দেশজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বোরহানউদ্দিন উপজেলার ১৩৬ নং দক্ষিণ দেউলা মুন্সিবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল স্কুল ভবনটি সত্যিকারের গোয়াল ঘরে পরিণত হয়েছে। দেখার কেউ নেই। ১৩৬ নং দক্ষিণ দেউলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—এক সময়ের স্বাভাবিক শিক্ষাঙ্গন আজ যেন হারিয়ে ফেলছে তার প্রকৃত চেহারা। অভিযোগ উঠে দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ বিদ্যালয়টি এখন স্হানীয়দের কাছে “পারিবারিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” হিসেবেই বেশি পরিচিত।আর বাস্তবে পরিণত হয়েছে গরু-ছাগলের খামারে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ অবস্থা যেন সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ। বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান চিত্র দেখে মনে হয়, এগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—বরং কোনো পরিত্যক্ত গোয়ালঘর। আর তৃতীয় তলায় একটি কক্ষের সামনে খোলা জায়গায় ৩ জন শিক্ষক একত্রে ক্লাস নিচ্ছেন। দুর্গন্ধে সেখানে অবস্থান করাই কষ্টকর, অথচ সেই পরিবেশই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছেন।
অন্যদিকে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে বড় বড় ফাটল।স্কুলে টিনের দরজাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় ভাঙ্গা থাকায় বৃষ্টির পানি সরাসরি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ছে। এতে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা রয়েছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট না থাকলেও রয়েছে পারিবারিক আধিপত্যের অভিযোগ। মোট ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ ৩ জনই একই পরিবারের সদস্য।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিবারই বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। পূর্বে বিদ্যালয়ের সভাপতিও ছিলেন ওই পরিবারের একজন সদস্য, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক, তার বোন ও স্ত্রী—সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিরও শেষ নেই। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অপব্যবহার, নোংরা পরিবেশে পাঠদান, সরকারি ভবন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা—সব মিলিয়ে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জানায়,
“স্কুল সবসময় নোংরা থাকে। গরু-ছাগলের ময়লা পায়ে লাগলে খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে স্কুলে আসতেই ইচ্ছা করে না।” দুর্গন্ধ এই পরিবেশে আর ক্লাস করতে ভালো লাগেনা।
স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন মিয়ার অভিযোগ,“শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেন না। অনেক সময় দুপুর ১টা-২টার মধ্যেই স্কুল ছুটি দিয়ে চলে যান।” এক কথায় তাদের মনগড়াই এই প্রতিষ্ঠান চলে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মাওলা বলেন,
“সম্প্রতি বিদ্যুতের মিটার চুরি হয়েছে, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামের লোকজন বর্ষার সময় নিচতলায় গরু-ছাগল বেঁধে রাখে। আমরা নিষেধ করলেও তারা শোনে না।”
তিনি আরও জানান,
“পুরনো ভবনের চাবি আগের প্রধান শিক্ষক নিয়ে গেছেন। ফলে আমরা চাইলেও সেটি ব্যবস্থাপনায় আনতে পারছি না।”
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৬ জন, আর শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন। তবে বাস্তব চিত্রে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম বলে জানা যায়।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে, তিনি প্রতিদিনের কাগজ ও আমাদের মাতৃভূমি কে জানান এ বিষয়ে সঠিক তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।
এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি—বিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্তত একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর পরিবেশ শিক্ষাঙ্গন ফিরে পায়।
রিয়াজ ফরাজী (ভোলা) 



















