আরএমও পদায়ন, ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে টেস্ট সিন্ডিকেটের অভিযোগ

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ও পকেট এখন জিম্মি এক অভিনব ‘কোড নাম’ সিন্ডিকেটের কাছে। যার মূলে রয়েছেন হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিন (PIMS কোড: ১৪৩৬৩৫)। সরকারি বিধিমালা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেনেশুনে জুনিয়র কর্মকর্তা হয়েও প্রশাসনিক পদ দখল, ছদ্মনামে টেস্ট বাণিজ্য, সরকারি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকের শেয়ার কেনা এবং নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে দিয়েই দুর্নীতির তদন্ত কমিটি গঠনের মতো একের পর এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণ মিলেছে এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন ও পদায়ন বিধিমালা অনুযায়ী, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও (RMO) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি প্রশাসনিক পদ। এই পদে পদায়নের জন্য একজন চিকিৎসকের ন্যূনতম ৫ থেকে ৮ বছরের মাঠপর্যায়ের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হয় অথবা তাকে ৯ম গ্রেডের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবে উত্তীর্ণ হতে হয়।

তাছাড়া, ডাঃ নাছির উদ্দিন ৩৯তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, যার চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং: ৪৫.১৪৩.০১১.০১.০০.০০২.২০১৯-৭৭৩) জারি হয়েছিল ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে। এই বিশেষ বিসিএস-এর প্রধান ও অপরিবর্তনীয় শর্তই ছিল—যোগদানের পর প্রথম ২ বছর বাধ্যতামূলকভাবে গ্রামীণ বা প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (যেমন: ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতাল) সাধারণ ‘সহকারী সার্জন’ হিসেবে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এই সময়সীমা বা ‘ফিল্ড সার্ভিস পিরিয়ড’ পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো ধরণের প্রশাসনিক পদায়ন, ডেপুটেশন বা লবিংয়ের মাধ্যমে বদলি হওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ।

অথচ নথিপত্র এবং ওনার অফিশিয়াল সার্ভিস প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৫ আগস্ট যখন তিনি ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরএমও পদের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসেন, তখন সরকারি চাকরিতে তার মোট প্রকৃত অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১ বছর ৯ মাস (অনূর্ধ্ব ২ বছর)! বাধ্যতামূলক গ্রামীণ সেবা শেষ করার আগেই, তৎকালীন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীমের আত্মীয় (ভাগিনা) পরিচয় খাটিয়ে শরীয়তপুর জেলার বহু সিনিয়র ও নিয়মিত বিসিএস (যেমন: ৩৩ বা ৩৫তম বিসিএস) ক্যাডারের যোগ্য চিকিৎসকদের টপকে (Supersede করে) তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে এই প্রশাসনিক পদটি বাগিয়ে নেন।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা গরিব ও অসহায় রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে (প্রেসক্রিপশন) ডাঃ নাছির উদ্দিন সরাসরি নিজের পুরো নাম ব্যবহার করেন না। সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের চোখ এড়াতে এবং দাপ্তরিক প্রমাণ লুকাতে তিনি প্রেসক্রিপশনে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার রশিদে কৌশলে ‘এম উদ্দিন’ (M Uddin) কোড নাম ব্যবহার করেন।

