খুলনা ওয়াসার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ–২)’–এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংস্থাটিতে চরম অস্থিরতা ও বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সব ধরনের বিধি ও জ্যেষ্ঠতাকে উপেক্ষা করে ষষ্ঠ গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।
খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে। সে সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই সরকার ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ–২)’ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত ৯ ডিসেম্বর প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে খুলনার লাখো মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। সূত্র জানায়, খুলনা ওয়াসায় বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডের একজন প্রকৌশলী কর্মরত থাকলেও তাঁকে বাদ দিয়ে ষষ্ঠ গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ আদেশে বলা হয়েছে, খুলনা ওয়াসায় পঞ্চম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা না থাকায় তাঁকে ‘রুটিন দায়িত্ব’ হিসেবে প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে পঞ্চম গ্রেডের প্রকৌশলী সেলিম আহমেদ সেখানে কর্মরত রয়েছেন।
খুলনা ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এই নিয়োগ কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক চাপ। অভিযোগ রয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেত্রী নুসরাত তাবাস্সুম খুলনায় আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন ছাত্রনেতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা খুলনা ওয়াসা কার্যালয়ে গিয়ে সদ্য যোগদান করা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের ওপর রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালক করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
সূত্র মতে, ওই দিন সকালেই খুলনা ওয়াসার নতুন এমডি হিসেবে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যোগদানের প্রথম দিনেই তিনি এমন একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত পরিস্থিতির মুখে পড়েন। ছাত্র প্রতিনিধিরা তাঁকে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর ফাইল প্রসেস করার জন্য বলেন। কয়েক ঘণ্টা পরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ আসে, যেখানে রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদেশে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-৩ শাখার উপসচিব ইবাদত হোসেন।
এই নিয়োগের ফলে খুলনা ওয়াসায় আগে থেকেই দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রেজাউল ইসলামের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ২০২৩ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এডিবির সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন মো. কামাল হোসেন। ২০২৪ সালের ৩০ মে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল্লাহর স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে প্রকল্পের ফোকাল পার্সন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি অন্য কোনো প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
ফলে প্রায় দুই বছর ধরে প্রকল্পটির কারিগরি ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের দায়িত্ব এককভাবে পালন করে আসছিলেন মো. কামাল হোসেন। নতুন করে তাঁকে ফোকাল পার্সন পদ থেকে অপসারণ না করেই রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়ায় এখন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকল্পে কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন, কার নির্দেশ কার্যকর হবে—তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য খুলনা ওয়াসা থেকে চারজন প্রকৌশলী আবেদন করেছিলেন। তাঁরা হলেন পঞ্চম গ্রেডের প্রকৌশলী সেলিম আহমেদ এবং ষষ্ঠ গ্রেডের প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম, মো. কামাল হোসেন ও আরমান সিদ্দিকী। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বোর্ডে অন্য প্রার্থীদের ডাকা হয়নি এবং কোনো স্বচ্ছ সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া ছাড়াই রেজাউল ইসলামকে চূড়ান্ত করা হয়।
পঞ্চম গ্রেডের প্রকৌশলী সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমরা চারজন আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আমাকে নিয়োগ বোর্ডে ডাকা হয়নি। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্তত আমার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল।’ তাঁর দাবি, নিয়ম মেনে নিয়োগ হলে ষষ্ঠ গ্রেডের কোনো প্রকৌশলীর এই প্রকল্পের পিডি হওয়ার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে মো. কামাল হোসেন বলেন, তাঁকেও নিয়োগ বোর্ডে ডাকা হয়নি এবং মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো চিঠিও তিনি পাননি। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো প্রকল্পের ফোকাল পার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাকে এই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো আদেশ পাইনি। আদেশ পেলে অবশ্যই দায়িত্ব হস্তান্তর করব।’
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রেজাউল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, নিয়োগ বোর্ডে সবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ওই দিন তিনি পূর্ণ কর্মদিবস অফিস করেছেন বলে জানা গেছে। কর্মদিবসে অফিসে উপস্থিত থেকে কীভাবে তিনি নিয়োগ বোর্ডে সাক্ষাৎকার দিলেন—এ প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এই ঘটনায় খুলনা ওয়াসার ভেতরে ‘ঠান্ডা লড়াই’ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বোর্ড পরিচালক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ রেজাউল ইসলামের পক্ষে, কেউ আবার নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতার প্রশ্ন তুলে তাঁর নিয়োগের বিরোধিতা করছেন। এর ফলে সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন খুলনা ওয়াসার বোর্ড সদস্য ও ছাত্র প্রতিনিধি ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, নুসরাত তাবাস্সুমসহ কয়েকজনকে নিয়ে ওয়াসায় যাওয়ার কথা তিনি জানেন। তবে তাঁর দাবি, তাঁরা মূলত ওয়াসার সার্বিক কার্যক্রম ও স্থানীয় জনগণের কিছু অভিযোগ তুলে ধরতে গিয়েছিলেন। যদিও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র বলছে, মূল আলোচনার বিষয় ছিল প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ।
এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, তিনি সদ্য যোগদান করেছেন এবং প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত এখনো জানেন না। তবে সংস্থার ভেতরে তৈরি হওয়া এই সংকট তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এডিবি অর্থায়িত প্রকল্প হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এডিবি অর্থায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব কিংবা প্রকল্প স্থগিতের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে খুলনা ওয়াসার এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থায় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে কেন্দ্র করে খুলনা ওয়াসায় যে নিয়োগ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি পদে নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরকারি সংস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও স্বচ্ছতার অভাবের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তেমনি খুলনা ওয়াসার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সংবাদ শিরোনাম ::
২৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প: রাজনৈতিক চাপে খুলনা ওয়াসায় নিয়োগ বিতর্কের মুখে রেজাউল করিম
-
খুলনা প্রতিনিধি - আপডেট সময় ০১:৩৪:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
- ৭০০ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















