(বগুড়া):আইন ও বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির অক্টোপাস গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার এস, এম, কামরুল হোসেনের বিরুদ্ধে। সরকারি চাকুরির লেবাসে ‘ঘুষ ও দলিল আটকানো’কে নিয়মে পরিণত করে তিনি ও তার স্ত্রী আজ শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের ওপর বসে আছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।দীর্ঘ চাকুরিজীবনে ‘সি’ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হয়েও তিনি বগুড়া জেলাজুড়ে বিঘার পর বিঘা জমি ও বিপুল পরিমাণ স্থাবর সাম্রাজ্য গড়ে তুলছেন, যা নিয়ে সাধারণ মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই তিনি এবং তার সিন্ডিকেট অবৈধ আয়ের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন।
নিজের নামে অঢেল স্থাবর সম্পত্তি:অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুনে চাকুরিতে যোগদানের পর থেকেই বেপারোয়া হয়ে ওঠেন কামরুল হোসেন (পিতা: এস, এম, মমতাজুর রহমান)। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে তিনি বগুড়া সদর, শেরপুর ও শাজাহানপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। তার নামে থাকা স্থাবর সম্পদের খতিয়ান:বগুড়া সদর: মালতীনগর মৌজায় (হোল্ডিং- ৬২০২) ৩.১৩ শতক মূল্যবান ভিটা এবং ভাতকান্দি মৌজায় (হোল্ডিং- ১৩৬২) ৪ শতক জমি।শেরপুর উপজেলা: কুশাবাড়ী মৌজায় (হোল্ডিং- ১৬৯) ১৬.৫ শতক জমি।
এ ছাড়া ক্ষিকিন্দা মৌজার ৪৬৯ নং হোল্ডিংয়ে ৩৩ শতক, ৫৯০ নং হোল্ডিংয়ে ৪৮ শতক ধানি জমি, ৫৯১ নং হোল্ডিংয়ে ৩ দাগে ১০৩ শতক ধানি জমি, এবং ৪০৫ নং হোল্ডিংয়ে ২ দাগে আরও ৪৮ শতক ধানি জমি রয়েছে।শাজাহানপুর উপজেলা: জামুন্না মৌজায় (হোল্ডিং- ১২১৯) ৪১.৫ শতক ধানি জমি এবং সোনাইদিঘী মৌজায় (হোল্ডিং- ৫৯৯) ৮ শতক জমি।কালোটাকা আড়াল করতে স্ত্রীর নামে সম্পদের রাজত্ব:আইনি নজরদারি ও জবাবদিহিতা এড়াতে সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হোসেন তার স্ত্রী মোছাঃ রিক্তা খাতুনকে (পিতা: মো: আব্দুল আজিজ মন্ডল) বানিয়েছেন এই অবৈধ সম্পদের সিংহভাগের অংশীদার।
রিক্তা খাতুনের নামে রেজিস্ট্রি করা বিপুল সম্পদের তালিকা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো:১. বগুড়া সদর: শহরের কেন্দ্রস্থল মালতীনগর মৌজায় (হোল্ডিং- ২৯৬৪) ৩ শতক এবং গাডামারা মৌজায় (হোল্ডিং- ২৫৯৫) ৫.২৫ শতক জমি।২. শেরপুর অঞ্চল: ধাওয়াপাড়া মৌজায় (হোল্ডিং- ৬৬৩) ৪৬.২৫ শতক জমি, খিকিন্দা মৌজায় (হোল্ডিং- ৬৫৩) ৩৮.৫ শতক জমি, এবং ধাওয়াপাড়া মৌজায় অন্য একটি হোল্ডিংয়ে (৫৮০) আরও ৩৫ শতক জমি।দলিল জিম্মি ও টেবিল বাণিজ্য:স্থানীয় ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকদের সূত্রে জানা গেছে, দুপচাঁচিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কামরুল হোসেনের তৈরি করা ‘ঘুষের অলিখিত নিয়ম’ ছাড়া কোনো দলিল পাস হতো না। সাধারণ মানুষ জমি কেনাবেচার জন্য এলে নানা অজুহাতে ও আইনি মারপ্যাঁচ দেখিয়ে দলিলের ত্রুটি খুঁজে বের করে দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ তার মনোনীত দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন করতে বাধ্য হতো।
এই টেবিল বাণিজ্যের প্রতিদিনের লাখ লাখ টাকার অবৈধ কমিশনই আজ তাকে শতকোটি টাকার মালিক বানিয়েছে। একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার সীমিত বেতন-ভাতায় এত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অর্জন প্রকাশ্য লুণ্ঠনের অকাট্য দলিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল।অভিযোগ শুনেই ফোন কাটলেন সাব-রেজিস্ট্রার:এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দলিল আটকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার এস, এম, কামরুল হোসেনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করলেও, সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে যখনই এসব সম্পদের তথ্য ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লাইনটি কেটে দেন।
এরপর আরও একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগের মুখোমুখি হতে তার এই অনীহা এবং পলায়নপর মনোভাব দুর্নীতির অভিযোগকে আরও জোরালো করে তুলেছে।আসন্ন অবসরের আগেই এই কর্মকর্তার উৎসবিহীন সম্পদের উৎস এবং তার স্ত্রীর নামে বেনামে থাকা ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ দাবি করছে ভুক্তভোগী জনতা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















