স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বরিশাল বিভাগ, অঞ্চল ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রহমত-ই-খুদার নাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছেন।
দুই দশকের বেশি সময় বরিশালে দায়িত্ব পালন
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলার বাসিন্দা মোঃ রহমত-ই-খুদা বর্তমানে এলজিইডির বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বরিশাল জেলায় প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন এলজিইডি দপ্তরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় একই অঞ্চলে কর্মরত থাকার ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ঠিকাদার মহলে তার বিস্তৃত যোগাযোগ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বরিশালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন রহমত-ই-খুদা। বিশেষ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বলয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বরিশালের মাহফুজ খান, কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ, ভোলার পিটার এবং পটুয়াখালীর মহিউদ্দিনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে অংশীদারিত্বের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর সংগঠনটির ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে তার সদস্য নম্বর ছিল ৫৭।
কমিটির অনুমোদনপত্রে সংগঠনের সভাপতি প্রফেসর ড. প্রকৌশলী মোঃ হাবিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোঃ নুরুজ্জামানের স্বাক্ষর রয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, এই সাংগঠনিক পরিচয়ের পর থেকেই তিনি বরিশাল অঞ্চলের প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন।
বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
রহমত-ই-খুদার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
একাধিক সূত্রের দাবি, বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি, পদায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব খাটাতেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো বদলির আদেশ জারি হলে তা পরিবর্তন বা বাতিলের জন্য তিনি প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করতেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার একটি সূত্রও এ ধরনের অভিযোগের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন শাখার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে দায়িত্ব পাওয়ার প্রশ্ন
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বরিশাল অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ শূন্য হলে একাধিকবার রহমত-ই-খুদা ওই দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই কার্যালয়ে তার চেয়ে সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি ওই দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
তাদের দাবি, প্রশাসনিক প্রভাবের কারণেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন
সরকারি চাকরি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট সময় পর কর্মকর্তাদের বদলির বিধান থাকলেও বরিশাল অঞ্চলে অনেক কর্মকর্তা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বদলির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক
স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় রয়েছেন।
তাদের দাবি, রহমত-ই-খুদাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি মনে করেন, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা হিসেবে পরিচিত রহমত-ই-খুদাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে সেই বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে।
সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি, পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাদের মতে, রহমত-ই-খুদার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যদি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করা হয়, তাহলে শুধু একজন কর্মকর্তার ভূমিকা নয়, বরং বরিশাল অঞ্চলের এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতাও মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রহমত-ই-খুদার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















