ঢাকা ১২:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিটি ব্যাংকের অন্দরমহলে ‘লুটপাটের উৎসব’

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ১২:২৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫০৫ বার পড়া হয়েছে

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক পিএলসিতে সুশাসন, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ধারণা যেন কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে আমানতকারীদের তহবিল থেকে বেআইনি সুবিধার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ব্যাংকটির তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা- এমনি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক তদন্ত প্রতিবেদনে।

তদন্তের নথি অনুযায়ী, প্রভাবশালী কর্মকর্তারা ব্যাংকের পোর্টফোলিওকে কার্যত ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন- যেখানে ঝুঁকি গেছে ব্যাংকের ঘাড়ে, আর লাভ ঢুকেছে ব্যক্তিগত পকেটে।

সিটি ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) মতো সংস্থা, যাদের মনোনীত পরিচালকও রয়েছেন। হংকং-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী আর্থিক সাময়িকী ফাইন্যান্স এশিয়ার বিবেচনায় সেরা ব্যাংক হিসেবে গত জুনে ‘ফাইন্যান্স এশিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অর্জন করেছে ব্যাংকটি। একই আয়োজনে সিটি ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল এবং সিটি ব্রোকারেজও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছিল। গত নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ সি-সুইট অ্যাওয়ার্ডস’-এর চতুর্থ আসরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও পেয়েছেন।

এমন একটি স্বনামধন্য ব্যাংকের অন্দরমহলে যখন শীর্ষ কর্মকর্তারাই সিন্ডিকেট করে আমানতকারীদের টাকা লুট করেন, তখন বাহ্যিক পুরস্কার ও ব্র্যান্ড ইমেজের চাকচিক্যের আড়ালে ভয়ংকর অন্ধকার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৫ জন কর্মকর্তা ব্লক মার্কেটে লেনদেনের মাধ্যমে ‘অন্যায় সুবিধা’ নিয়েছেন। সিটি ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে পোর্টফোলিও ম্যানেজার সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে ‘কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ’ বেরিয়ে এসেছে।

বিএসইসির তদন্তে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে ব্যাংকটির আরও তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমানের বিরুদ্ধেও। তদন্তের সূত্রপাত হয় সিটি ব্যাংকের ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খানকে ঘিরে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি নিজের এবং তাঁর স্ত্রী আসমাউল হুসনার বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ব্যাংকের তহবিলের সঙ্গে সরাসরি ‘কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং’-এ জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, একদিকে তিনি ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, অন্যদিকে একই লেনদেনে ব্যক্তিগত ক্রেতা হিসেবে অবস্থান করছেন তিনি নিজেই- যা সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত এবং নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

বিএসইসির প্রতিবেদনে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট এবং বিডি পেইন্টসের শেয়ারে সংঘটিত লেনদেনগুলোকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ৩০ টাকায় শেয়ার কেনার পর একই শেয়ার ৪১.২০ টাকায় আবার ব্যাংকের কাছেই বিক্রি করে কোটি টাকার অবৈধ মুনাফা করেছেন সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রী। সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট কেনাবেচা থেকে। ব্যাংক যেখানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে লোকসান গুনছে, সেখানে আমানতকারীদের অর্থেই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।

গত জানুয়ারিতে অগ্নি সিস্টেমের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় সানোয়ার খান, তাঁর স্ত্রী ও ভাইকে জরিমানা করে বিএসইসি। একই ঘটনায় সিটি ব্যাংককেও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তার আগে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিকতার প্রশ্নে, গত বছরের ১০ জুলাই সিটি ব্যাংক বিএসইসির অনুসন্ধানের জবাবে শুরুতে দাবি করেছিল যে, মো. সানোয়ার খানের লেনদেনগুলো সেই সময়ে ব্যাংকের বিদ্যমান বিনিয়োগ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ সম্মতি মেনেই হয়েছিল।

