জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের নাম। প্রকল্প বাস্তবায়ন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আদালতে কোনো দুর্নীতির মামলা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবে একের পর এক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান থাকায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তীব্র হয়েছে।
ডিপিএইচই দেশের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে নলকূপ স্থাপন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্থার ওপর ন্যস্ত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের আধিপত্যের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে মোহাম্মদ হানিফের নাম সামনে আসতে শুরু করে বিশেষ করে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই।
সিলেট বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ, নলকূপ স্থাপন এবং পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের সময় এক ধরনের প্রভাবশালী ঠিকাদার গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করা হতো। যদিও সে সময় এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি, তবে একাধিক প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
তাঁর কার্যকালেই পেকুয়া, ইন্দুরকানী ও লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত গভীরতায় নলকূপ খনন না করেই সম্পূর্ণ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক জায়গায় নিম্নমানের পাইপ ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার করায় কয়েক মাসের মধ্যেই নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। অথচ সরকারি কাগজপত্রে প্রকল্প শতভাগ সফল দেখিয়ে বিল ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব প্রকল্পে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া যায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক দরিদ্র পরিবারকে নলকূপ স্থাপনের জন্য গোপনে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে একটি প্রভাবশালী চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
মোহাম্মদ হানিফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে তাঁর প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে। তিনি প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার আগে উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁর দপ্তরের অধীনস্থ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন সিকদারের বিরুদ্ধে টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হতো। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অভিযোগগুলোর কিছু বিষয়ে অনুসন্ধান করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা বিভিন্ন প্রকল্পে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিত। বিনিময়ে বড় অঙ্কের কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের মতে, মোহাম্মদ হানিফ সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না তা তদন্তসাপেক্ষ, তবে তাঁর অধীনে এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের প্রাক্কলন ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেখানো হতো যাতে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ থাকে। মাঠপর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও কাগজপত্রের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই প্রকল্প সমাপ্ত দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু নলকূপ কয়েক মাসের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে, আবার কোথাও পানি ওঠেনি। কিন্তু সরকারি রেকর্ডে সেগুলোকে “সফলভাবে বাস্তবায়িত” হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সংস্থাটিকে দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা বিশুদ্ধ পানির জন্য সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল।
মোহাম্মদ হানিফের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একটি বিশেষ বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এর ফলে প্রকল্প অনুমোদন, বিল পাস এবং কাজের তদারকিতে একই গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, যারা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন বা আপত্তি করতেন, তাঁদের বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করা হতো।
একাধিক প্রকল্পে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়াকেও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অন্য ঠিকাদারদের নানা কৌশলে নিরুৎসাহিত করা হতো। এর ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকায় সরকারের ব্যয় বাড়লেও কাজের মান নিশ্চিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ে কাজ পরিদর্শনের নামে কর্মকর্তাদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা ও ভ্রমণ বিল তোলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অনেক প্রকল্পে কাজ শুরু হওয়ার আগেই কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখানো হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের বড় ধরনের অপচয় হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মোহাম্মদ হানিফের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে যথাযথ জবাবদিহি ও স্বাধীন তদারকি না থাকলে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে পানি ও স্যানিটেশনের মতো জনসেবামূলক খাতে অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে।
দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে এখন দাবি উঠেছে, প্রকল্পভিত্তিক সব আর্থিক লেনদেন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। কেবল নিম্নপদস্থ কর্মচারী নয়, বরং প্রকল্প অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। তাঁরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে স্বাধীন অডিট, নিয়মিত মনিটরিং এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল জনগণ পাবে না, বরং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতেই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো জিম্মি হয়ে থাকবে।
স্টাফ রিপোর্টার 





