হাসপাতাল সংলগ্ন নির্দিষ্ট প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো এই ‘এম উদ্দিন’ কোড দেখে নিশ্চিত হতো যে রোগীটি আরএমও মহোদয় পাঠিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে তারা প্রতি টেস্টে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ বা মোটা অঙ্কের কমিশন ওনার নিকট পৌঁছে দিত, যা হাসপাতালের ভেতরে বসে প্রকাশ্য ডায়াগনস্টিক বাণিজ্যের এক অকাট্য দালিলিক প্রমাণ।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর ধারা ১৫(১) ও ১৫(৩) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া লাভজনক কোনো বেসরকারি ব্যবসা, ঠিকাদারি বা বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা শেয়ারের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারেন না। কিন্তু ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিন এই আইনের তোয়াক্কাই করেননি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাদারীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক শ্যামল চন্দ্র সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত আকস্মিক অভিযানে ইতিমধ্যে দাপ্তরিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, hospital সংলগ্ন “মডার্ন ক্লিনিক’ এবং একাধিক ফার্মেসিতে ডাঃ নাছির উদ্দিনের নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বড় অঙ্কের অবৈধ শেয়ার ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব রয়েছে। শুধু তাই নয়, গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে স্থানীয় ‘পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’এ ডাঃ নাছির উদ্দিনের ২টি বাণিজ্যিক শেয়ার রয়েছে। এই টেস্ট বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু বাইরে নিরপেক্ষতার নাটক সাজালেও, সিভিল সার্জন ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি অভিযুক্ত ডাঃ নাছিরের পক্ষাবলম্বন করে কাজ করছেন এবং তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। ওনার এই দ্বিমুখী ভূমিকা ও পক্ষপাতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে এই বিতর্কিত তদন্ত কমিটির গঠন প্রক্রিয়ায়।

কমিটির সভাপতি করা হয়েছে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের ইউএইচএফপিও সদস্য সচিব ডাঃ কাওসার আহমেদ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তদন্ত কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য করা হয়েছে ডাঃ আকরাম এলাহী কে। নথিপত্র ও বাণিজ্যিক রেজিস্ট্রি ঘেঁটে দেখা গেছে, এই ডাঃ আকরাম এলাহী স্বয়ং নিজেই ওই ‘পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বর্তমান চেয়ারম্যান এবং তার পরিবারের নামে রয়েছে সেখানে ৫টি বাণিজ্যিক শেয়ার রয়েছে!অর্থাৎ, ডাঃ নাছির উদ্দিনের যে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ২ টি শেয়ারহোল্ডার এবং যেখানে তিনি নিয়মিত রোগী পাঠিয়ে ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে commission খান, সেই একই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে সদস্য বানিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন সিভিল সার্জন! চোর ধরার তদন্তে চোরের ব্যবসায়িক অংশীদারকে যুক্ত করার এই নজিরবিহীন ঘটনাটি সিভিল সার্জনের নিরপেক্ষতাকে সম্পূর্ণ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, ডাঃ নাছিরকে নির্দোষ প্রমাণ করে একটি মনগড়া ও অনুকূল প্রতিবেদন তৈরি করার উদ্দেশ্যেই সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ওনার আজ্ঞাবহ এই পকেট কমিটি সাজিয়েছেন। এই বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ওনার গঠিত কমিটির পক্ষে সাফাই গেয়ে দায়সারাভাবে বলেন, একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ভিত্তিতে বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া এবং প্রতিবেদন আমাদের হাতে না আসা পর্যন্ত এই মুহূর্তে ওনার দোষ বা গুণ নিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসময় কতদিনের সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে কিনা তখন তিনি বলেন ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তবে সিভিল সার্জন নিরপেক্ষতার দাবি করলেও, অভিযুক্তের ব্যবসায়িক পার্টনারকে কমিটিতে রাখার মাধ্যমে তিনি যে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

এদিকে বর্তমান ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম অভিযুক্ত ডাঃ নাছির উদ্দিনের পক্ষে সাফাই গেয়ে তদন্তের রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে সিভিল সার্জন এবং তদন্ত কমিটির প্রধান ও সদস্যদের উপর জোর সুপারিশ ও তদবির করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে! এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র তিন মাস হলো। এর মধ্যে আমি ওনাকে আরএমও হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো দিয়েছি, তিনি সেগুলো দেখাশোনা করছেন। এর বাইরে কোনো লিখিত অভিযোগ আমি এখন পর্যন্ত পাইনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।”

আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম ৩ মাস আগে আসার অজুহাতে কোনোভাবেই এই গুরুতর বিষয় থেকে দায় এড়াতে পারেন না। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতর কোনো আরএমও-র বিরুদ্ধে স্বয়ং দুদক ও সিভিল সার্জনের তদন্ত চলমান থাকলে বা ছদ্মনামে টেস্ট বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, তিনি তদন্তাধীন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব বহাল রাখতে পারেন না। ওনার এই ভূমিকা এবং “অভিযোগ পাইনি” মর্মে সাফাই গাওয়া মূলত অভিযুক্তকে বাঁচানোর এক স্পষ্ট অপচেষ্টা।

একজন সরকারি ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিনের মাসিক মূল এবং সরকারি ভাতা মিলিয়ে বার্ষিক বৈধ আয় কোনোভাবেই তার বর্তমান বিলাসী জীবনযাত্রা এবং পারিবারিক সম্পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওনার এবং ওনার স্ত্রী শামসুন্নাহারের আয়কর নথি (ট্যাক্স ফাইল) পর্যালোচনা করে এক বিশাল আর্থিক অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে।

ওনার দাখিলকৃত ২১-২২ ও ২৪-২৫ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন ফাইল মেলালে দেখা যায়, তিনি তার মডার্ন ক্লিনিক এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা ক্যাশ ইনপ্রবাহের বড় একটি অংশ কর নথিতে সম্পূর্ণ গোপন করেছেন। এছাড়াও ওনার স্ত্রী শামসুন্নাহারের নামে গত ৩ বছরে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে, যার কোনো বৈধ উৎস বা ‘সোর্স অফ ফান্ড’ কর নথিতে দেখাতে পারেননি তারা।

দুদকের মাদারীপুর আঞ্চলিক কার্যালয় ওনার এই কর ফাঁকি এবং নামে-বেনামে করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ফাইলটি বর্তমানে গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। এদিকে, ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে এবং এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রক্ষা করতে ডাঃ নাছির উদ্দিন রাতারাতি সাবেক আওয়ামী উপমন্ত্রীর ভাগিনা পরিচয় মুছে ফেলে নিজেকে ‘জামায়াতে ইসলামী’ ঘরানার লোক হিসেবে জাহির করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন, যাতে রাজনৈতিক খোলস বদলে এই তদন্তের গতি থমকে দেওয়া যায়।

স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম মিলে ওনার পক্ষে কাজ করা ও এই দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, পুরো অনিয়মের খতিয়ান এখন সরাসরি ঢাকা মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের টেবিলে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি বরাবর ইতিমধ্যেই একটি লিখিত অবগতি পত্র জমা দিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে ডা. নাছিরের বিরুদ্ধে ওঠা সকল সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির প্রমাণাদি সংযুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জনের এই পক্ষপাতমূলক ও মনগড়ো তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানতে পেরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি অত্যন্ত কড়া ও হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেখেন, আমি একজন নিউরোসার্জন। আমাকে এই চেয়ারে বসানোই হয়েছে স্বাস্থ্য খাতের এই ধরণের চোর আর দুর্নীতিবাজদের ধরার জন্য। শরীয়তপুরের সিভিল সার্জনও যদি ওনার মনমতো তদন্ত কমিটি সাজিয়ে অভিযুক্তের পক্ষে কোনো পার পাওয়ার প্রতিবেদন বা দায়সারা রিপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে বিষয়টি অবশ্যই আমাকে সরাসরি অবগত করবেন। আমরা এখানে চোর ধরার জন্যই বসে আছি। চোর বা দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন, তার পেছনে যত বড় প্রশাসনিক বা স্থানীয় হাতই থাকুক না কেন কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিচালক (প্রশাসন)-এর এমন কঠোর ও নীতিগত অবস্থানের পর স্থানীয়ভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেও সিভিল সার্জন ও ভেদরগঞ্জের এই ‘এম উদ্দিন’ সিন্ডিকেটের শেষ রক্ষা হবে না বলেই মনে করছে সচেতন মহল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লীগপন্থী ঠিকাদারদের অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত পরিচালক আব্দুর রহিম

