ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অনিয়মের অভিযোগে বদলি নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন মুশিউর রহমান, ওএসডি সন্ধ্যার মধ্যে ছয় জেলায় ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কবার্তা আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাথমিক ভূমি পরিদর্শন ‘পিংক বাস’ সার্ভিসে এবার এলো ই-টিকিটিং সেবা দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে : মঈন খান এডমিরাল পদে পদোন্নতি পেলেন নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার নতুন সময়সূচি ঘোষণা ইতিহাসে প্রথমবার এমন লজ্জায় পড়ল বাংলাদেশ হরমুজকে ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ ঘোষণা করে মানচিত্র প্রকাশ করলেন ট্রাম্প

মেধাতালিকার শীর্ষে ড্রাইভার আবেদ আলীর প্রার্থীরা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০২:৫৪:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৭১২ বার পড়া হয়েছে

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। আর এই জালিয়াতির সূত্র ধরে ফের সামনে এসেছেন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের আলোচিত চরিত্র আবেদ আলী। কারণ, ওই নিয়োগ পরীক্ষার ফলে মেধাতালিকার শীর্ষ স্থানগুলো মূলত তারাই দখল করেছেন, যারা পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে ও পরে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা করেন আবেদ আলীর ব্যাংক হিসাবে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী নিজেও পিএসসিতে চাকরি নিয়েছিলেন জালিয়াতি (ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার) করে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পিএসসির সেই চাকরি হারান।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে সরকারি কর্ম কমিশনের সরাসরি নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ অন্তত চারজন প্রার্থীর সঙ্গে আবেদ আলীর আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এই চার কর্মকর্তা হলেন—শেরপুর জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) সানোয়ার হোসাইন, হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. আনিসুর রহমান, ঝালকাঠি জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. খাইরুল ইসলাম এবং মেহেরপুর জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. হাবিবুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষা খাতে নতুন স্কুল-কলেজ, শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব, টয়লেট ব্লক নির্মাণ এবং পুরোনো ভবনের সংস্কারসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। আর এসব প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব থাকে সহকারী প্রকৌশলীর (পুর) হাতে।

জানা গেছে, আবেদ আলীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সম্পৃক্ত এই চার কর্মকর্তাসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আবেদ আলীর হিসাবে অর্থ লেনদেন করেছেন—এমন কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তারা যেসব নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, সেগুলোর প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।’

পরীক্ষার আগে অর্থ লেনদেন: পিএসসির প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে আবেদ আলীর নাম সামনে আসার পর এই চক্রের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে মাঠে নামে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে আবেদ চক্রের ১১৫টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পায়, যেগুলোতে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে আবেদ আলী ও তার পরিবার সংশ্লিষ্ট ১৬টি হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৬০ কোটি টাকারও বেশি। এ-সংক্রান্ত নথি হাতে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক এশিয়ার রিং রোড শাখায় ‘দোলন রাইস শপ’ নামে একটি হিসাব খুলে প্রশ্নফাঁসের অর্থ লেনদেন করেছেন আবেদ আলী। যদিও অনুসন্ধানে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি । নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানের অফিস হিসেবে মিরপুরের যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি মূলত আবেদ আলীর বাসভবন। এই ভুয়া হিসাবেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আলোচিত নিয়োগ পরীক্ষার সময় একাধিক প্রার্থী অর্থ জমা দেন, যারা পরবর্তী সময়ে প্রথম শ্রেণির সমমর্যাদা পদের ওই চাকরিটিতে নিয়োগ পান। তাদের মধ্যে একজন সানোয়ার হোসাইন। তিনি দুই ধাপে মোট ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেন। লিখিত ও মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে এই অর্থ জমা করা হয়েছে। পিএসসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে নিয়োগ দিতে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা এবং ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ভাইভা শুরু হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর প্রকাশ করা হয় চূড়ান্ত ফল। এতে ৬০ জন প্রার্থী নিয়োগ পান।

দোলন রাইস শপের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, লিখিত পরীক্ষার প্রায় এক মাস পর এবং ফল প্রকাশের আগে, ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর ছানোয়ার হোসাইন ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা নগদ জমা দেন। এর মধ্যে ২৫টি ছিল এক হাজার টাকার নোট এবং ৪০০টি পাঁচশ টাকার নোট। পরে ভাইভা ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের মাঝামাঝি সময়ে, ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি আরও ২ লাখ টাকা জমা দেন। এ সময় নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন নম্বর (০১৭৯১৭৭০৯৬৭) এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি (আইডি নম্বর: ৩২৮৫৯৬৪০৪৯) ব্যবহার করেছেন। চূড়ান্ত ফলে দেখা যায়, ছানোয়ার হোসাইন মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর (ডুয়েট) থেকে পাস করা ছানোয়ার ছাড়াও তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন বন্ধু আবেদ আলীর সহায়তায় প্রথম শ্রেণির ওই চাকরিতে যোগ দেন। তাদেরই একজন হাবিবুর রহমান। যিনি ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর, অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষার এক মাস পর আবেদ আলীর হিসাবে ২ লাখ টাকা জমা দেন। এ সময় তিনি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের (আইডি নম্বর: ৫০৫২৫৮৮৭৫০) ফটোকপিও ব্যাংকের জমা স্লিপের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেটে দেখা যায়, হাবিবুর রহমান মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

