ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ বহু দিনের। বিদ্যুৎ আসে না, লাইনের মান খারাপ, ট্রান্সফরমার ভেঙে পড়ে, আর বজ্রপাত হলে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ অচল হয়ে যায়। কিন্তু এর পেছনে যে এক বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট কাজ করছে-তা সাধারণ মানুষ জানে না। সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিপিডিসির একজন বিতর্কিত প্রকৌশলী-ফয়েজ করিম।
গত কয়েক মাস ধরে চলা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন ভয়াবহ তথ্য, যা শুধু ডিপিডিসির ভেতরের দুর্নীতি নয়-বরং সরকারি অর্থ লুট, দরপত্র কারসাজি এবং ইচ্ছাকৃত নকশাগত ভুলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অপরাধচক্রের আভাস দেয়। দরপত্রেই শুরু লুটপাট “ফয়েজ করিম না চাইলে টেন্ডারই পাস হয় না” ডিপিডিসির সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ-দরপত্র মূল্যায়নে ভয়ংকর কারসাজি।
ঠিকাদারদের ভাষায়- “ফয়েজ করিমকে না খুশি করলে কাজ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” দরপত্রের বোর্ড মিটিংয়ে নিজের ইচ্ছামতো পয়েন্ট কেটে দেয়া, প্রযুক্তিগত দলিল বাতিল করে দেয়া, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য দেখানো-এসব অভিযোগ বহুদিনের। বিশেষ করে বলা হয়, তিনি নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন।
একজন ঠিকাদার বলেন- “আমাদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, সব ঠিক থাকার পরও ফয়েজ করিম শুধু ঘুষ না পাওয়ায় স্কোর কেটে দেয়। পরে দেখি যাদের যোগ্যতা কম-তাদেরই কাজ দেয়া হয়।”
এই সিন্ডিকেটে তাঁর সাথে আরও কয়েকজন প্রকৌশলী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, যারা দরপত্র খোলার দিন থেকেই “ভাড়াটে প্রতিনিধি” নিয়োগ করে রাখেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি চাঞ্চল্যকর মডেল-যা ফয়েজ করিম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলীরা নিয়মিত ব্যবহার করেন : দরপত্র প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ, টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে বাকিদের বাদ দেয়া সহজ হয়, মূল্যায়ন কমিটিতে নিজের লোক বসিয়ে রাখা, পছন্দের ঠিকাদারদের নথি অসম্পূর্ণ থাকলেও “টেকনিক্যালি রেসপনসিভ” ঘোষণা করা, অপছন্দের ঠিকাদারদের ক্ষুদ্র ভুল দেখিয়ে বাতিল করা, কাজ পাওয়ার পর ঘুষের ভাগ আদায়, ঠিকাদারদের ভাষায় এটি “ফয়েজ মডেল” নামে পরিচিত।
বিদ্যুৎ বিতরণ প্রকল্পে নকশাজনিত ভুল হলে শুধু বিলম্ব হয় না-জাতীয় সম্পদের অপচয়ও ঘটে। আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে-
একাধিক সাবস্টেশনের নকশায় গুরুতর ত্রুটি : যেখানে লোড ক্যালকুলেশন ভুল হওয়ায় প্রকল্পের মাঝপথে সম্পূর্ণ ডিজাইন বদলাতে হয়েছে। এতে কোটি টাকার উপকরণ ফেরত এনে নতুন উপকরণ ক্রয় করতে হয়েছে।
অনুপযোগী কেবল বসানো : মানহীন কেবল ব্যবহার করে পরে আবার নতুন করে কেবল বসানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে অন্তত ৪-৫ গুণ বেশি খরচ হয়েছে।
ভুল লোড ডিস্ট্রিবিউশন : কিছু এলাকায় সাবস্টেশনের লোড ক্ষমতা এলাকার প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য না থাকায় বারবার ট্রিপিং হয়।
ফলাফল- ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত, বাসাবাড়ির যন্ত্রপাতি নষ্ট, ব্যবহারকারীরা কয়েক বছর ধরে হয়রানির শিকার, কিন্তু অভিযোগ-এই সব ভুল ইচ্ছাকৃত, যাতে নতুন করে কাজ দেখিয়ে আরেক দফা কমিশন আদায় করা যায়। ফিল্ড অফিসের কর্মীরা আতঙ্কে-“ফয়েজ করিমের বিরুদ্ধে কিছু বলতে নেই” ডিপিডিসির ভেতরের কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছে আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধান টিম। অনেকেই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাদের ভাষায়- “উনার একটি দল আছে। কেউ অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে বদলি।” “কাজ সঠিকভাবে করতে গেলেও সমস্যা, কারণ তিনি না বললে কোনো ফাইল ছাড়ে না।” বলা হয়, ফয়েজ করিমের অফিসে ঢুকতে হলে