তবে, যখন বিএসইসি লেনদেনগুলোর অনুমোদন বা অভ্যন্তরীণ নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চায়, তখন সিটি ব্যাংক ভিন্ন তথ্য দেয়। পরবর্তীতে ব্যাংক জানায়, উল্লিখিত লেনদেনগুলোর সময়ে বিনিয়োগ নীতিমালা বা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার অধীনে ব্লক লেনদেনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। তাই অন্য কোনো পদ্ধতি বা বিদ্যমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

এই অসামঞ্জস্যতা ইঙ্গিত করে যে, ব্যাংকটির বিনিয়োগ নীতিমালায় ব্লক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবকে ব্যক্তিগত লাভজনক লেনদেন বৈধ করার বা অপরাধ আড়ালের চেষ্টা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনা ব্যাংক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের নৈতিকতা, ব্যাংক তহবিলের ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং অপরাধ আড়ালের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নীতিমালার দুর্বলতা ব্যবহারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে গুরুতর সব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সিটি ব্যাংকের সাবেক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “আমার দায়িত্ব ছিল মোট আড়াই কোটি ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট বিক্রি করতে হবে। তখন তো মার্কেটের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, কোনো ক্রেতা নেই। আবার প্রায় কোনো মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের দাম ৫ টাকার বেশি নয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাপিটেকের ইউনিট ১৫ টাকার ওপরে বিক্রির একটি মেকানিজম বের করি। যার অংশ হিসেবে ব্লকে বায়ার (ক্রেতা) তৈরি করছিলাম। এরকম ব্লকে মোট ৭২টি লেনদেন করেছি, যার মাধ্যমে আড়াই কোটি ইউনিট বিক্রি করি।”

“এই মেকানিজমের কারণেই কিন্তু ব্যাংক ওই ইউনিট থেকে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করেছে,” দাবি করে তিনি আরও বলেন, “ওই ব্লক লেনদেন থেকে আমিও শেয়ার নিয়েছি, অন্যরাও নিয়েছে। কিন্তু সমস্ত দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যদের কিছুই হয়নি।”

শুধুমাত্র সানোয়ার খান নন, বিএসইসির পর্যবেক্ষণে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকা আরও তিন কর্মকর্তা- এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান ব্লক মার্কেট লেনদেনের মাধ্যমে সিটি ব্যাংকের কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই কর্মকর্তাদের লেনদেনের বিশদ বিবরণীতে দেখা যায় যে, তাঁরা বিভিন্ন স্ক্রিপ্টে (মিডল্যান্ড, ফাইন ফুডস, ওরিয়ন ইনফিউশনস, সানলাইফ ইত্যাদি) ব্লক মার্কেটে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে আবার ওই তহবিলের কাছেই বেশি দামে বিক্রি করে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে ‘অন্যায় সুবিধা’ লাভ করেছেন। এটি সরাসরি ব্যাংক তহবিলের নৈতিক ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বের প্রতি প্রশ্ন তোলে।

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিটি ব্যাংকের ডিএমডি এ কে এম সাইফুল্লাহ কাওছার ব্যাংকটির পুঁজিবাজারের তহবিল থেকে ব্লক মার্কেটে কম দামে শেয়ার কিনেছেন। আবার বাজারদরের (মার্কেট প্রাইস) চেয়ে বেশি দামে তহবিলটিতে বিভিন্ন শেয়ার গছিয়ে দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর সাইফুল্লাহ কাওছার সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে ব্লক মার্কেটে ২৫ হাজার লাভেলোর শেয়ার বিক্রি করেন ৯৭ টাকা দরে, যেখানে বাজারদর ছিল ৯২.২০ টাকা। এ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অন্যায্য মুনাফা হাতিয়ে নেন। একইভাবে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মিডল্যান্ড ব্যাংকের সাড়ে ৩ লাখ শেয়ার সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে ২৯ টাকা ৮০ পয়সায় প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করেন, যেখানে ব্যাংকটির শেয়ারের বাজারদর ছিল ২৭ টাকা ৬০ পয়সা। এই লেনদেনের মাধ্যমে তিনি সেদিন ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা করেন।

