সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির এবং একই বিভাগের উচ্চমান সহকারী এনামুল হককে জড়িয়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের যে অভিযোগগুলো ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর কোনো বাস্তব সত্যতা পাওয়া যায়নি। দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলোচিত অভিযোগগুলো তথ্যনির্ভর নয়; বরং একটি স্বার্থান্বেষী চক্র পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মানহানি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানী টিম অভিযোগগুলোর উৎস, ভাষা ও প্রচারের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, একই ধরনের শব্দচয়ন, প্রায় অভিন্ন বর্ণনা ও পুনরাবৃত্ত তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সেগুলো ছড়ানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত অভিযোগ নয়; বরং সমন্বিত একটি অপপ্রচার। অভিযোগগুলোতে কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় সংস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের নথির উল্লেখ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান, অতিরঞ্জন ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার মাধ্যমে জনমনে ভুল ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে টেন্ডার পদ্ধতি লঙ্ঘন ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ যাচাই করতে অনুসন্ধানী দল গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই-জিপি (e-GP) সিস্টেমের রেকর্ড, প্রকল্প অনুমোদনের নথি, কার্যাদেশ, নোটশিট এবং সংশ্লিষ্ট ফাইল পর্যালোচনা করে। নথিপত্রে দেখা যায়, আলোচিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করেই টেন্ডার আহ্বান ও কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। কোথাও এককভাবে কোনো কর্মকর্তার ইচ্ছায় বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যমে যেসব টেন্ডার আইডির দীর্ঘ তালিকা দিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়কাল ও প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু প্রকল্প এমন সময়ের, যখন প্রকৌশলী কায়সার কবির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে ছিলেন না। আবার কিছু প্রকল্প ছিল সমন্বিত সিদ্ধান্তের আওতায়, যেখানে একাধিক কর্মকর্তা ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ যুক্ত ছিলেন। এসব বাস্তব তথ্য আড়াল করে একতরফাভাবে একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করার প্রচেষ্টা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, টেন্ডার পদ্ধতি নির্বাচন কোনো একক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হয় না। প্রকল্পের ধরন, আর্থিক সীমা, সময়সীমা এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী পদ্ধতি নির্ধারিত হয় এবং তা কার্যকর করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাঁদের মতে, নিয়মভঙ্গ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এসব অভিযোগ প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা অথবা ইচ্ছাকৃত বিকৃত উপস্থাপনার ফল।
একইভাবে উচ্চমান সহকারী এনামুল হককে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে বয়স জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং সরকারি বাসা বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোরও কোনো সত্যতা অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানী দল তাঁর সার্ভিস বুক, নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, সরকারি কাগজপত্রে বয়স বা চাকরির তথ্য নিয়ে কোনো অসঙ্গতি নেই। বয়স কমানোর মতো গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি।
এনামুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও বাসা বরাদ্দ বাণিজ্যের অভিযোগও বাস্তবসম্মত নয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী এসব সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট কমিটি ও কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয়ে থাকে। কোনো একক কর্মচারীর পক্ষে এসব প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সময়ের নথিপত্র বিশ্লেষণে এনামুল হকের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক প্রভাব খাটানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানী টিম আরও জানতে পারে, অভিযোগ ছড়ানোর পেছনে প্রশাসনিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে, যারা সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তনের আবহকে কাজে লাগিয়ে কিছু মহল নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে এবং প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্ব ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “আমি সরকারি বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করেছি। যদি কোথাও অনিয়ম থাকত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ব্যবস্থা নিত। কিন্তু এখানে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমাকে ও আমার সহকর্মীকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
উচ্চমান সহকারী এনামুল হকও অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমার চাকরি জীবন স্বচ্ছ নথির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যাঁরা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা চায় আমাদের সম্মানহানি করতে।” তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে তিনি আইনি পথেও এসব মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
আইন ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রমাণহীন অভিযোগ ছড়িয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করা শুধু অনৈতিক নয়, আইনত দণ্ডনীয়ও হতে পারে। এতে প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাঁরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের তথ্য যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশের আহ্বান জানান।
দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার অনুসন্ধানে সার্বিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির ও এনামুল হককে জড়িয়ে ছড়ানো অভিযোগগুলো তথ্যভিত্তিক নয়। কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, সাক্ষ্য বা সরকারি তদন্তে এসব অভিযোগের সমর্থন পাওয়া যায়নি। বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচার, যার লক্ষ্য প্রশাসনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা এবং গুজব প্রতিরোধ করা। দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি বিশ্বাস করে, তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই জনআস্থা রক্ষার একমাত্র পথ। পাঠকদের প্রতি আহ্বান—যে কোনো অভিযোগ বা তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের আগে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করুন, যাতে মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















