চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-র সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে একাধিক অবৈধ লেনদেন ও সিন্ডিকেট-রচনার অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম এবং তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জমির উদ্দীনকে কেন্দ্রীয়ভাবে দায়ী করা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আমরা প্রথমে প্রেক্ষাপট, এরপর অভিযোগভিত্তিক তথ্য, তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, শেষ অংশে সম্ভাব্য কারণ-প্রভাব ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছি।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পূর্ব ইতিহাস : সিডিএ গত ২১ অক্টোবর একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে যেখানে ৩১টি পদে ১১৫ জন নিয়োগ দেওয়া হবে। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার আগেই তৎপর সূত্রে জানা গেছে—কর্মকর্তাকর্মচারীদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট গঠন করা হয়েছে, নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আগেই, প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে গোপনে। এটি কোনো আইসোলেটেড ঘটনা নয়। ইতিমধ্যে ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিধি-বহির্ভূত হওয়ায় বাতিল করতে হয়। একইভাবে পরবর্তী দুইবার বিজ্ঞপ্তি হলেও কার্যকর নিয়োগ সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রদর্শন হওয়া মাত্র অপ্রত্যাশিত নয় যে নিয়োগপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নিয়োগের আগেই লেনদেন : অনেক চাকরিপ্রার্থী দাবি করেছেন—বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই “আপনি এই পদে নিয়োগ পেতে পারেন” এমন কথা বলা হয়েছে, এবং তার আগে থেকে টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সিডিএর ভবনে চেয়ারম্যান ও সচিব বা তাদের পিএস-এর নাম উল্লেখ করে প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী মোবাইলে চ্যাট বা কল রেকর্ড সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে—“চেয়ারম্যান স্যার অনুমোদন দিয়েছেন, শুধু আগাম টাকা ও নাম বলুন।” এই ঘটনাগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সিডিএ চেয়ারম্যানের পিএস জমির উদ্দীন এক গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে বলেন: “চাকরি দেয়ার নামে কেউ টাকা-পয়সা নিয়ে থাকলে সেটা আমি পজিটিভভাবে নিচ্ছি। চাকরির ক্ষেত্রে লেনদেন সব জায়গায় হয়।” এই স্বীকারোক্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় টাকা নেওয়ার কার্যক্রমকে-ই সাফ পুরস্কৃত করেছে বলে মনে করেন অনেকেই। পরে তিনি দাবি করেছেন—“আমি অন্য প্রসঙ্গে বলেছি, গণমাধ্যম বিকৃত করেছে।” কিন্তু সুযোগ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সেই বক্তব্য নিয়োগ লেনদেনের অন্যতম শক্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে।
সিন্ডিকেট ও নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ : সিডিএর বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন—কাউকে কোন পদে বসানো হবে, কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, সবকিছু চেয়ারম্যান ও তার পিএসের অনুমোদনে নির্ধারিত হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বের হওয়ার আগেই কাজ শেষ হয়ে যায়; বিজ্ঞপ্তি শুধু ফর্মালিটিতে প্রকাশ করা হয়। ফলে অনেক যোগ্য প্রার্থীর আবেদন সত্ত্বেও সুযোগ না পাওয়া, আবার বয়সসীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আবেদন করার সুযোগ দেওয়া না-দেয়া মতো অনিয়ম দেখা দিয়েছে। এসব বিষয় নিয়োগ-বাণিজ্যের গভীরতা নির্দেশ করে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে তার রয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ইত্যাদির চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা। সাধারণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তার স্বাক্ষর বা অনুমোদন থাকতে হয়। এক্ষেত্রে অভিযোগ হলো—চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে এক পক্ষ নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও তিনি জানিয়েছেন “যদি কারো বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ পাওয়া যায়, ব্যবস্থা নেয়া হবে,” তথাপি বিষয়টি কাঠামোগত তদন্ত ও স্বচ্ছতার মুখোমুখি হয়নি।
চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পিএস হিসেবে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে তার নাম সরাসরি জড়িত রয়েছে—তৎপর সূত্র বলছে তিনি নিয়োগ প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, লেনদেন পরিবেশন, তালিকা প্রণয়ন ইত্যাদিতে যুক্ত ছিলেন। তার স্বীকারোক্তি ও অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিয়োগবাণিজ্যের কারণে বহু যোগ্য প্রার্থী সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেকেই যেমন বয়সসীমা শেষ হয়ে গেছে, আবার সরকারি পে-অর্ডারের টাকা ফেরত পাননি। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—মানবসম্পদ ক্ষয়, প্রতিষ্ঠান আত্মবিশ্বাস হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি নিয়োগ-প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।
