আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো আর চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসেবে কেউ জীবনে প্রথম বা দ্বিতীয় চাকরি হিসেবে যোগদান করেছিলেন মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডে (ডিএমটিসিএল)। এখানের বেতন কাঠামো সাধারণত জাতীয় বেতন স্কেলের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে গ্রেড অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেলের ২ থেকে ২.৩ গুণ পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।
ডিএমটিসিএলের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানের তিনজন সহকারী ব্যবস্থাপক, একজন সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ার, ১৯ জন সেকশন ইঞ্জিনিয়ার, ছয়জন স্টেশন কন্ট্রোলার, নয়জন ট্রেন অপারেটর, একজন রাজস্ব কর্মকর্তা, ৩৫ জন টিকিট মেশিন অপারেটর, ২৭ জন কাস্টমার রিলেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ৬৯ জন সেমি-স্কিলড মেইনটেইনার— মোট ১৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ডিএমটিসিএলের চাকরি থেকে ইস্তফা চেয়ে বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেছেন।
চাকরি ছেড়ে যাওয়া বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, এখানে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরিতে ঢুকলেও অনেকের বেতন গ্রেড ছিল কম। এছাড়া, ২০১৩ সালে কোম্পানি গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি সার্ভিস রুল। ফলে এখানে চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত মনে করে তারা চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত অপারেশনাল সিস্টেম, যেখানে রাতারাতি দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব নয় এবং বাইরের উৎস থেকে লোক এনে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনাও করা যায় না। তাই এই পরিস্থিতিতে ডিএমটিসিএলের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রিটেনশন (ধরে রাখা) নীতিতে।
চাকরি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে যা বলছেন কর্মীরা
চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী বলেন, আমি সেখানে দশম গ্রেডে চাকরি শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেটি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে আমি অন্য একটি জায়গায় নবম গ্রেডের রাজস্ব খাতে কাজ করছি। চাকরি ছেড়ে আসার এটি একটি প্রধান কারণ ছিল।
‘অন্য আরেকটি কারণ হচ্ছে, সেখানে সার্ভিস রুল নেই— এটি এখন পর্যন্ত হয়নি। একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। আমিসহ সবাই এটি ফেস করেছি। আমাদের যেহেতু পাঁচ বছরের চুক্তিভিত্তিক কাজ ছিল, ফলে অনিশ্চয়তাটা বেশি ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই একটা চিন্তার মধ্যে থাকতাম।’
‘এছাড়া আমাদের ওভারডিউটি করানো হতো। শিফটিং কাজ ছিল। সরকারি ছুটির দিনেও ছুটি পেতাম না। এগুলোর জন্য আমাদের কোনো বেনিফিট ছিল না। অতিরিক্ত কাজের জন্য কোনো অ্যালাউন্স থাকত না। এত কিছুর পরও যখন কাজটা চুক্তিভিত্তিক থাকে, তখন অনিশ্চয়তা থাকবেই। সবকিছু মিলিয়ে যখন বেটার অপারচুনিটি (উন্নত সুযোগ) পেয়েছে, তখন সবাই চলে গেছে।’
চাকরি ছেড়ে দেওয়া আরেকজন সাবেক কর্মী বলেন, আপনি যদি চাকরি করেন আর যতদিন সার্ভিস রুল না পান, তাহলে তো চাকরি অনিশ্চিতই। এই অনিশ্চয়তাটা ছিল। ফলে সেখানে থাকতেই অন্য চাকরির পরীক্ষাগুলো দিতাম। পরে সুবিধাজনক একটি চাকরিতে ঢুকে গেছি। মূলত সার্ভিস রুল না থাকা ও আপার গ্রেডে (উচ্চতর গ্রেড) যাওয়াই ছিল চাকরি ছাড়ার কারণ। আমাদের সময়কার ম্যাক্সিমামই (অধিকাংশই) চলে গেছে।
বর্তমানে চাকরি করছেন এমন একজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘আমরা বেসিকের ২.৩ গুণ স্যালারি (বেতন) পাই। সঙ্গে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ও ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা আছে। আমাদের শিফটিং ডিউটি থাকে এবং কোনো সরকারি ছুটির দিনেও ছুটি পাই না। কিন্তু এসবের জন্য কোনো অ্যালাউন্স কর্তৃপক্ষ আমাদের দেয় না। এজন্য লোকজন ভালো অপশন না পেলেও চলে যাচ্ছে। কারণ, এখানে সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎটা তারা দেখতে পান না।’
‘এখানে প্রজেক্ট নিয়ে একটি ইস্যু আছে। প্রজেক্টের লোকেরা যদি স্থায়ী হয়, তাহলে তারা প্রমোশন পেয়ে যাবে। এখানে একটি গ্রুপ আছে, যারা চায় প্রজেক্টের লোকেরা স্থায়ী না হোক। আরেকটি গ্রুপ আছে ইনজেনারেল (সাধারণ), যাদের প্রজেক্টের লোকদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তারা চায়, সার্ভিস রুলটি হোক।’
অন্য আরেকজন কর্মী বলেন, আমাদের সার্ভিস রুল যেটা হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন বোর্ড অনুমোদন করেছে, এখন বোধহয় ভেটিংয়ের জন্য আছে। সার্ভিস রুল এখনও কার্যকর করা হয়নি। এছাড়া, এটি যেহেতু কন্ট্রাকচুয়াল (চুক্তিভিত্তিক), তাই এখানে কেউ থাকতে চায় না।
