বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. ভাস্কর সাহাকে ঘিরে অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ গঠন এবং দেশত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ ও আলোচনা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার একটি মেডিকেল ভিসার আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই ভিসা আবেদন শুধুমাত্র চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনের জন্য নাও হতে পারে; বরং এটি স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই।
জানা গেছে, গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ডা. ভাস্কর সাহা একটি মেডিকেল ভিসার জন্য আবেদন করেন। এ তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট মহলে তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়। একাধিক সূত্রের দাবি, তার পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থান করছেন। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তিনি দেশত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে তার বর্তমান অবস্থান নিয়েও বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজ বাসভবনে না থেকে বরিশাল নগরের একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। এই অবস্থান পরিবর্তনকেও কেউ কেউ সন্দেহের চোখে দেখছেন এবং মনে করছেন, এটি হয়তো সম্ভাব্য নজরদারি এড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
ডা. ভাস্কর সাহার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থ পাচারের বিষয়টি। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি একটি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান “সাউথ অ্যাপোলো হাসপাতাল”-এর শেয়ার বিক্রি করে প্রায় দুই কোটি টাকার মতো অর্থ সংগ্রহ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কিছু সূত্র জানিয়েছে, অর্থ ভারতে স্থানান্তরের প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও এই তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এছাড়া তার আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু সূত্রের দাবি, তার নামে ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে জমা রয়েছে, যার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে এসব তথ্যের কোনো প্রামাণ্য দলিল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, ফলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে তার সম্পদের পরিমাণ ও বিস্তার নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। বরিশাল শহরে তার মালিকানাধীন একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ তরল করে তা বিদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়েও এখনো নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তার সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত এলাকায় তার নামে একাধিক বাড়ি রয়েছে। এই তথ্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা অর্থ পাচার বা অবৈধ সম্পদ গঠনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে। তবে এসব দাবিরও স্বাধীন যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি।
ডা. সাহার পারিবারিক প্রেক্ষাপট নিয়েও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অবস্থান এবং সেখানে বিভিন্ন আর্থিক বা সম্পদসংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য তথ্য এখনো সীমিত।
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা না হলে ভবিষ্যতে এটি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় নজরদারি না বাড়ালে সম্ভাব্য দেশত্যাগ ঠেকানো কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সচেতন মহল ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতি নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এই মুহূর্তে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে—ভিসা আবেদন ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ, তার আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই, দেশে ও বিদেশে সম্পদের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ।
তারা আরও মনে করেন, যদি অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়, তবে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অনিয়মের ঘটনা হবে না; বরং এটি একটি বৃহত্তর আর্থিক অপরাধের অংশ হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
তবে একইসঙ্গে অনেকেই সতর্ক করছেন যে, যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। একজন নাগরিক হিসেবে ডা. ভাস্কর সাহারও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। তাই তার বক্তব্য শোনা এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা জরুরি।
এ বিষয়ে ডা. ভাস্কর সাহার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সার্বিকভাবে, ডা. ভাস্কর সাহাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের দাবির ওপর নির্ভরশীল। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















