ঢাকা ১২:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিএনপির নারী এমপিকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ র‍্যাবের নাম বদলে আসছে এসআরবি অফিস টাইমে ক্লিনিকে রোগী দেখছিলেন সরকারি চিকিৎসক, লাইসেন্স বাতিল ও বরখাস্তের নির্দেশ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ১২ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া সংস্কৃতির মাধ্যমে বিদায় করতে হবে : শফিকুর রহমান আ.লীগের কার্যক্রম নিয়ে ভারতকে কড়া বার্তা শামা ওবায়েদের  কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪ গ্রেপ্তার, উদ্ধার এক ভিকটিম ব্রাহ্মণপাড়ায় নবাগত ইউএনওর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় কালিহাতীতে ২১৯ বোতল ফেন্সিডিলসহ রাজশাহীর শীর্ষ মাদককারবারি গ্রেপ্তার বড়লেখায় গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

মাদরাসা থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রীর খোঁজ মেলেনি ৪৮ দিনেও

ঠাকুরগাঁওয়ে তিন মাদরাসাছাত্রী নিখোঁজের ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ৪৮ দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজের দিন রাতেই তারা ঠাকুরগাঁও শহরের রোড এলাকার এক আবাসিক হোটেলে ওঠে এবং ভোরের আগেই হোটেল ত্যাগ করে। এরপর থেকেই আর কোনো খোঁজ মেলেনি তাদের। এ ঘটনায় গত ৯ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

তবে নিখোঁজের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও সন্তানদের সন্ধান না পেয়ে মা-বাবার আহাজারি যেন থামছেই না। তারা প্রতিনিয়তই লিফলেট হাতে নিয়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন। তবুও মিলছে না কোনো সান্ত্বনা কিংবা নিশ্চিত খবর।

নিখোঁজ ছাত্রীরা হচ্ছে- দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মুরারিপূর গ্রামের শাহজালালের মেয়ে জুঁই (১৪), একই উপজেলার গণকপয়েনর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস তামান্না (১৬) ও ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গোবিন্দ নগর এলাকার বাসিন্দা রবিউলের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)। তারা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর মাদরাসাপাড়া এলাকায় অবস্থিত হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বালিকা মাদরাসার ছাত্রী।

মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় সর্বশেষ মাদরাসায় দেখা যায় ওই তিন ছাত্রীকে। ভোর ৫টার দিকে তাদের ডাকতে তাদের রুমে গেলে তাদের আর পাওয়া যায়নি। পরে মাদরাসার দোতলার বারান্দায় মশারি ঝুলন্ত অবস্থায় বাধা দেখতে পেয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ধারণা করে তারা পালিয়ে গেছে।

শহরের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, নিখোঁজ তিন ছাত্রী রাত ১টার সময় একটি রিকশা করে প্রথমে ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ডে যায়। এরপর রিকশা বদল করে তারা ঠাকুরগাঁও রেলস্টেশনে যায়। তবে সেই রাতে কোনো ট্রেন না পেয়ে রোড আবাসিক হোটেলে ভোর ৪টা পর্যন্ত অবস্থান করে। পরে হোটেল ম্যানেজারের সাহায্যে তারা স্টেশনে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করে রোড অটোস্ট্যান্ডে ফিরে যায় এবং ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের উদ্দেশ্যে একটি অটোরিকশা নিয়ে রওনা হয়। এরপর থেকেই তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

এ বিষয়ে রোড আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান ইমন বলেন, রাত ২টার দিকে তিনজন মেয়ে এসে বলে তারা হোটেলে কিছুক্ষণ থাকবে, এরপর ভোর রাতেই আবার বেরিয়ে যাবে। পরে আমি তাদের ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে তুলে দেই।

তবে যারা ওই হোটেলে রাত্রিযাপন করেন তাদের নাম ঠিকানা তাদের রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় না বলে অভিযোগ হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

নিখোঁজদের পরিবার বলছে, আমরা থানায় গিয়েছি, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। পুলিশ শুধু বলছে তদন্ত চলছে। ৪৮দিনেও মেয়েদের খোঁজ না মেলায় আমরা হতাশ। আমাদের মেয়েরা কী করছে, কীভাবে আছে আল্লাহই ভালো জানে। আমরা আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই।

নিখোঁজ তামান্নার মা আকলিমা বেগম বলেন, মাদরাসায় অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে। তবুও কর্তৃপক্ষ মাদরাসা ভবনে কোনো প্রকার নিরাপত্তা প্রহরী রাখেনি। তাদের ভবনের বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই, ফলে সহজেই কেউ চাইলে ভবনের ভেতরে বা ভবন থেকে বাইরে যেতে পারছে। আমরা তো আমাদের মেয়েদের তাদের ভরসায় সেখানে রেখেছিলাম।

নিখোঁজ আয়েশার বোন লাবনী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মারধর করে, নির্যাতন করে। আমার বোন নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে আমাদের এই নির্যাতনের কথা জানিয়েছিল এবং দ্রুতই সেখান থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল। তবে আমরা নিয়ে আসিনি, যার ফলে আজ আমার বোনকে হারাতে হলো। আমি নিশ্চিত, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে এই তিন মেয়ে পালিয়ে গেছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার দায় স্বীকার করে মাদরাসার প্রধান শিক্ষিকা হামিদা বেগম বলেন, আমরা বুঝতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে। আমরা মাদরাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছিলাম। তবে আমার বিরুদ্ধে যে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে সেটা ভিত্তিহীন। আমরা তাদের খুঁজছি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিন শিক্ষার্থী নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রশাসনের কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। পুলিশের পক্ষে থেকে কোনো গাফিলতি নেই।

জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ওই তিন ছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের খুঁজে বের করার। আশা করছি দ্রুতই তারা পরিবারের কাছে ফিরবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপির নারী এমপিকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ

মাদরাসা থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রীর খোঁজ মেলেনি ৪৮ দিনেও

আপডেট সময় ০৬:০৩:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

ঠাকুরগাঁওয়ে তিন মাদরাসাছাত্রী নিখোঁজের ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ৪৮ দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজের দিন রাতেই তারা ঠাকুরগাঁও শহরের রোড এলাকার এক আবাসিক হোটেলে ওঠে এবং ভোরের আগেই হোটেল ত্যাগ করে। এরপর থেকেই আর কোনো খোঁজ মেলেনি তাদের। এ ঘটনায় গত ৯ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

তবে নিখোঁজের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও সন্তানদের সন্ধান না পেয়ে মা-বাবার আহাজারি যেন থামছেই না। তারা প্রতিনিয়তই লিফলেট হাতে নিয়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন। তবুও মিলছে না কোনো সান্ত্বনা কিংবা নিশ্চিত খবর।

নিখোঁজ ছাত্রীরা হচ্ছে- দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মুরারিপূর গ্রামের শাহজালালের মেয়ে জুঁই (১৪), একই উপজেলার গণকপয়েনর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস তামান্না (১৬) ও ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গোবিন্দ নগর এলাকার বাসিন্দা রবিউলের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)। তারা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর মাদরাসাপাড়া এলাকায় অবস্থিত হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বালিকা মাদরাসার ছাত্রী।

মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় সর্বশেষ মাদরাসায় দেখা যায় ওই তিন ছাত্রীকে। ভোর ৫টার দিকে তাদের ডাকতে তাদের রুমে গেলে তাদের আর পাওয়া যায়নি। পরে মাদরাসার দোতলার বারান্দায় মশারি ঝুলন্ত অবস্থায় বাধা দেখতে পেয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ধারণা করে তারা পালিয়ে গেছে।

শহরের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, নিখোঁজ তিন ছাত্রী রাত ১টার সময় একটি রিকশা করে প্রথমে ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ডে যায়। এরপর রিকশা বদল করে তারা ঠাকুরগাঁও রেলস্টেশনে যায়। তবে সেই রাতে কোনো ট্রেন না পেয়ে রোড আবাসিক হোটেলে ভোর ৪টা পর্যন্ত অবস্থান করে। পরে হোটেল ম্যানেজারের সাহায্যে তারা স্টেশনে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করে রোড অটোস্ট্যান্ডে ফিরে যায় এবং ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের উদ্দেশ্যে একটি অটোরিকশা নিয়ে রওনা হয়। এরপর থেকেই তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

এ বিষয়ে রোড আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান ইমন বলেন, রাত ২টার দিকে তিনজন মেয়ে এসে বলে তারা হোটেলে কিছুক্ষণ থাকবে, এরপর ভোর রাতেই আবার বেরিয়ে যাবে। পরে আমি তাদের ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে তুলে দেই।

তবে যারা ওই হোটেলে রাত্রিযাপন করেন তাদের নাম ঠিকানা তাদের রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় না বলে অভিযোগ হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

নিখোঁজদের পরিবার বলছে, আমরা থানায় গিয়েছি, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। পুলিশ শুধু বলছে তদন্ত চলছে। ৪৮দিনেও মেয়েদের খোঁজ না মেলায় আমরা হতাশ। আমাদের মেয়েরা কী করছে, কীভাবে আছে আল্লাহই ভালো জানে। আমরা আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই।

নিখোঁজ তামান্নার মা আকলিমা বেগম বলেন, মাদরাসায় অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে। তবুও কর্তৃপক্ষ মাদরাসা ভবনে কোনো প্রকার নিরাপত্তা প্রহরী রাখেনি। তাদের ভবনের বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই, ফলে সহজেই কেউ চাইলে ভবনের ভেতরে বা ভবন থেকে বাইরে যেতে পারছে। আমরা তো আমাদের মেয়েদের তাদের ভরসায় সেখানে রেখেছিলাম।

নিখোঁজ আয়েশার বোন লাবনী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মারধর করে, নির্যাতন করে। আমার বোন নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে আমাদের এই নির্যাতনের কথা জানিয়েছিল এবং দ্রুতই সেখান থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল। তবে আমরা নিয়ে আসিনি, যার ফলে আজ আমার বোনকে হারাতে হলো। আমি নিশ্চিত, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে এই তিন মেয়ে পালিয়ে গেছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার দায় স্বীকার করে মাদরাসার প্রধান শিক্ষিকা হামিদা বেগম বলেন, আমরা বুঝতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে। আমরা মাদরাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছিলাম। তবে আমার বিরুদ্ধে যে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে সেটা ভিত্তিহীন। আমরা তাদের খুঁজছি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিন শিক্ষার্থী নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রশাসনের কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। পুলিশের পক্ষে থেকে কোনো গাফিলতি নেই।

জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ওই তিন ছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের খুঁজে বের করার। আশা করছি দ্রুতই তারা পরিবারের কাছে ফিরবে।