রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী তারেক মো. সামছ তুষারের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডারে অনিয়ম এবং ঠিকাদারদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কমিশন ছাড়া তিনি কোনো ফাইল অনুমোদন করেন না। চাহিদামতো অর্থ না পেলে ঠিকাদারদের নানা অজুহাতে দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রাখা, টেন্ডারের কার্যক্রম বিলম্বিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান প্রকৌশলী সামছ তুষার। তিনি বলেন, “জিএম সব জানেন, যা বলার উনাকেই বলুন। তিনিই এর জবাব দেবেন।” পরে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ব্যক্তিগত অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ও কি জিএম নেবেন? জবাবে তিনি আবারও বলেন, “হ্যাঁ, যা বলবেন জিএমকেই বলুন।”
অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ রয়েছে এবং একাধিক ঠিকাদারের বক্তব্য ও অডিও রেকর্ড রয়েছে জানানো হলে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার হওয়ায় কমিশন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “কোন ঠিকাদার কমিশনের কথা বলেছে, তাকে নিয়ে আসুন।”
তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, বাস্তবে ই-জিপি ব্যবস্থাও দুর্নীতি ঠেকাতে পারেনি। বরং টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে নতুন কৌশলে কমিশন বাণিজ্য চলছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৌশলী সামছ তুষার টেন্ডারের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেন। কমিশন না দিলে টেন্ডারের কার্যক্রমে নানা জটিলতা সৃষ্টি করা হয় এবং ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে হয়।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূল্যে মালামাল ক্রয়ের সুযোগ করে দিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়। কাজ শেষে বিল প্রস্তুত, অনুমোদন এবং হিসাব শাখা থেকে চেক ছাড় করাতেও বিভিন্ন ধাপে ঘুষ দিতে হয় বলে দাবি তাদের।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রেলওয়ের বাজারদর নির্ধারণ কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ফলে ঠিকাদাররা কার্যত একটি অনিয়মের চক্রের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন।
কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, প্রকৌশলী সামছ তুষারের নামে-বেনামে একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে কৌশলে ই-জিপির বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ কাজে তার দপ্তরের এক কর্মচারীও সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, দুদক বা নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা তদন্ত করলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে আসবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল শাখার অধীনে প্রতি অর্থবছরে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন ও ক্রয়কাজ হয়। এই প্রকল্পগুলো থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কিছু টেন্ডার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাইসেন্সের মাধ্যমে বাস্তবায়নেরও অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদাররা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ দিয়ে প্রকৌশলী সামছ তুষার নিজ জেলা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, “প্রকৌশলী সামছ তুষার যদি অনিয়ম করে থাকেন, তাহলে তাকে নিয়েই লিখুন। সেখানে আমাকে টানছেন কেন? আমি কি তার দায় নেব?”
পরে তাকে জানানো হয়, প্রকৌশলী সামছ তুষার নিজেই জিএমের সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। জবাবে মহাব্যবস্থাপক বলেন, “আপনি সোমবার সকাল ১১টার দিকে আসুন। আমি তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করব, সে কেন আমার নাম বলেছে।”
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