এভাবেই সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে মূল বাজারে বেশি দামে বিক্রি, আবার কখনো কখনো তহবিলটিতে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে শেয়ার গছিয়ে দিয়ে অন্যায্য মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন। এভাবে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ২৪ মে পর্যন্ত সিটি ব্যাংকের তহবিলের অপব্যবহার করে ১১টি লেনদেনের মাধ্যমে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফাইন ফুডস ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচা থেকে ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৫ টাকা মুনাফা করেন তিনি।

সিটি ব্যাংকের ডিএমডি মোহাম্মদ মাহমুদ গনি মিডল্যান্ড ব্যাংক ও ফাইন ফুডসের শেয়ার ব্যাংকটির তহবিল থেকে ব্লক মার্কেটে কম দামে কিনে ও বেশি দামে বিক্রি করে ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকার মুনাফা হাতিয়ে নেন। ডিএমডি মো. আশানুর রহমান সিটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে মিডল্যান্ড, সানলাইফ ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচা থেকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা করেছেন।

বিএসইসি তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তহবিল অপব্যবহারের দায়ে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠায়। এর কয়েক দিন পরেই সানোয়ার খানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, “সিটি ব্যাংকের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি সম্প্রতি এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রক্রিয়া শুরু করেছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “তহবিল অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পদভেদে শাস্তির ভিন্নতা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইন ভঙ্গকারী প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরে এলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মাসরুর আরেফিন গত জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদে পরবর্তী তিন বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন। একই বছরের জুন মাসে দেশের শীর্ষ ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সিটি ব্যাংক পিএলসির এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন। তাঁর অধস্তনদের অনিয়ম সম্পর্কে তিন সপ্তাহ ধরে তাঁর বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছেন ডিএসজে প্রতিবেদক। কল করে ও বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সিটি ব্যাংকের অন্দরমহলে ‘লুটপাটের উৎসব’

আপডেট সময় ১২:২৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক পিএলসিতে সুশাসন, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ধারণা যেন কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে আমানতকারীদের তহবিল থেকে বেআইনি সুবিধার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ব্যাংকটির তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা- এমনি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক তদন্ত প্রতিবেদনে।

তদন্তের নথি অনুযায়ী, প্রভাবশালী কর্মকর্তারা ব্যাংকের পোর্টফোলিওকে কার্যত ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন- যেখানে ঝুঁকি গেছে ব্যাংকের ঘাড়ে, আর লাভ ঢুকেছে ব্যক্তিগত পকেটে।

সিটি ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) মতো সংস্থা, যাদের মনোনীত পরিচালকও রয়েছেন। হংকং-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী আর্থিক সাময়িকী ফাইন্যান্স এশিয়ার বিবেচনায় সেরা ব্যাংক হিসেবে গত জুনে ‘ফাইন্যান্স এশিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অর্জন করেছে ব্যাংকটি। একই আয়োজনে সিটি ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল এবং সিটি ব্রোকারেজও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছিল। গত নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ সি-সুইট অ্যাওয়ার্ডস’-এর চতুর্থ আসরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও পেয়েছেন।

এমন একটি স্বনামধন্য ব্যাংকের অন্দরমহলে যখন শীর্ষ কর্মকর্তারাই সিন্ডিকেট করে আমানতকারীদের টাকা লুট করেন, তখন বাহ্যিক পুরস্কার ও ব্র্যান্ড ইমেজের চাকচিক্যের আড়ালে ভয়ংকর অন্ধকার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৫ জন কর্মকর্তা ব্লক মার্কেটে লেনদেনের মাধ্যমে ‘অন্যায় সুবিধা’ নিয়েছেন। সিটি ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে পোর্টফোলিও ম্যানেজার সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে ‘কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ’ বেরিয়ে এসেছে।

