সংবাদ শিরোনাম ::
কালিহাতীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার মুকসুদপুরে কৃষকের মাঝে নারকেল গাছের চারা ও সার বিতরণ ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল বাস্তবায়নে জোর, অভিভাবকদের সহযোগিতা কামনা সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়ের কারাগারে মিল্কভিটার চেয়ারম্যান শাতিলের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ স্বচ্ছতা,জবাবদিহীতা ও ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন নিশ্চিত করা হবে : ভিসি হেমায়েত জাহান প্রেমের নামে প্রতারণা ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে বিধবা নারী বড়লেখা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় নাগরিকসহ ২ জন আটক প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নেবে : আইনমন্ত্রী ভারতে বিজেপি নেতাসহ তিনজনকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা

নতুন সরকারের আমলেও শেয়ারবাজারে কারসাজি, আলোচনায় পুরোনো মাফিয়া মামুন

কয়েক বছর ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতার নেপথ্যে যাদের নাম সামনে এসেছে, তাদের একজন মো. মামুন মিয়া। এর আগে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মামুন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। নতুন সরকারের আমলেও পুঁজিবাজারে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতাও।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত জেড ক্যাটাগরির একটি কোম্পানি এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আবারও কারসাজি চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই বিগত কয়েক কার্যদিবস ধরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ও লেনদেন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২০ মে থেকে মাত্র সাত কার্যদিবসে শেয়ারের দর ১৬ দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে গত ৪ জুন ২৪ দশমিক ৮০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই স্বল্প সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়েছে ৮ দশমিক ২০ টাকা বা ৪৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।

ডিএসই-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি বা ইতিবাচক খবর ছাড়াই এমন উল্লম্ফন ‘অস্বাভাবিক’।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ এবং বড় ধরনের লোকসানে থাকা দুর্বল মৌলভিত্তির এই কোম্পানির আকস্মিক উত্থান সন্দেহজনক। তারা বলছেন, এটি বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবারও ফাঁদে ফেলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি নীলনকশা মাত্র।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ এবং ২০২৩ সালে জাপানি বিনিয়োগ ও জাপানে ব্রান অয়েল রপ্তানির মতো নানা চটকদার তথ্য ছড়িয়ে বড় ধরনের কারসাজি চালায় মিনোরি বাংলাদেশ। বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারও সেই একই চক্র পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

২০২৩ সালের কারসাজি

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমারল্ড অয়েল শেয়ারের বর্তমান অস্বাভাবিক মুভমেন্ট বুঝতে হলে ২০২৩ সালের কারসাজির ইতিহাস জানা জরুরি।

ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তিন মাস ১০ দিনে এমারল্ড অয়েলের শেয়ারের দর ৩১ দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১৮৮ দশমিক ৮০ টাকায় ট্রেড হয়েছিল। এই সময়ে মিনোরি বাংলাদেশ জাপানে তেল রপ্তানির ভুয়া চুক্তিসহ নানা আকর্ষণীয় মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ডিএসইর পোর্টালে প্রকাশ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রচার করা হয়।

বানোয়াট আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে বন্ধ থাকা কোম্পানিতে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে ইন্টেরিম ডিভিডেন্ট ঘোষণা করা হয়। এভাবে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে চূড়ায় নিয়ে গিয়ে ‘দর আরও অনেক বাড়বে’ এমন গুজব ছড়ানো হয়। আর এর মাধ্যমে মিয়া মামুন ও তার সিন্ডিকেট সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে চড়া মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়।

এই ডাম্পিংয়ের কারণে ছয় মাসের মধ্যে শেয়ারের দর ১৮৮ টাকা থেকে ৭৪ টাকায় নেমে আসে। পরে কোম্পানির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও লভ্যাংশের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে শেয়ারের দরে চূড়ান্ত ধস নামে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর পরবর্তী দুই অর্থবছরে আর কোনো বিবরণী প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) করতে পারেনি এমারল্ড অয়েল। ফলে ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর নামে ১০ দশমিক ২০ টাকায়। মিনোরির এই জালিয়াতিতে পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেন হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী।

