গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) একটি ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক। প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এই প্রকল্পে বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অধিক দরদাতা একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধির (পিপিআর) চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দরপত্র-সংক্রান্ত এই বিতর্কের মধ্যেই আবার সামনে এসেছে সুদীপ বসাকের বিরুদ্ধে অতীতে উত্থাপিত নানা অভিযোগ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কর্মরত থাকা সময় থেকে শুরু করে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব পালনকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, মাস্টাররোল কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের নানা অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি বা তাঁর ঘনিষ্ঠরা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন এবং এগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বলে দাবি করেছেন।
সাম্প্রতিক আলোচিত প্রকল্পটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর জোনে ডাস্টবিন নির্মাণসংক্রান্ত। প্রকল্পটির টেন্ডার আইডি নম্বর ১২৬৬৩৩৭। গত ২৪ মে ই-জিপি পদ্ধতিতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং এতে আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। সরকারি ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থার মাধ্যমে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং মানবিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা।
দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সানফাই কনস্ট্রাকশন সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করেছিল। তবে নির্ধারিত সিগনিফিক্যান্টলি লো প্রাইজড টেন্ডার (এসএলটি) সীমার নিচে দর দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। এরপর বৈধ দরদাতাদের তালিকায় সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার ২৭৯ টাকা। পিপিআর অনুযায়ী, বৈধ দরদাতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে যে, সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, বৈধ দরদাতাদের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়ে বেশি দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও মেসার্স আব্দুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বেশি। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, কেন বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া হলো এবং কী কারণে অধিক দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হলো।
দরপত্র-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রভাব কাজ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের সঙ্গে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে এবং সেই সম্পর্কের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি সুবিধা পেয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, দরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ছিল। কারণ ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দরপত্র বিতর্কের পাশাপাশি সুদীপ বসাকের অতীত কর্মজীবন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কর্মরত থাকার সময় থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন এবং পরে চাকরি স্থায়ী করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব পালনকালে যন্ত্রপাতি ভাড়া, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দোকান বরাদ্দসংক্রান্ত কিছু অনিয়মের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। তবে সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে তাঁর নাম উঠে আসে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তোলেন। যদিও অভিযোগ উত্থাপন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া এসব অভিযোগকে সত্য বলে গণ্য করার সুযোগ নেই।
২০২২ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে যোগদানের পরও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মাস্টাররোলভুক্ত কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, অতিরিক্ত বিল প্রদর্শন, ভুয়া ভাউচার তৈরি এবং কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা যায়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও কার্যকর তদন্তের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিল অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত থাকে। ফলে এসব পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
সরকারি ক্রয়বিধির বিশেষজ্ঞদের মতে, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের লিখিত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া হলে তার কারণ নথিভুক্ত থাকতে হবে এবং তা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ কারণ ছাড়া বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় ব্যবস্থার মূল দর্শনেরও পরিপন্থী হবে। অন্যদিকে যদি কর্তৃপক্ষের কাছে বৈধ কারণ থাকে, তবে সেটি প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ৫ নম্বর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হানিফ জানিয়েছেন, দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তাঁর এই বক্তব্যের ফলে প্রকল্পটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রেখেছেন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফোনে যোগাযোগের পাশাপাশি খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তবে সুদীপ বসাকের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং তাঁর সমর্থকরা সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, কোনো অভিযোগই আদালত বা তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি এবং তাই তাঁকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা অনুচিত।
তাঁদের আরও দাবি, স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবুও সাম্প্রতিক দরপত্র বিতর্ক পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ এখানে বিষয়টি শুধু কোনো পুরোনো অভিযোগ নয়; বরং একটি চলমান প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত। যদি সত্যিই বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অধিক দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সরকার খাতের সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের বিতর্কের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ তদন্ত না হলে অভিযোগের সত্যতা যেমন যাচাই হবে না, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তাও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ পাবেন না। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন থেকে যাবে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র বিতর্ক তাই এখন একটি বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং অভিযোগের মুখে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে জবাবদিহিতা কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কেবল নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ততদিন পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাককে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং দরপত্র বিতর্ক জনমনে আলোচনার বিষয় হিসেবেই থেকে যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















