রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য মুজিববর্ষ উপলক্ষে নির্মিত এই প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পুনর্বার তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুতর মনে করে দুদক একটি বিশেষ সাত সদস্যের টিম মাঠে পাঠিয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম নেতৃত্বে এই টিম কাজ করছে এবং ইতিমধ্যেই প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন বিষয়টি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নিশ্চিত করেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হক সুমন এবং তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দুটি প্রধান দিক নিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে এবং কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, শল্লার বিল এলাকায় ৪৩০টি ঘর নির্মাণের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে মোট ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি ঘরের জন্য নির্ধারিত টাকা ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা। প্রথম পর্যায়ে ১১০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরও ৩২০টি ঘরের কাজ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, প্রতিটি ঘর থেকে গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা করে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। এভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এছাড়া প্রকল্প এলাকার ভূমি ভরাটের জন্য ৫৬৬ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ করা হয়েছিল, যা কাবিখা প্রকল্পের আওতায় শ্রমিক দিয়ে বাস্তবায়নের কথা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম অমান্য করে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। নির্ধারিত ৫ু৬ ফুট উচ্চতার পরিবর্তে মাত্র ১.৫ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত মাটি ভরাট করা হয়েছে, যা বর্ষার সময় প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি করছে। অভিযোগ আরও রয়েছে, ড্রেজার দিয়ে উত্তোলিত বালি বিক্রি করে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত মাটি কেটে বাইরে বিক্রি করে আরও প্রায় ৪ কোটি টাকা হাতানো হয়েছে। এর ফলে প্রকল্প এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
পুনর্বাসিত পরিবারগুলো অভিযোগ করেছেন যে, প্রকল্প এলাকায় মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। কমিউনিটি সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা ক্লিনিক, ধর্মীয় স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ বা পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ রাস্তা নেই। পানীয় জলের তীব্র সংকট রয়েছে এবং ১০টি পরিবারকে একটি নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ টোকেন ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই খাত থেকেও প্রায় কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন টিআর, কাবিটা এবং কাবিখার আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেও বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের অস্তিত্ব না থাকলেও ‘কাজ শেষ’ দেখিয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। বরাদ্দের অর্থ ভাগাভাগি সংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছে।
তৎকালীন পিআইও আব্দুল আজিজ বলেন, প্রকল্পগুলো ইউএনওর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়েছে; এ বিষয়ে তিনি ভালো বলতে পারবেন। বর্তমান পীরগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, অভিযোগের সময় তিনি কর্মরত ছিলেন না। অভিযুক্ত সাবেক ইউএনও এবং বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাজমুল হক সুমনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান ইউএনও দেবাশীষ বসাক জানিয়েছেন, অভিযোগ তদন্তে দুদকের একটি টিম পীরগাছায় এসেছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তারা দাবী করেছেন, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় গেল, দায়ী কারা?”
এর আগে একই অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরও তদন্ত শুরু হয়েছিল। ৩ জুলাই দুদকের রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল শল্লার বিল আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় অভিযান চালায়। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আগের তদন্তে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এছাড়া প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ার পরও প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা এবং অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকল্প এলাকার পুনর্বাসিত পরিবারগুলো বলছেন, তারা আশা করেছিল সরকার তাদের জন্য সুষ্ঠু পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের মানহীনতা ও অনিয়ম তাদের জীবনে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্প এলাকার মাটি ভরাটে এবং বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত নিম্নমানের সামগ্রী শুধুমাত্র অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত গম ও অন্যান্য সামগ্রী যথাযথভাবে ব্যবহার না করে বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছে। তারা দাবি করছেন, এই ধরনের অনিয়ম স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, পুনর্বাসিত পরিবারের ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশেষ টোকেন ব্যবহার করে প্রাপ্ত অর্থ ভাগাভাগি করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, যদি এই ধরনের অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
দুদক ইতিমধ্যেই প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং টেকনিক্যাল টিমও তদন্তে সহায়তা করছে। দুদক জানিয়েছে, তদন্তের শেষ পর্যায়ে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা আশা করছেন, এই বার অভিযোগগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তারা চাইছেন, শুধুমাত্র অর্থ ফেরানোই নয়, ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এছাড়া প্রকল্প এলাকার মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হোক।
সংক্ষেপে বলা যায়, পীরগাছা উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগগুলো বহু কোটি টাকার ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো যথেষ্ট গুরুতর। স্থানীয়দের দাবি, সরকারের উচিত এই ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধ করা এবং জনগণের টাকার সুষ্ঠু ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়া।
এই ঘটনা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের মানও প্রভাবিত করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের ঘরগুলো নিম্নমানের এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্ষার সময় প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে তাদের পুনর্বাসন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগের বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দুদক জানিয়েছে, তারা অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত চালাচ্ছে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। স্থানীয়রা আশা করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ ও অন্যান্য সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এই ঘটনা একটি উদাহরণ হিসেবে দেখাচ্ছে, কিভাবে সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্পের অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাতের শিকার হতে পারে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা ও তত্ত্বাবধায়করা দায়িত্বশীলভাবে কাজ না করলে পুনর্বাসন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য — ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা — পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জিত হবে না।
প্রকল্প এলাকার পুনর্বাসিত পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, শুধু ঘর পেয়ে বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না, বরং জীবনমান, নিরাপদ আশ্রয়, পানীয় জল এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তারা চাইছেন, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করা হোক।
অতএব, পীরগাছার আশ্রয়ণ প্রকল্পের এই ঘটনা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির নয়, স্থানীয় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতার উপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দুদকের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ স্থানীয়দের মধ্যে ন্যায্যতার আশা জাগিয়েছে।
সংবাদটি প্রমাণ করে যে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর তত্ত্বাবধান ও স্বচ্ছতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে জনগণের টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্থানীয়রা এই বিষয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
মোঃ মামুন হোসেন 