মিনোরি বাংলাদেশের জালিয়াতি

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা যায়, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে বাংলাদেশি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন পায়। কোম্পানির উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়া বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি টিআইএন, ঠিকানা, পাসপোর্ট ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন নেন। অপর উদ্যোক্তা পরিচালক আবুল কালাম আজাদও বাংলাদেশি নাগরিক। কাজেই কাঠামোগতভাবে এই কোম্পানির সঙ্গে জাপানের কোনো পুঁজি বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল না।

মিনোরি বাংলাদেশকে ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখাতে মো. মামুন মিয়া ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি এনসিসি ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি ব্যাংক হিসাব (হিসাব নম্বরের শেষ চার অক্ষর ২৬১২) খোলেন। অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমে তিনি নিজের প্রকৃত নাম আড়াল করে জাপানি ভাষায় ‘মিয়া মামুন’ (MIYA MAMUN) হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

নথি অনুযায়ী, জাপান থেকে মিনোরি বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে প্রথম রেমিট্যান্স আসে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব খোলার সময় পরিশোধিত মূলধনে কোনো জাপানি বিনিয়োগ প্রদর্শনের আইনি সুযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের নথিতে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট সব চুক্তি ও নথিতে মো. মামুন মিয়া তার প্রকৃত নাম গোপন করে জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করতে থাকেন।

২০২১ সালের জুনে দেশের একাধিক সংবাদপত্রে মিনোরিকে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিনোরিকে একটি প্রকৃত জাপানি কোম্পানি হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়।

ভুয়া বিনিয়োগ, জাল নথি

মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড এমারল্ড অয়েলের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ার কিনতে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করে। কিন্তু শুধু একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই (এনসিসি ব্যাংক) লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৯ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন সিকিউরিটি হাউসে বিনিয়োগ করে।

এই হিসাবে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার বিনিয়োগ বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে গোপন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, শেয়ারবাজারে কারসাজির উদ্দেশ্যেই এই বিনিয়োগের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

বিএসইসি তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এমারল্ড অয়েলে মানি সার্কুলেশন ও বিভিন্ন জাল নথি তৈরি করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিনোরি পর্যায়ক্রমে মোট ৩১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার একটি ভুয়া বিনিয়োগ দেখায়। এর বিপরীতে বিএসইসি মিনোরির অনুকূলে ৩ কোটি ১৫ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যু করে।

এই ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধতা দিতে মিনোরির অডিট প্রতিষ্ঠান এস আর ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর অনৈতিক সহায়তায় বানোয়াট দায়-দেনা ও শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়। অডিট রিপোর্টে ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ১৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯৮ হাজার ২১২ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে ২৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৯ হাজার ৭০২ টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের মধ্যে তা শেয়ার ক্যাপিটালে রূপান্তর করার কথা থাকলেও চার বছরেও তা করা হয়নি।

কাগুজে ঋণে কাল্পনিক সম্পদ

ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধ দেখাতে মিনোরির অডিট রিপোর্টে ‘লোন ফ্রম সিস্টার কনসার্ন’ হিসাবে তিনটি কোম্পানি থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেখানো হয়। কিন্তু ওই অর্থবছরে সেই তিনটি কোম্পানির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

শুধু তা-ই নয়, শর্ট টার্ম লোন হিসেবে আরও ২৭টি প্রোপ্রাইটরশিপ ও তিনটি প্রাইভেট লিমিটেড ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ১ হাজার ৫৭১ টাকার বানোয়াট ঋণ দেখানো হয়েছে। এসব ঋণের স্বপক্ষে কোনো ঋণচুক্তি, ব্যাংক লেনদেন বা ঋণদাতার ট্যাক্স ডিক্লারেশন নেই। আইনিভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার কোনো এখতিয়ারও নেই।

এ ছাড়া ঋণদাতা প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাবিব করপোরেশনের মালিক মো. আফজাল হোসেন নিজেই মিনোরির শেয়ারহোল্ডিং পরিচালক ছিলেন। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও অডিট রিপোর্টে এ বিষয়ে কোনো রিলেটেড পার্টি ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি।

কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টানা চার অর্থবছরে ব্যবসা থেকে মোট মুনাফা ছিল মাত্র ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এই কাগজসর্বস্ব, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে এবং কাদের মদদে কথিত ‘জাপানি জায়ান্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেল, তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এত সব জালিয়াতির পরেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নাকের ডগায় বসে আবারও এমারল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে মিনোরি তথা মিয়া মামুন চক্রের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এই চক্রের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিনোরি বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে , কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত সাতটি দেশি ও বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি বাদে সবগুলো নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। একমাত্র সচল নম্বরটিতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।

