চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। বিশেষ করে খেলতে গিয়ে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা ও খোলা জলাশয়ে ডুবে শিশুদের প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নগরের তুলনায় উপজেলাগুলোতে শিশু মৃত্যুর হার বেশি। বিভিন্ন উপজেলায় ঘটা এসব দুর্ঘটনায় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ শিশুই খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে পুকুরে ডুবে মাইশা (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
মাইশার চাচা মো. রাসেল জানান, বাড়ির দক্ষিণ পাশের পুকুরে তিনি গোসল করতে যাওয়ার সময় মাইশাও তার সঙ্গে গিয়েছিল। গোসল শেষে তিনি বাড়িতে ফিরে এলেও শিশুটি আর ফেরেনি। পরে পুকুর থেকে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এদিকে, জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় গত এক সপ্তাহে পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার বরৈয়াঢালা, কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে পুকুরে ডুবে হুমায়রা (৬) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। হুমায়রা উপজেলার বরৈয়াঢালা ইউনিয়নের পূর্ব বহরপুর এলাকার প্রবাসী মোহাম্মদ আলমগীরের মেয়ে।
এর আগে রোববার সকাল ১১টার দিকে বাঁশবাড়িয়া এলাকায় পুকুরে ডুবে তিন বছর আট মাস বয়সী তাইফুল ইসলাম ইসবাতের মৃত্যু হয়। শনিবার দুপুরে একই উপজেলার বরৈয়াঢালা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আরিজা বিনতে সোহেল (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া, শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে কুমিরা ইউনিয়নের রহমতপুর এলাকায় রেললাইন সংলগ্ন একটি কলোনির পুকুরে ডুবে মারা যায় আবদুল্লাহ (৪) ও সীমা আক্তার (৯) নামে আরও দুই শিশু।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন বলেন, গত ২৪ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের অপমৃত্যু রোধে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মে ও জুন মাসে চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে ১৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা ১৮,৬৬৪। দৈনিক গড় মৃত্যু ৫১ জন, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৪০। মোট মৃত্যুর ৭৫ শতাংশই শিশু।
গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’ ২০২১ সালে পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় অন্তত ৫৭ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। মৃতদের মধ্যে ৪৭ জনের বয়স ছিল ৯ বছরের কম। এর মধ্যে ১৩ জন মেয়ে এবং ৩৪ জন ছেলে শিশু।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে বাঁশখালী, রাউজান, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড ও বোয়ালখালী উপজেলায় একের পর এক পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাউজান উপজেলায় রোহান উদ্দীন নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এরপর ১ মার্চ শেখেরখীল ইউনিয়নে মোহাম্মদ জোবাইর মিয়া (৫) নামে আরেক শিশুর মৃত্যু ঘটে। গত ৫ এপ্রিল ফটিকছড়িতে মাটি কাটার ফলে সৃষ্ট গর্তে পড়ে জমে থাকা পানিতে সাকি আক্তার (৯) ও সানজিদা (১০) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। এটি মূলত পরিবারের অসচেতনতারই ফল। যদিও শিশুদের নিয়ে সরাসরি আমাদের আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই, তবে বিষয়টি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি। সরকার ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থার উচিত অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও কার্যক্রম বাড়ানো।
চট্টগ্রাম জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী বলেন, শিশুদের কখনও একা জলাশয়ের পাশে খেলতে দেওয়া যাবে না। বাড়ির আশপাশের পুকুর বা জলাশয় নিরাপদভাবে ঘিরে রাখা এবং ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা মায়েদের এসব বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করি। পরিবারের অভিভাবকরা সচেতন হলে শিশু মৃত্যুর হার কমে আসবে বলে আশা করছি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