বিধি ভেঙে আরএমও পদায়ন, ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে টেস্ট সিন্ডিকেটের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ও পকেট এখন জিম্মি এক অভিনব ‘কোড নাম’ সিন্ডিকেটের কাছে। যার মূলে রয়েছেন হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিন (PIMS কোড: ১৪৩৬৩৫)। সরকারি বিধিমালা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেনেশুনে জুনিয়র কর্মকর্তা হয়েও প্রশাসনিক পদ দখল, ছদ্মনামে টেস্ট বাণিজ্য, সরকারি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকের শেয়ার কেনা এবং নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে দিয়েই দুর্নীতির তদন্ত কমিটি গঠনের মতো একের পর এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণ মিলেছে এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন ও পদায়ন বিধিমালা অনুযায়ী, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও (RMO) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি প্রশাসনিক পদ। এই পদে পদায়নের জন্য একজন চিকিৎসকের ন্যূনতম ৫ থেকে ৮ বছরের মাঠপর্যায়ের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হয় অথবা তাকে ৯ম গ্রেডের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবে উত্তীর্ণ হতে হয়।

তাছাড়া, ডাঃ নাছির উদ্দিন ৩৯তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, যার চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং: ৪৫.১৪৩.০১১.০১.০০.০০২.২০১৯-৭৭৩) জারি হয়েছিল ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে। এই বিশেষ বিসিএস-এর প্রধান ও অপরিবর্তনীয় শর্তই ছিল—যোগদানের পর প্রথম ২ বছর বাধ্যতামূলকভাবে গ্রামীণ বা প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (যেমন: ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতাল) সাধারণ ‘সহকারী সার্জন’ হিসেবে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এই সময়সীমা বা ‘ফিল্ড সার্ভিস পিরিয়ড’ পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো ধরণের প্রশাসনিক পদায়ন, ডেপুটেশন বা লবিংয়ের মাধ্যমে বদলি হওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ।

অথচ নথিপত্র এবং ওনার অফিশিয়াল সার্ভিস প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৫ আগস্ট যখন তিনি ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরএমও পদের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসেন, তখন সরকারি চাকরিতে তার মোট প্রকৃত অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১ বছর ৯ মাস (অনূর্ধ্ব ২ বছর)! বাধ্যতামূলক গ্রামীণ সেবা শেষ করার আগেই, তৎকালীন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীমের আত্মীয় (ভাগিনা) পরিচয় খাটিয়ে শরীয়তপুর জেলার বহু সিনিয়র ও নিয়মিত বিসিএস (যেমন: ৩৩ বা ৩৫তম বিসিএস) ক্যাডারের যোগ্য চিকিৎসকদের টপকে (Supersede করে) তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে এই প্রশাসনিক পদটি বাগিয়ে নেন।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা গরিব ও অসহায় রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে (প্রেসক্রিপশন) ডাঃ নাছির উদ্দিন সরাসরি নিজের পুরো নাম ব্যবহার করেন না। সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের চোখ এড়াতে এবং দাপ্তরিক প্রমাণ লুকাতে তিনি প্রেসক্রিপশনে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার রশিদে কৌশলে ‘এম উদ্দিন’ (M Uddin) কোড নাম ব্যবহার করেন।