বিএসইসির তদন্তে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে ব্যাংকটির আরও তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমানের বিরুদ্ধেও। তদন্তের সূত্রপাত হয় সিটি ব্যাংকের ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খানকে ঘিরে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি নিজের এবং তাঁর স্ত্রী আসমাউল হুসনার বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ব্যাংকের তহবিলের সঙ্গে সরাসরি ‘কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং’-এ জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, একদিকে তিনি ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, অন্যদিকে একই লেনদেনে ব্যক্তিগত ক্রেতা হিসেবে অবস্থান করছেন তিনি নিজেই- যা সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত এবং নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

বিএসইসির প্রতিবেদনে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট এবং বিডি পেইন্টসের শেয়ারে সংঘটিত লেনদেনগুলোকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ৩০ টাকায় শেয়ার কেনার পর একই শেয়ার ৪১.২০ টাকায় আবার ব্যাংকের কাছেই বিক্রি করে কোটি টাকার অবৈধ মুনাফা করেছেন সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রী। সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট কেনাবেচা থেকে। ব্যাংক যেখানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে লোকসান গুনছে, সেখানে আমানতকারীদের অর্থেই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।

গত জানুয়ারিতে অগ্নি সিস্টেমের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় সানোয়ার খান, তাঁর স্ত্রী ও ভাইকে জরিমানা করে বিএসইসি। একই ঘটনায় সিটি ব্যাংককেও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তার আগে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিকতার প্রশ্নে, গত বছরের ১০ জুলাই সিটি ব্যাংক বিএসইসির অনুসন্ধানের জবাবে শুরুতে দাবি করেছিল যে, মো. সানোয়ার খানের লেনদেনগুলো সেই সময়ে ব্যাংকের বিদ্যমান বিনিয়োগ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ সম্মতি মেনেই হয়েছিল।

তবে, যখন বিএসইসি লেনদেনগুলোর অনুমোদন বা অভ্যন্তরীণ নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চায়, তখন সিটি ব্যাংক ভিন্ন তথ্য দেয়। পরবর্তীতে ব্যাংক জানায়, উল্লিখিত লেনদেনগুলোর সময়ে বিনিয়োগ নীতিমালা বা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার অধীনে ব্লক লেনদেনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। তাই অন্য কোনো পদ্ধতি বা বিদ্যমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

এই অসামঞ্জস্যতা ইঙ্গিত করে যে, ব্যাংকটির বিনিয়োগ নীতিমালায় ব্লক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবকে ব্যক্তিগত লাভজনক লেনদেন বৈধ করার বা অপরাধ আড়ালের চেষ্টা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনা ব্যাংক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের নৈতিকতা, ব্যাংক তহবিলের ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং অপরাধ আড়ালের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নীতিমালার দুর্বলতা ব্যবহারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে গুরুতর সব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সিটি ব্যাংকের সাবেক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “আমার দায়িত্ব ছিল মোট আড়াই কোটি ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট বিক্রি করতে হবে। তখন তো মার্কেটের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, কোনো ক্রেতা নেই। আবার প্রায় কোনো মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের দাম ৫ টাকার বেশি নয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাপিটেকের ইউনিট ১৫ টাকার ওপরে বিক্রির একটি মেকানিজম বের করি। যার অংশ হিসেবে ব্লকে বায়ার (ক্রেতা) তৈরি করছিলাম। এরকম ব্লকে মোট ৭২টি লেনদেন করেছি, যার মাধ্যমে আড়াই কোটি ইউনিট বিক্রি করি।”

“এই মেকানিজমের কারণেই কিন্তু ব্যাংক ওই ইউনিট থেকে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করেছে,” দাবি করে তিনি আরও বলেন, “ওই ব্লক লেনদেন থেকে আমিও শেয়ার নিয়েছি, অন্যরাও নিয়েছে। কিন্তু সমস্ত দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যদের কিছুই হয়নি।”

