মৎস্য খাতের বহুল আলোচিত ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (HDMP)’ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মোল্লা এমদাদুল্যাহ। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, নদীর অভয়াশ্রম রক্ষা, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ইলিশ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া জেলে তালিকা তৈরি, নিম্নমানের রেশন বিতরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কয়েক হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ। প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, টেন্ডার অনুমোদন, উপকরণ ক্রয়, রেশন বিতরণ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের তালিকা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশের মাধ্যমে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শেখ হেলালের সুপারিশেই তিনি পিডি পদে দায়িত্ব পান। মৎস্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিয়োগের পর থেকেই তিনি প্রকল্পে নিজের ঘনিষ্ঠ ও রাজনৈতিকভাবে অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। এর মাধ্যমে প্রকল্পের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বলয় তৈরি হয়, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ভুয়া জেলে তালিকা তৈরি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ। প্রকল্পের আওতায় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে গরু, ছাগল, সেলাই মেশিন, ভ্যান, ক্ষুদ্র ব্যবসার উপকরণসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের আয় নিশ্চিত করা। কিন্তু তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে প্রকৃত জেলেদের বড় একটি অংশ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারী, আত্মীয়স্বজন এবং অজেলে ব্যক্তিদের নাম জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোথাও কোথাও মৃত ব্যক্তির নামেও বরাদ্দ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মচারী জানিয়েছেন, প্রকৃত জেলেদের নাম বাদ দিয়ে ‘নির্ধারিত তালিকা’ পাঠানো হতো ওপরের নির্দেশে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। পরে সেই তালিকার ভিত্তিতে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে কিছুই পৌঁছায়নি।
প্রকল্পের রেশন বিতরণ কার্যক্রম নিয়েও উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ। জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের চাল সরবরাহ, ওজনে কম দেওয়া এবং খোলাবাজারে চাল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেন, সরকারি কাগজে ৪০ কেজি চাল দেখানো হলেও বাস্তবে তারা পেয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ কেজির মতো। এছাড়া সরবরাহকৃত চালের মান এতটাই খারাপ ছিল যে অনেক ক্ষেত্রে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
জেলেদের অভিযোগ, তালিকায় নাম থাকলেও অনেকেই কোনো রেশন পাননি। আবার যাদের দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছ থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা কেটে রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, রেশন বিতরণে তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নানা অনিয়ম ঘটেছে।
প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে বড় ধরনের প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে টেন্ডারের শর্ত পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ করে রেশন সরবরাহ ও জাল ক্রয়ের টেন্ডারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করে আগেই ঠিক করা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘আইয়ুব আলী ট্রেডার্স’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে বড় বড় কার্যাদেশ পেয়ে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হতো যা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের জন্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কোথাও কোথাও দরপত্র জমার সময় সীমিত রাখা, তথ্য গোপন করা কিংবা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে টেকনিক্যাল মূল্যায়ন করার অভিযোগও উঠেছে।
প্রকল্পের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, টেন্ডার অনুমোদনের আগে উচ্চপর্যায়ের ‘সমঝোতা’ ছাড়া কোনো কার্যাদেশ দেওয়া হতো না। কোনো ঠিকাদার কাজ পেতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন দিতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, সব টেন্ডার সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই হয়েছে। তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, কাগজে-কলমে নিয়ম মানার ভান করা হলেও বাস্তবে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত ছিল একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে মোল্লা এমদাদুল্যাহর বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, তিনি তার ঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে প্রকল্পের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। বিশেষ করে তৎকালীন ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) মামুনসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক নিয়োগ ও সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রকল্পে কে কোন দায়িত্ব পাবেন, কোন এলাকায় কী বরাদ্দ যাবে, কোন ঠিকাদার কাজ পাবে—সবকিছুই নির্ধারিত হতো একটি ছোট গোষ্ঠীর মাধ্যমে। ভিন্নমত পোষণ করলে কর্মকর্তাদের বদলি বা কোণঠাসা করা হতো।”
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের কয়েকটি প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে তারা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে HDMP প্রকল্পের বিভিন্ন নথিপত্র, টেন্ডার ডকুমেন্ট, অর্থ ছাড়ের কাগজপত্র এবং উপকারভোগীর তালিকা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রাথমিকভাবে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”
যদিও এখন পর্যন্ত মোল্লা এমদাদুল্যাহর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো মামলা বা চার্জশিট হয়নি, তবুও প্রশাসনিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনও পিডি পদে বহাল রয়েছেন এবং সরকারি বিভিন্ন সভা ও কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকল্পের সুবিধাবঞ্চিত জেলেরা ও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা।
উপকূলীয় এলাকার জেলেদের অভিযোগ, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন। ভোলার এক জেলে বলেন, “আমাদের নাম তালিকায় থাকলেও কোনো গরু বা সাহায্য পাইনি। পরে শুনি অন্য লোকজনের নামে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।”
বরগুনার এক জেলে অভিযোগ করেন, “চাল দেওয়ার সময় ওজনে কম দেয়। আবার ভালো চালের বদলে নিম্নমানের চাল দেয়। অভিযোগ করলেও কোনো লাভ হয় না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ সম্পদ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের মৎস্য সম্পদের জন্যও বড় হুমকি। কারণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল জেলেদের বিকল্প আয় নিশ্চিত করে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা। কিন্তু প্রকৃত জেলেরা যদি সহায়তা না পান, তাহলে তারা জীবিকার তাগিদে আবারও নদীতে নামতে বাধ্য হবেন। এতে জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণের সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত হতে পারে।
মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট গবেষকরা মনে করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এ ধরনের প্রকল্পে দেশি-বিদেশি অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা যুক্ত থাকে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভবিষ্যৎ অর্থায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে প্রশাসনিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে সত্যতা প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় যেসব বরাদ্দ, টেন্ডার ও উপকারভোগীর তালিকা তৈরি হয়েছে সেগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই করা হলে অনিয়মের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্র, জেলে নিবন্ধন তথ্য এবং ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে ভুয়া সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা সহজ হবে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে স্বাধীন নিরীক্ষা ও সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্থানীয় প্রশাসন, জেলে সংগঠন, নাগরিক প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে প্রকল্প তদারকি করা হলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব।
বর্তমানে মোল্লা এমদাদুল্যাহকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ, জেলেদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখন সবার নজর তদন্ত কার্যক্রমের দিকে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ রক্ষার প্রকল্পকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে যে, তাদের নামে বরাদ্দ এলেও প্রকৃত সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। এখন দেখার বিষয়, চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ পর্যন্ত কতদূর এগোয় এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