আগে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে “ইঙ্গিত” দিতে হয়-যিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে “সুবিধা” নেয়ার অভিযোগে বহুবার আলোচনায় ছিলেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি-ক্ষতির বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর : ফয়েজ করিমের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন প্রকল্পে দেখা গেছে- সময়মতো কাজ শুরু না করা, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব, উপকরণ সংগ্রহে দুর্নীতি, মানহীন কাজ, একাধিকবার রি-ডিজাইন ফলে প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় বেড়েছে ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত। যে অর্থ যোগ হয়েছে-তা জনগণের করের টাকা।
ঘুষ না দিলে বিল পাস হয় না : অনেক ঠিকাদার অভিযোগ করেন- “বিল পাস করতে হলে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ দিতে হয়।” বিলের ওপর ভিত্তি করে শতাংশ হিসাব করে এ টাকা আদায় করা হয়। অনেকে বলেন- “আমরা কাজ করে টাকা পাই না, কিন্তু ঘুষ না দিলে বিল উঠানোই যায় না।” এই অভিযোগ শুধু এক নয়-অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একই কথা শোনা গেছে। ডিপিডিসি অভ্যন্তরে ক্ষমতার রাজনীতি-কেন এত শক্তিশালী ফয়েজ করিম? একাধিক কর্মকর্তা বলছেন-ফয়েজ করিম দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী লবি তৈরি করেছেন।
তার সঙ্গে যুক্ত- কয়েকজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী, কিছু ঠিকাদারি গ্রুপ, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা, এই নেটওয়ার্কই তাকে প্রায় অদম্য বানিয়েছে।
ডিপিডিসির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন- “উনি চাইলে কাউকে উপরে তুলতে পারেন, চাইলে ঠেকিয়েও দিতে পারেন। অনেকেই তাই নীরব।”
বহিরাগত পরামর্শক নিয়ন্ত্রণ : বিশেষজ্ঞরা বলেন-বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাইরে থেকে আসা পরামর্শকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু অভিযোগ-ফয়েজ করিম এদেরও নিয়ন্ত্রণ করেন। যারা নকশা যাচাই করে, তারা যেন তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু না লেখেন-সেজন্য আগেই সমন্বয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোটি টাকার কেবল চুরি-অভিযোগ ওঠে তাঁর ইউনিটে : বিভিন্ন সাবস্টেশনের জন্য আনা কেবল কয়েকদিন পরই গায়েব হয়ে যায়-এমন অভিযোগও রয়েছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন- “স্টোর থেকে কেবল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এসব তদন্তে নাম কখনোই ওঠে না।” অনেকে বলেন-এ চক্র এতই শক্তিশালী যে তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই রিপোর্ট “ম্যানেজ” হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য – “আমরা ন্যায্য সুযোগ চাই, ঘুষ নয়” ঠিকাদাররা বলছেন- তারা ঘুষ দিতে চান না, তারা সঠিক নিয়মে কাজ করতে চান, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যাচ্ছে, একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- “দক্ষতা, অভিজ্ঞতা-কিছুই কাজে লাগে না। কাজ পাওয়ার নিয়ম একটাই-ফয়েজ করিমকে ‘সন্তুষ্ট’ করো।”
বিদ্যুৎ খাতের এক বিশেষজ্ঞ বলেন- “নকশাগত ভুলের কারণে আগুন লাগে, ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ঘটে। এসব শুধু দুর্নীতি নয়-জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে।” আরেকজন বলেন- “এ ধরনের সিন্ডিকেট বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে। সঠিক ডিজাইন না হলে ব্যাকআপ সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে।” ডিপিডিসির অবস্থান – “আমরা জানি না, খোঁজ নেয়া হবে” অভিযোগগুলো নিয়ে ডিপিডিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন- “আমরা বিষয়টি শুনছি। প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।” কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন- “এক দশক ধরে একই কথা শুনছি। কেউ ব্যবস্থা নেন না।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