শুধুমাত্র সানোয়ার খান নন, বিএসইসির পর্যবেক্ষণে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকা আরও তিন কর্মকর্তা- এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান ব্লক মার্কেট লেনদেনের মাধ্যমে সিটি ব্যাংকের কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই কর্মকর্তাদের লেনদেনের বিশদ বিবরণীতে দেখা যায় যে, তাঁরা বিভিন্ন স্ক্রিপ্টে (মিডল্যান্ড, ফাইন ফুডস, ওরিয়ন ইনফিউশনস, সানলাইফ ইত্যাদি) ব্লক মার্কেটে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে আবার ওই তহবিলের কাছেই বেশি দামে বিক্রি করে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে ‘অন্যায় সুবিধা’ লাভ করেছেন। এটি সরাসরি ব্যাংক তহবিলের নৈতিক ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বের প্রতি প্রশ্ন তোলে।

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিটি ব্যাংকের ডিএমডি এ কে এম সাইফুল্লাহ কাওছার ব্যাংকটির পুঁজিবাজারের তহবিল থেকে ব্লক মার্কেটে কম দামে শেয়ার কিনেছেন। আবার বাজারদরের (মার্কেট প্রাইস) চেয়ে বেশি দামে তহবিলটিতে বিভিন্ন শেয়ার গছিয়ে দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর সাইফুল্লাহ কাওছার সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে ব্লক মার্কেটে ২৫ হাজার লাভেলোর শেয়ার বিক্রি করেন ৯৭ টাকা দরে, যেখানে বাজারদর ছিল ৯২.২০ টাকা। এ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অন্যায্য মুনাফা হাতিয়ে নেন। একইভাবে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মিডল্যান্ড ব্যাংকের সাড়ে ৩ লাখ শেয়ার সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে ২৯ টাকা ৮০ পয়সায় প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করেন, যেখানে ব্যাংকটির শেয়ারের বাজারদর ছিল ২৭ টাকা ৬০ পয়সা। এই লেনদেনের মাধ্যমে তিনি সেদিন ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা করেন।

এভাবেই সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে মূল বাজারে বেশি দামে বিক্রি, আবার কখনো কখনো তহবিলটিতে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে শেয়ার গছিয়ে দিয়ে অন্যায্য মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন। এভাবে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ২৪ মে পর্যন্ত সিটি ব্যাংকের তহবিলের অপব্যবহার করে ১১টি লেনদেনের মাধ্যমে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফাইন ফুডস ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচা থেকে ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৫ টাকা মুনাফা করেন তিনি।

সিটি ব্যাংকের ডিএমডি মোহাম্মদ মাহমুদ গনি মিডল্যান্ড ব্যাংক ও ফাইন ফুডসের শেয়ার ব্যাংকটির তহবিল থেকে ব্লক মার্কেটে কম দামে কিনে ও বেশি দামে বিক্রি করে ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকার মুনাফা হাতিয়ে নেন। ডিএমডি মো. আশানুর রহমান সিটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে মিডল্যান্ড, সানলাইফ ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচা থেকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বেআইনি মুনাফা করেছেন।

বিএসইসি তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তহবিল অপব্যবহারের দায়ে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠায়। এর কয়েক দিন পরেই সানোয়ার খানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, “সিটি ব্যাংকের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি সম্প্রতি এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রক্রিয়া শুরু করেছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “তহবিল অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পদভেদে শাস্তির ভিন্নতা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইন ভঙ্গকারী প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরে এলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মাসরুর আরেফিন গত জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদে পরবর্তী তিন বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন। একই বছরের জুন মাসে দেশের শীর্ষ ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সিটি ব্যাংক পিএলসির এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন। তাঁর অধস্তনদের অনিয়ম সম্পর্কে তিন সপ্তাহ ধরে তাঁর বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছেন ডিএসজে প্রতিবেদক। কল করে ও বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।