পরে একটি জাপানি নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ তাকে সচল দেখা যায়। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেনিন। একই সঙ্গে ওই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিহাতীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

নতুন সরকারের আমলেও শেয়ারবাজারে কারসাজি, আলোচনায় পুরোনো মাফিয়া মামুন

আপডেট সময় ০২:০৩:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

কয়েক বছর ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতার নেপথ্যে যাদের নাম সামনে এসেছে, তাদের একজন মো. মামুন মিয়া। এর আগে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মামুন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। নতুন সরকারের আমলেও পুঁজিবাজারে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতাও।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত জেড ক্যাটাগরির একটি কোম্পানি এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আবারও কারসাজি চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই বিগত কয়েক কার্যদিবস ধরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ও লেনদেন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২০ মে থেকে মাত্র সাত কার্যদিবসে শেয়ারের দর ১৬ দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে গত ৪ জুন ২৪ দশমিক ৮০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই স্বল্প সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়েছে ৮ দশমিক ২০ টাকা বা ৪৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।

ডিএসই-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি বা ইতিবাচক খবর ছাড়াই এমন উল্লম্ফন ‘অস্বাভাবিক’।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ এবং বড় ধরনের লোকসানে থাকা দুর্বল মৌলভিত্তির এই কোম্পানির আকস্মিক উত্থান সন্দেহজনক। তারা বলছেন, এটি বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবারও ফাঁদে ফেলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি নীলনকশা মাত্র।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ এবং ২০২৩ সালে জাপানি বিনিয়োগ ও জাপানে ব্রান অয়েল রপ্তানির মতো নানা চটকদার তথ্য ছড়িয়ে বড় ধরনের কারসাজি চালায় মিনোরি বাংলাদেশ। বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারও সেই একই চক্র পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

২০২৩ সালের কারসাজি

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমারল্ড অয়েল শেয়ারের বর্তমান অস্বাভাবিক মুভমেন্ট বুঝতে হলে ২০২৩ সালের কারসাজির ইতিহাস জানা জরুরি।

ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তিন মাস ১০ দিনে এমারল্ড অয়েলের শেয়ারের দর ৩১ দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১৮৮ দশমিক ৮০ টাকায় ট্রেড হয়েছিল। এই সময়ে মিনোরি বাংলাদেশ জাপানে তেল রপ্তানির ভুয়া চুক্তিসহ নানা আকর্ষণীয় মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ডিএসইর পোর্টালে প্রকাশ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রচার করা হয়।

বানোয়াট আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে বন্ধ থাকা কোম্পানিতে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে ইন্টেরিম ডিভিডেন্ট ঘোষণা করা হয়। এভাবে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে চূড়ায় নিয়ে গিয়ে ‘দর আরও অনেক বাড়বে’ এমন গুজব ছড়ানো হয়। আর এর মাধ্যমে মিয়া মামুন ও তার সিন্ডিকেট সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে চড়া মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়।

এই ডাম্পিংয়ের কারণে ছয় মাসের মধ্যে শেয়ারের দর ১৮৮ টাকা থেকে ৭৪ টাকায় নেমে আসে। পরে কোম্পানির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও লভ্যাংশের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে শেয়ারের দরে চূড়ান্ত ধস নামে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর পরবর্তী দুই অর্থবছরে আর কোনো বিবরণী প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) করতে পারেনি এমারল্ড অয়েল। ফলে ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর নামে ১০ দশমিক ২০ টাকায়। মিনোরির এই জালিয়াতিতে পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেন হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী।

মিনোরি বাংলাদেশের জালিয়াতি

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা যায়, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে বাংলাদেশি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন পায়। কোম্পানির উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়া বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি টিআইএন, ঠিকানা, পাসপোর্ট ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন নেন। অপর উদ্যোক্তা পরিচালক আবুল কালাম আজাদও বাংলাদেশি নাগরিক। কাজেই কাঠামোগতভাবে এই কোম্পানির সঙ্গে জাপানের কোনো পুঁজি বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল না।