সিডিএ একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু নিয়োগ-বাণিজ্য, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কেসে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। যেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে সকলের জন্য ন্যায্য ও স্বচ্ছ—সেখানে গোপন লেনদেন ও পক্ষপাতীদুষ্ট নিয়োগ কার্যক্রম খুব বড় প্রতিকূলতা। এই ধরনের নিয়োগ-বাণিজ্য সামাজিক অন্যায় ও হিংসার আলামত হিসেবে দেখা যেতে পারে। সাধারণ মানুষ সরকারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর বিশ্বাস রাখে না, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর জনবল সংকট, দক্ষ জনশূন্যতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা ডেকে আনতে পারে।
চেয়ারম্যান ও তার পিএসের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিরাট প্রভাব ফেলতে পারেন। মনোনয়ন, অনুমোদন, তালিকা নির্ধারণ—এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেই নিয়োগ-বাণিজ্যে অবাধ সুযোগ তৈরি হয়।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ তারিখের মধ্যে সময়ানুগতা, আবেদনকারীর তথ্য গণনায় স্বচ্ছতা, লেনদেনের শুদ্ধ নথিপত্র—এসব ক্ষেত্রে তীব্র ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। প্রচারিত অভিযোগ অনুযায়ী, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই নিয়োগ ঘোষণা হয়ে যাওয়া—এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারার পরিপন্থী।
চেয়ারম্যান ও পিএসুএর নাম সরাসরি অভিযোগে জড়ানো, পিএসের স্বীকারোক্তি পাওয়া—সব মিলিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বশীলের নিরাপত্তাহীনতা শাসকত্বের চিত্র তুলে ধরে। অভিযোগপ্রাপ্তরা হয়তো হস্তক্ষেপের ভয় দেখায়, তথ্য গোপন রাখে—এতে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়। প্রত্যক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া, আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাই, লেনদেনের প্রতিফলন নিরীক্ষণ—এসব ক্ষেত্রে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় সিন্ডিকেট সহজায়নে আনুগত্য অর্জন করেছে।
উল্লেখ্য ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়োগপদ্ধতির নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় বাতিল করতে হয়। এরপর আরও দুটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পেলেও কার্যকর নিয়োগ সম্পাদিত হয়নি। এই পুনরাবৃত্তি নির্দেশ করে যে—নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শেষ হয় না; বাস্তব কার্যক্রমে ভ্রাম্যমাণ নিয়োগ-বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে। বর্তমান ৩১টি পদে ১১৫ জন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে নিয়েও একাধিক চাকরিপ্রার্থী যথাযথ নির্দেশনা না পেয়ে বিচলিত। তারা দাবি করছেন—“পুরনো বিজ্ঞপ্তি অনুসারে নিয়োগ দেওয়া হোক।”
চেয়ারম্যান ও পিএস-এর কর্মকাণ্ডের যথোপযুক্ত তদন্ত প্রয়োজন। একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, লেনদেনের রেকর্ড, নিয়োগ ফাইল ও বিজ্ঞপ্তি তথ্য পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং আবেদন ফরম থেকে নিয়োগ সিদ্ধান্ত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অনলাইনে প্রকাশ করা হোক। প্রার্থী-লেখাপড়ার তথ্য, মূল্যায়ন রেকর্ড, চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকা সবাইকে অ্যাক্সেসযোগ্য হোক। আবেদনকারীদের আবেদনপত্র জমা করা থেকে নিয়োগ সম্পাদিত হওয়ার সময় পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিজ্ঞপ্তি দিন নির্ধারণ করা হোক। চেয়ারম্যান ও পিএস সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ অথবা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা জরুরি। প্রার্থীরা অভিযোগ করার ক্ষেত্রে নিরাপদ বেসলাইন থাকা উচিত। গোপনে লেনদেন প্রমাণ থাকলে সেটি সংগ্রহ এবং নির্ভরযোগ্য চ্যানেলে দাওয়াই করা হোক। সিডিএর ভেতরে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হতে পারে যেটি নিয়োগ প্রার্থীদের সহায়তা ও অভিযোগ পর্যালোচনায় নিয়োজিত থাকবে। চাকরি-প্রার্থীদের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রচার করা জরুরি—যেমন সত্যিকারের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কোথায় পাওয়া যায়, লেনদেনের অফার কীভাবে চিনে নেওয়া যায়, কোণসেরা অভিযোগ দাওয়ার পদ্ধতি ইত্যাদি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-র নিয়োগ বিষয়ক এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানগত দুর্নীতি নয়-একটি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিশ্বাসের সংকট নির্দেশ করে। চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম ও পিএস জমির উদ্দীন-এর নামে অভিযোগ‐ভিত্তিক তথ্য ও স্বীকারোক্তি এই সংকটকে আরও দৃষ্টান্তমূলক ও সংকটমূলক করে তুলেছে। যদি নিয়োগ-বাণিজ্য অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধুই এক-দুই পদ নয়—ব্রডলি বললে পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রায় ভেঙে যাবে। পরবর্তী সময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নতুনভাবে পুনরায় নির্ধারণ ও স্বচ্ছ করতে হলে, উপরের সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতেই হবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
সিডিএ-র নিয়োগ লেনদেন গম্ভীর বিষয়: চেয়ারম্যান ও পিএস-এর মূল ভূমিকা
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:৪০:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
- ৬৬৫ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