‘আমাদের প্রকল্পের যে জটিলতা ছিল, কোম্পানি সেটি এখনও সমাধান করতে পারেনি। আমরা এখনও সেভাবেই আছি। আমরাও যে কোনো দিন ডিএমটিসিএলের বাইরে চলে যেতে পারি’— যোগ করেন তিনি।
শুধু সার্ভিস রুল না, বেটার অপারচুনিটির জন্যও যায় কর্মীরা : ডিএমটিসিএল
একজন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে নেয় ডিএমটিসিএল। কিন্তু কয়েকদিন কাজ করার পরই তারা আবার কাজ ছেড়ে চলে যান। এমন অবস্থায় ডিএমটিসিএল কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) নাসির উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। শুধু এতটুকু বলব, চাকরি ছেড়ে দেওয়া— যিনি চাকরি ছাড়ছেন, তা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কোনো অভিযোগ না থাকলে তো আর কিছু বলার নেই।’
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কারভাবে ডিএমটিসিএলের পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম খায়রুল আলম বলেন, ‘২০১৩ সালে কোম্পানি হয়েছে, কিন্তু এখনও সার্ভিস রুল করা হয়নি। তবে, আমরা ইতোমধ্যে সার্ভিস রুল বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’
‘শুধু যে সার্ভিস রুল নেই, এজন্য চাকরি ছেড়ে চলে যায়— বিষয়টা তা নয়। বেটার অপারচুনিটির জন্যও যায়। আমরা যখন লোক নিয়োগ করি, তখন আমাদের পরীক্ষা বুয়েট থেকে নেওয়া হয়। নবম, দশম বা এমনকি দ্বাদশ গ্রেডের চাকরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) কিংবা অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়াররা আবেদন করেন। একইভাবে কেরানি পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও অংশ নেন।’
‘ফলে লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে তারাই বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন এবং ভাইভাতেও ভালো করেন। এতে সাধারণ গ্র্যাজুয়েট প্রার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা চাকরিতে যোগদানের পর দীর্ঘমেয়াদে সেখানে থাকেন না। তারা দ্রুতই আরও ভালো সুযোগের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকেই চাকরিতে যোগদানের পরপরই উচ্চতর গ্রেডের (নবম গ্রেড বা প্রথম শ্রেণির) পদে যাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী অন্য প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে চাইলে কর্তৃপক্ষকে আবেদন করলে তা অনুমোদন দিতে হয়। ফলে কর্মীরা সহজেই ভালো সুযোগ পেলে সরে যান’— যোগ করেন তিনি।
সার্ভিস রুল দ্রুত অনুমোদন না হলে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে মেট্রোরেল : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘প্রথমত, এখানে একটি কাঠামোগত জটিলতা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে আগে, কিন্তু কোম্পানির গঠন হয়েছে পরে। ফলে কর্মী ধরে রাখার (রিটেনশন) জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা এখনও সঠিকভাবে প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন করা যায়নি। অথচ এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা পুরোপুরি নির্ভর করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের ওপর এবং পুরো কার্যক্রমই অপারেশননির্ভর হওয়ায় এই ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
‘দ্বিতীয়ত, বর্তমানে যে মেট্রোরেল পরিচালিত হচ্ছে, সেটি একটি চলমান প্রকল্প। এখনও কমলাপুর পর্যন্ত পুরো কাজ শেষ হয়নি। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ জনবল ধীরে ধীরে চলে গেলে এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদেরও ধরে রাখা না গেলে পরিচালনাতেই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও মেট্রোরেল লাইন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকায়, দক্ষ জনবল সংকট পুরো নেটওয়ার্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘মেট্রোরেল অত্যন্ত বিশেষায়িত অপারেশনাল সিস্টেম, যেখানে রাতারাতি দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব নয় এবং বাইরের উৎস থেকে লোক এনে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনাও করা যায় না। তাই এই পরিস্থিতিতে ডিএমটিসিএলের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রিটেনশন নীতিতে। সার্ভিস রুল নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সার্ভিস রুল দ্রুত অনুমোদনের উদ্যোগ না নিলে, প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’
এদিকে, সম্প্রতি ডিএমটিসিএলের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ইস্তফা দিয়েছেন, তারা নিজ নিজ দপ্তরের অধীনে থাকা ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, পেনড্রাইভসহ সব দাপ্তরিক সামগ্রী যথাযথভাবে হস্তান্তর করেছেন কি না, তা নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