মিনোরি বাংলাদেশকে ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখাতে মো. মামুন মিয়া ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি এনসিসি ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি ব্যাংক হিসাব (হিসাব নম্বরের শেষ চার অক্ষর ২৬১২) খোলেন। অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমে তিনি নিজের প্রকৃত নাম আড়াল করে জাপানি ভাষায় ‘মিয়া মামুন’ (MIYA MAMUN) হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

নথি অনুযায়ী, জাপান থেকে মিনোরি বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে প্রথম রেমিট্যান্স আসে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব খোলার সময় পরিশোধিত মূলধনে কোনো জাপানি বিনিয়োগ প্রদর্শনের আইনি সুযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের নথিতে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট সব চুক্তি ও নথিতে মো. মামুন মিয়া তার প্রকৃত নাম গোপন করে জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করতে থাকেন।

২০২১ সালের জুনে দেশের একাধিক সংবাদপত্রে মিনোরিকে জাপানভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমারল্ড অয়েল অধিগ্রহণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিনোরিকে একটি প্রকৃত জাপানি কোম্পানি হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়।

ভুয়া বিনিয়োগ, জাল নথি

মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড এমারল্ড অয়েলের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ার কিনতে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করে। কিন্তু শুধু একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই (এনসিসি ব্যাংক) লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৯ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন সিকিউরিটি হাউসে বিনিয়োগ করে।

এই হিসাবে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার বিনিয়োগ বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে গোপন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, শেয়ারবাজারে কারসাজির উদ্দেশ্যেই এই বিনিয়োগের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

বিএসইসি তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এমারল্ড অয়েলে মানি সার্কুলেশন ও বিভিন্ন জাল নথি তৈরি করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিনোরি পর্যায়ক্রমে মোট ৩১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার একটি ভুয়া বিনিয়োগ দেখায়। এর বিপরীতে বিএসইসি মিনোরির অনুকূলে ৩ কোটি ১৫ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যু করে।

এই ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধতা দিতে মিনোরির অডিট প্রতিষ্ঠান এস আর ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর অনৈতিক সহায়তায় বানোয়াট দায়-দেনা ও শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়। অডিট রিপোর্টে ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ১৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯৮ হাজার ২১২ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে ২৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৯ হাজার ৭০২ টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের মধ্যে তা শেয়ার ক্যাপিটালে রূপান্তর করার কথা থাকলেও চার বছরেও তা করা হয়নি।

কাগুজে ঋণে কাল্পনিক সম্পদ

ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধ দেখাতে মিনোরির অডিট রিপোর্টে ‘লোন ফ্রম সিস্টার কনসার্ন’ হিসাবে তিনটি কোম্পানি থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেখানো হয়। কিন্তু ওই অর্থবছরে সেই তিনটি কোম্পানির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

শুধু তা-ই নয়, শর্ট টার্ম লোন হিসেবে আরও ২৭টি প্রোপ্রাইটরশিপ ও তিনটি প্রাইভেট লিমিটেড ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ১ হাজার ৫৭১ টাকার বানোয়াট ঋণ দেখানো হয়েছে। এসব ঋণের স্বপক্ষে কোনো ঋণচুক্তি, ব্যাংক লেনদেন বা ঋণদাতার ট্যাক্স ডিক্লারেশন নেই। আইনিভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার কোনো এখতিয়ারও নেই।

এ ছাড়া ঋণদাতা প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাবিব করপোরেশনের মালিক মো. আফজাল হোসেন নিজেই মিনোরির শেয়ারহোল্ডিং পরিচালক ছিলেন। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও অডিট রিপোর্টে এ বিষয়ে কোনো রিলেটেড পার্টি ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি।

কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টানা চার অর্থবছরে ব্যবসা থেকে মোট মুনাফা ছিল মাত্র ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এই কাগজসর্বস্ব, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে এবং কাদের মদদে কথিত ‘জাপানি জায়ান্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেল, তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এত সব জালিয়াতির পরেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নাকের ডগায় বসে আবারও এমারল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে মিনোরি তথা মিয়া মামুন চক্রের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এই চক্রের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিনোরি বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে , কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত সাতটি দেশি ও বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি বাদে সবগুলো নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। একমাত্র সচল নম্বরটিতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।

পরে একটি জাপানি নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ তাকে সচল দেখা যায়। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেনিন। একই সঙ্গে ওই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।