মেধাতালিকায় ঠাঁই পাওয়া একই বলয়ের আরেকজন হলেন খাইরুল ইসলাম। ছানোয়ার ও হাবিবের মতো তিনিও ডুয়েট থেকে পাস করেছেন। নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালীন ২০২০ সালের ১ নভেম্বর তিনি নিজের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হিসাব (অ্যাকাউন্ট নম্বর: ১৮১১৫১০১৮৬৮৯০) থেকে আবেদ আলীর ‘দোলন রাইস শপ’-এর হিসাবে ৬ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন। লেনদেনটি ছিল রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস), অর্থাৎ গ্রাহকের সরাসরি নির্দেশনায় তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর। এরপর খাইরুল ইসলাম মেধাতালিকায় তৃতীয় হন। বর্তমানে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঝালকাঠি জেলা অফিসে কর্মরত। এ ছাড়া মেধাতালিকার ৩৬তম স্থানে থাকা আনিসুর রহমান ২০২০ সালের ২৯ আগস্ট নিজের আপন ছোট ভাই এস এম আবির হোসাইনের মাধ্যমে আবেদ আলীর হিসাবে ৫ লাখ টাকা জমা দেন। বর্তমানে আনিসুর রহমান হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে কর্মরত।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যরা মূলত নগদ অর্থে লেনদেন করতেন। আবেদ আলীর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ নগদ জমার তথ্য তার প্রমাণ। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীরা নিজেরাই সরাসরি আবেদের হিসাবে অর্থ জমা দিয়েছেন, এই লেনদেনগুলোই মূলত শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত এগোলে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সুবিধাভোগীর এই তালিকা আরও দীর্ঘ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরীক্ষা চলাকালীন আবেদ আলীর সঙ্গে অর্থ লেনদেন এবং মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেধাতালিকায় ঠাঁই পাওয়া চারজনের সঙ্গেই মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের কেউই কল ধরেননি। এরপর কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

এই চারজনের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নিয়োগ পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপের আগে বা পরে আবেদ আলীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তারা চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন। আর এতে করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছেন কি না এবং কীভাবে একটি সংগঠিত চক্র বছরের পর বছর সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, সেসব নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠছে।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা খতিয়ে দেখব। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অনিয়মের অভিযোগে বদলি নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন মুশিউর রহমান, ওএসডি

মেধাতালিকার শীর্ষে ড্রাইভার আবেদ আলীর প্রার্থীরা

আপডেট সময় ০২:৫৪:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। আর এই জালিয়াতির সূত্র ধরে ফের সামনে এসেছেন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের আলোচিত চরিত্র আবেদ আলী। কারণ, ওই নিয়োগ পরীক্ষার ফলে মেধাতালিকার শীর্ষ স্থানগুলো মূলত তারাই দখল করেছেন, যারা পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে ও পরে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা করেন আবেদ আলীর ব্যাংক হিসাবে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী নিজেও পিএসসিতে চাকরি নিয়েছিলেন জালিয়াতি (ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার) করে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পিএসসির সেই চাকরি হারান।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে সরকারি কর্ম কমিশনের সরাসরি নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ অন্তত চারজন প্রার্থীর সঙ্গে আবেদ আলীর আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এই চার কর্মকর্তা হলেন—শেরপুর জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) সানোয়ার হোসাইন, হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. আনিসুর রহমান, ঝালকাঠি জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. খাইরুল ইসলাম এবং মেহেরপুর জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. হাবিবুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষা খাতে নতুন স্কুল-কলেজ, শ্রেণিকক্ষ, আইসিটি ল্যাব, টয়লেট ব্লক নির্মাণ এবং পুরোনো ভবনের সংস্কারসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। আর এসব প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব থাকে সহকারী প্রকৌশলীর (পুর) হাতে।

জানা গেছে, আবেদ আলীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সম্পৃক্ত এই চার কর্মকর্তাসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আবেদ আলীর হিসাবে অর্থ লেনদেন করেছেন—এমন কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তারা যেসব নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, সেগুলোর প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।’

