অবশেষে তার দম্ভই সত্যি হলো। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে কোনো মূল্যে ফেনী পৌরসভায় ফের বদলি হয়ে ফিরবেন। টাকার জোরে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুল হক। বুধবার (৩ জুন) তাকে নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভা থেকে ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখার উপসচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত একই আদেশে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির উদ্দিনকে অন্যত্র বদলি করা হয়।
এ বদলির সংবাদ প্রকাশ হলে ফেনীবাসীর মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজিজুল হক ছিলেন একজন আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ। ফেনীতে তিনি ‘মধুর হাঁড়ি’ পেয়েছিলেন বলেই বারবার এখানে আসতে ব্যাকুল থাকেন। তাছাড়া তার অবৈধ সম্পদের অধিকাংশের অবস্থান ফেনী জেলায়। এ কারণেই অন্যত্র বদলি করা হলে তিনি নানা কূটকৌশলে ফের ফেনীতেই ফিরে আসেন।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন ২০০৭ সালে। ছয় বছর পর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থেকে যান একই পৌরসভায়। টানা দেড় যুগ একই স্থানে থেকে হয়ে ওঠেন দুর্নীতির বরপুত্র। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীকে ‘মামা’ পরিচয় দিয়ে নিজেকে ক্ষমতাধর হিসেবে জাহির করতেন।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি করে গড়ে তোলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তাকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী পৌরসভায় বদলি করা হয়। কিছুদিনের ব্যবধানে বদলি করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভায়।
এরপর থেকেই ফেনীতে ফিরতে আজিজুল হক মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পরই তিনি যেন চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। নানা অজুহাত দেখিয়ে ঊর্ধ্বতনদের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি চলে হাইভোল্টেজ তদবির। এমনকি টাকার জোরে শিগগিরই ফেনীতে ফিরবেন বলে ঘনিষ্ঠদের কাছে বড়াই করে জানাতে থাকেন।
জানা গেছে, আজিজুল দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে। একটি হলো ‘ফ্যাক্ট ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’। অপরটি হলো ‘সয়েল টেক ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই ঠিকানা ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার ‘মদিনা ভবন’।
অভিযোগ রয়েছে, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত অনুমোদন নিতে আসা ব্যক্তিদের তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করতেন। এ জন্য আদায় করা হতো উচ্চমূল্য।
মূলত নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়নের কাজ তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হতো। এতে করে সহজেই পৌরসভার অনুমোদন মিলত। আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন একজন স্বীকৃত প্রকৌশলীর মাধ্যমে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অন্য এক নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করেই কাজ সম্পাদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খোদ আজিজুল হক পৌরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকায় এতদিন বিষয়টি গোপন ছিল।
তাছাড়া ফেনীতে কর্মরত থাকাকালে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েন তিনি। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দুটি আলিশান ফ্ল্যাট, ফেনী শহরের মিজানপাড়ার শর্শদী হাউজে দুটি আলিশান ফ্ল্যাট এবং ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের পশ্চিম পাশে গোলাপবাগ সড়কের উত্তর মাথায় একটি বিশাল বাগানবাড়ি রয়েছে। এছাড়া নামে-বেনামে আরও অনেক সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চালানো হলে অপকর্মের আরও অনেক ফিরিস্তি বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে সাময়িক বহিষ্কার হওয়া নিজাম হাজারীর চাচাতো ভাই ও পৌরসভার হিসাবরক্ষক রুপক হাজারীর বহিষ্কারাদেশও গত সপ্তাহে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে পৌরসভা সূত্র নিশ্চিত করেছে। একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আজিজুল হককে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















