ডিজিটাল ভূমি সেবার সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সরকারি অঙ্গীকার থাকলেও ঢাকার আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেল বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের চিত্র ঠিক উল্টো। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মনীতি নয়, বরং এখানকার দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে নাজির ও নৈশপ্রহরীর ইশারায়। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশুলিয়া ভূমি অফিসের নাজির সোহান হাওলাদার, নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া এবং তাদের সহযোগী উমেদার আলমগীর শিকদার ঝন্টুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না।
নৈশপ্রহরীর দখলে এসি ল্যান্ডের কম্পিউটার!
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে অফিসের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অনুপস্থিতিতে তার কক্ষে বসে সরকারি কম্পিউটার ব্যবহার করে নামজারির কাজ করেন নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া। অন্যদিকে, কানুনগো জহিরুল ইসলামের সরকারি লগ-ইন আইডি ও পাসওয়ার্ড বাইরের লোক হয়েও নিয়ন্ত্রণ করেন উমেদার ঝন্টু, যা তথ্য নিরাপত্তা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
ঘুষের ‘অলিখিত’ রেট চার্ট
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নামজারির ফি ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও আশুলিয়া ভূমি অফিসে এই অঙ্কে কোনো কাজ হয় না। ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, এখানে ঘুষের একটি অলিখিত তালিকা বা ‘রেট চার্ট’ মেনে চলতে হয়:
-
সাধারণ নামজারি: ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।
-
‘পার্ট খাস’ জমি: ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
-
এলএ ও ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমি: ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, দাবিকৃত টাকা না দিলে শুনানিতে সেবাগ্রহীতাকে অনুপস্থিত দেখানো হয় কিংবা কাগজে সামান্য ত্রুটির অজুহাতে ফাইল বাতিল করে দেওয়া হয়। অথচ সিন্ডিকেটকে টাকা দিলে জটিল ফাইলও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
১০ লাখ টাকা নিয়ে ফেরত মাত্র ১ লাখ: সিন্ডিকেটের প্রতারণার শিকার লাভলী নামের এক নারী জানান, নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। কাজ করে দিতে ব্যর্থ হলে টাকা ফেরত চান লাভলী। তখন তাকে মাত্র ১ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে মানিক জানান, বাকি টাকা ‘অন্যত্র খরচ হয়ে গেছে’। আরেক ভুক্তভোগী আমির হোসেন জাকির বলেন, “টাকা দেওয়ার পর আমি নিজের চোখেই মানিক মিয়াকে এসি ল্যান্ডের কম্পিউটারে কাজ করতে দেখেছি।”
আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা ও কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: গণমাধ্যমে এসব অনিয়মের খবর উঠে আসার পর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা (মিস মামলা নং ০১/২৫, আশুলিয়া আমলী আদালত) রুজু করেছেন। তবে মামলার পরেও চক্রটির দৌরাত্ম্য কমেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার বলেন, “নৈশপ্রহরী মানিক মিয়াকে কেবল দাপ্তরিক চিঠি আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।” তবে মানিক মিয়ার সরকারি কম্পিউটার ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “এসিল্যান্ড অফিসের অনিয়মের অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
স্থানীয় ভুক্তভোগী মহলের দাবি, দ্রুত এই দুর্নীতিবাজ চক্রের লাগাম টেনে ধরে আশুলিয়া ভূমি অফিসকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