পরীক্ষার আগে অর্থ লেনদেন: পিএসসির প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে আবেদ আলীর নাম সামনে আসার পর এই চক্রের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে মাঠে নামে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে আবেদ চক্রের ১১৫টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পায়, যেগুলোতে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে আবেদ আলী ও তার পরিবার সংশ্লিষ্ট ১৬টি হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৬০ কোটি টাকারও বেশি। এ-সংক্রান্ত নথি হাতে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক এশিয়ার রিং রোড শাখায় ‘দোলন রাইস শপ’ নামে একটি হিসাব খুলে প্রশ্নফাঁসের অর্থ লেনদেন করেছেন আবেদ আলী। যদিও অনুসন্ধানে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি । নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানের অফিস হিসেবে মিরপুরের যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি মূলত আবেদ আলীর বাসভবন। এই ভুয়া হিসাবেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আলোচিত নিয়োগ পরীক্ষার সময় একাধিক প্রার্থী অর্থ জমা দেন, যারা পরবর্তী সময়ে প্রথম শ্রেণির সমমর্যাদা পদের ওই চাকরিটিতে নিয়োগ পান। তাদের মধ্যে একজন সানোয়ার হোসাইন। তিনি দুই ধাপে মোট ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেন। লিখিত ও মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে এই অর্থ জমা করা হয়েছে। পিএসসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে নিয়োগ দিতে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা এবং ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ভাইভা শুরু হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর প্রকাশ করা হয় চূড়ান্ত ফল। এতে ৬০ জন প্রার্থী নিয়োগ পান।

দোলন রাইস শপের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, লিখিত পরীক্ষার প্রায় এক মাস পর এবং ফল প্রকাশের আগে, ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর ছানোয়ার হোসাইন ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা নগদ জমা দেন। এর মধ্যে ২৫টি ছিল এক হাজার টাকার নোট এবং ৪০০টি পাঁচশ টাকার নোট। পরে ভাইভা ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের মাঝামাঝি সময়ে, ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি আরও ২ লাখ টাকা জমা দেন। এ সময় নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন নম্বর (০১৭৯১৭৭০৯৬৭) এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি (আইডি নম্বর: ৩২৮৫৯৬৪০৪৯) ব্যবহার করেছেন। চূড়ান্ত ফলে দেখা যায়, ছানোয়ার হোসাইন মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর (ডুয়েট) থেকে পাস করা ছানোয়ার ছাড়াও তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন বন্ধু আবেদ আলীর সহায়তায় প্রথম শ্রেণির ওই চাকরিতে যোগ দেন। তাদেরই একজন হাবিবুর রহমান। যিনি ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর, অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষার এক মাস পর আবেদ আলীর হিসাবে ২ লাখ টাকা জমা দেন। এ সময় তিনি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের (আইডি নম্বর: ৫০৫২৫৮৮৭৫০) ফটোকপিও ব্যাংকের জমা স্লিপের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেটে দেখা যায়, হাবিবুর রহমান মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

মেধাতালিকায় ঠাঁই পাওয়া একই বলয়ের আরেকজন হলেন খাইরুল ইসলাম। ছানোয়ার ও হাবিবের মতো তিনিও ডুয়েট থেকে পাস করেছেন। নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালীন ২০২০ সালের ১ নভেম্বর তিনি নিজের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হিসাব (অ্যাকাউন্ট নম্বর: ১৮১১৫১০১৮৬৮৯০) থেকে আবেদ আলীর ‘দোলন রাইস শপ’-এর হিসাবে ৬ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন। লেনদেনটি ছিল রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস), অর্থাৎ গ্রাহকের সরাসরি নির্দেশনায় তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর। এরপর খাইরুল ইসলাম মেধাতালিকায় তৃতীয় হন। বর্তমানে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঝালকাঠি জেলা অফিসে কর্মরত। এ ছাড়া মেধাতালিকার ৩৬তম স্থানে থাকা আনিসুর রহমান ২০২০ সালের ২৯ আগস্ট নিজের আপন ছোট ভাই এস এম আবির হোসাইনের মাধ্যমে আবেদ আলীর হিসাবে ৫ লাখ টাকা জমা দেন। বর্তমানে আনিসুর রহমান হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে কর্মরত।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যরা মূলত নগদ অর্থে লেনদেন করতেন। আবেদ আলীর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ নগদ জমার তথ্য তার প্রমাণ। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীরা নিজেরাই সরাসরি আবেদের হিসাবে অর্থ জমা দিয়েছেন, এই লেনদেনগুলোই মূলত শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত এগোলে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সুবিধাভোগীর এই তালিকা আরও দীর্ঘ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরীক্ষা চলাকালীন আবেদ আলীর সঙ্গে অর্থ লেনদেন এবং মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেধাতালিকায় ঠাঁই পাওয়া চারজনের সঙ্গেই মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের কেউই কল ধরেননি। এরপর কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

এই চারজনের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নিয়োগ পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপের আগে বা পরে আবেদ আলীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তারা চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন। আর এতে করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছেন কি না এবং কীভাবে একটি সংগঠিত চক্র বছরের পর বছর সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, সেসব নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠছে।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা খতিয়ে দেখব। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’