হাসপাতাল সংলগ্ন নির্দিষ্ট প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো এই ‘এম উদ্দিন’ কোড দেখে নিশ্চিত হতো যে রোগীটি আরএমও মহোদয় পাঠিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে তারা প্রতি টেস্টে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ বা মোটা অঙ্কের কমিশন ওনার নিকট পৌঁছে দিত, যা হাসপাতালের ভেতরে বসে প্রকাশ্য ডায়াগনস্টিক বাণিজ্যের এক অকাট্য দালিলিক প্রমাণ।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর ধারা ১৫(১) ও ১৫(৩) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া লাভজনক কোনো বেসরকারি ব্যবসা, ঠিকাদারি বা বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা শেয়ারের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারেন না। কিন্তু ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিন এই আইনের তোয়াক্কাই করেননি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাদারীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক শ্যামল চন্দ্র সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত আকস্মিক অভিযানে ইতিমধ্যে দাপ্তরিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, hospital সংলগ্ন “মডার্ন ক্লিনিক’ এবং একাধিক ফার্মেসিতে ডাঃ নাছির উদ্দিনের নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বড় অঙ্কের অবৈধ শেয়ার ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব রয়েছে। শুধু তাই নয়, গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে স্থানীয় ‘পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’এ ডাঃ নাছির উদ্দিনের ২টি বাণিজ্যিক শেয়ার রয়েছে। এই টেস্ট বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু বাইরে নিরপেক্ষতার নাটক সাজালেও, সিভিল সার্জন ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি অভিযুক্ত ডাঃ নাছিরের পক্ষাবলম্বন করে কাজ করছেন এবং তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। ওনার এই দ্বিমুখী ভূমিকা ও পক্ষপাতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে এই বিতর্কিত তদন্ত কমিটির গঠন প্রক্রিয়ায়।

কমিটির সভাপতি করা হয়েছে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের ইউএইচএফপিও সদস্য সচিব ডাঃ কাওসার আহমেদ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তদন্ত কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য করা হয়েছে ডাঃ আকরাম এলাহী কে। নথিপত্র ও বাণিজ্যিক রেজিস্ট্রি ঘেঁটে দেখা গেছে, এই ডাঃ আকরাম এলাহী স্বয়ং নিজেই ওই ‘পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বর্তমান চেয়ারম্যান এবং তার পরিবারের নামে রয়েছে সেখানে ৫টি বাণিজ্যিক শেয়ার রয়েছে!অর্থাৎ, ডাঃ নাছির উদ্দিনের যে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ২ টি শেয়ারহোল্ডার এবং যেখানে তিনি নিয়মিত রোগী পাঠিয়ে ‘এম উদ্দিন’ ছদ্মনামে commission খান, সেই একই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে সদস্য বানিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন সিভিল সার্জন! চোর ধরার তদন্তে চোরের ব্যবসায়িক অংশীদারকে যুক্ত করার এই নজিরবিহীন ঘটনাটি সিভিল সার্জনের নিরপেক্ষতাকে সম্পূর্ণ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, ডাঃ নাছিরকে নির্দোষ প্রমাণ করে একটি মনগড়া ও অনুকূল প্রতিবেদন তৈরি করার উদ্দেশ্যেই সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ওনার আজ্ঞাবহ এই পকেট কমিটি সাজিয়েছেন। এই বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন ওনার গঠিত কমিটির পক্ষে সাফাই গেয়ে দায়সারাভাবে বলেন, একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ভিত্তিতে বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া এবং প্রতিবেদন আমাদের হাতে না আসা পর্যন্ত এই মুহূর্তে ওনার দোষ বা গুণ নিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসময় কতদিনের সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে কিনা তখন তিনি বলেন ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তবে সিভিল সার্জন নিরপেক্ষতার দাবি করলেও, অভিযুক্তের ব্যবসায়িক পার্টনারকে কমিটিতে রাখার মাধ্যমে তিনি যে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

এদিকে বর্তমান ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম অভিযুক্ত ডাঃ নাছির উদ্দিনের পক্ষে সাফাই গেয়ে তদন্তের রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে সিভিল সার্জন এবং তদন্ত কমিটির প্রধান ও সদস্যদের উপর জোর সুপারিশ ও তদবির করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে! এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র তিন মাস হলো। এর মধ্যে আমি ওনাকে আরএমও হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো দিয়েছি, তিনি সেগুলো দেখাশোনা করছেন। এর বাইরে কোনো লিখিত অভিযোগ আমি এখন পর্যন্ত পাইনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।”

আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম ৩ মাস আগে আসার অজুহাতে কোনোভাবেই এই গুরুতর বিষয় থেকে দায় এড়াতে পারেন না। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতর কোনো আরএমও-র বিরুদ্ধে স্বয়ং দুদক ও সিভিল সার্জনের তদন্ত চলমান থাকলে বা ছদ্মনামে টেস্ট বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, তিনি তদন্তাধীন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব বহাল রাখতে পারেন না। ওনার এই ভূমিকা এবং “অভিযোগ পাইনি” মর্মে সাফাই গাওয়া মূলত অভিযুক্তকে বাঁচানোর এক স্পষ্ট অপচেষ্টা।

একজন সরকারি ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে ডাঃ মোঃ নাছির উদ্দিনের মাসিক মূল এবং সরকারি ভাতা মিলিয়ে বার্ষিক বৈধ আয় কোনোভাবেই তার বর্তমান বিলাসী জীবনযাত্রা এবং পারিবারিক সম্পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওনার এবং ওনার স্ত্রী শামসুন্নাহারের আয়কর নথি (ট্যাক্স ফাইল) পর্যালোচনা করে এক বিশাল আর্থিক অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে।

ওনার দাখিলকৃত ২১-২২ ও ২৪-২৫ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন ফাইল মেলালে দেখা যায়, তিনি তার মডার্ন ক্লিনিক এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা ক্যাশ ইনপ্রবাহের বড় একটি অংশ কর নথিতে সম্পূর্ণ গোপন করেছেন। এছাড়াও ওনার স্ত্রী শামসুন্নাহারের নামে গত ৩ বছরে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে, যার কোনো বৈধ উৎস বা ‘সোর্স অফ ফান্ড’ কর নথিতে দেখাতে পারেননি তারা।

দুদকের মাদারীপুর আঞ্চলিক কার্যালয় ওনার এই কর ফাঁকি এবং নামে-বেনামে করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ফাইলটি বর্তমানে গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। এদিকে, ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে এবং এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রক্ষা করতে ডাঃ নাছির উদ্দিন রাতারাতি সাবেক আওয়ামী উপমন্ত্রীর ভাগিনা পরিচয় মুছে ফেলে নিজেকে ‘জামায়াতে ইসলামী’ ঘরানার লোক হিসেবে জাহির করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন, যাতে রাজনৈতিক খোলস বদলে এই তদন্তের গতি থমকে দেওয়া যায়।

স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আবু নাঈম মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম মিলে ওনার পক্ষে কাজ করা ও এই দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, পুরো অনিয়মের খতিয়ান এখন সরাসরি ঢাকা মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের টেবিলে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি বরাবর ইতিমধ্যেই একটি লিখিত অবগতি পত্র জমা দিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে ডা. নাছিরের বিরুদ্ধে ওঠা সকল সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির প্রমাণাদি সংযুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জনের এই পক্ষপাতমূলক ও মনগড়ো তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানতে পেরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি অত্যন্ত কড়া ও হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেখেন, আমি একজন নিউরোসার্জন। আমাকে এই চেয়ারে বসানোই হয়েছে স্বাস্থ্য খাতের এই ধরণের চোর আর দুর্নীতিবাজদের ধরার জন্য। শরীয়তপুরের সিভিল সার্জনও যদি ওনার মনমতো তদন্ত কমিটি সাজিয়ে অভিযুক্তের পক্ষে কোনো পার পাওয়ার প্রতিবেদন বা দায়সারা রিপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে বিষয়টি অবশ্যই আমাকে সরাসরি অবগত করবেন। আমরা এখানে চোর ধরার জন্যই বসে আছি। চোর বা দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন, তার পেছনে যত বড় প্রশাসনিক বা স্থানীয় হাতই থাকুক না কেন কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিচালক (প্রশাসন)-এর এমন কঠোর ও নীতিগত অবস্থানের পর স্থানীয়ভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেও সিভিল সার্জন ও ভেদরগঞ্জের এই ‘এম উদ্দিন’ সিন্ডিকেটের শেষ রক্ষা হবে না বলেই মনে করছে সচেতন মহল।