রবিবার ভোরবেলা। পূবের আকাশে আলো ফোটার আগেই বরিশালের কীর্তনখোলা তীরের পোর্টরোড মৎস্য আড়তে লেগেছে ভিড়। বরফের বাক্স খুলতেই হালকা বাষ্প উঠছে; ঝকঝকে রূপালি ইলিশ লালচে রং ধারণ করেছে। সেই মাছের গায়ে জমে থাকা ঠাণ্ডা জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ ফিরেছে বাজারে। কিন্তু এই ইলিশে কোথায় সেই নদীর গন্ধ, সেই টান! মাছগুলো নরম; অথচ দাম আগের মতোই গরম। নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে ১২ ঘণ্টা ঘুরতে না ঘুরতেই। কিন্তু শহরের এই বাজারে যে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, তা আসলে নিষেধাজ্ঞার সময় ধরা।
তখন বরফসহ বন্দি হয়েছিল মাছগুলো। এখন বাজারে তোলার পর সেই বরফ গলে ভাসছে সেগুলোর দেহ। অনেক দিন পর বিক্রেতার মুখে হাসি, তবে ক্রেতার মুখে বিরক্তি। কারণ ইলিশের তরতাজা দেহ নেতিয়ে গেছে।
সেই তুলনায় দাম তেমন একটা কমেনি।
বরিশাল নগরীর পোর্টরোড মৎস্য আড়তে বড় আকারের (এক কেজির বড়) ইলিশ এক লাখ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। এলসি সাইজের ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশ বেচাকেনা হয়েছে ৮৬ হাজার টাকা মণে। আর ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ছোট আকারের মাঝারি আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা মণ দরে। সবচেয়ে ছোট ৫০০ গ্রামের নীচের ইলিশ ৩৬ হাজার টাকা টাকায়।
মৎস্য আড়তদার জহির শিকদার বলেন, রবিবার পোর্টরোডে প্রায় ৫০০ মণ ইলিশ উঠেছে। এর মধ্যে ১০০ মণ এলসি আকারের। মাছগুলোর প্রত্যেকটির পেটে ডিম। এক তৃতীয়াংশ ইলিশ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কারণ এই মাছগুলো ধরার পর তা দীর্ঘ সময় বাইরে ছিল। সাধারণত ইলিশ শিকারের ১২ ঘণ্টার মধ্যে বরফ না দিলে তা লালচে রং ধারণ করে। তাই স্বাদ কিংবা ইলিশের সেই ঘ্রাণ না থাকাটাই স্বাভাবিক।
জহির শিকদার আরো বলেন, বরফকল শনিবার বিকেলের দিকে উৎপাদনে গেছে। তার আগে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা এই মাছগুলো ধরেছিল। নির্দিষ্ট সময়ের পর বরফ দেওয়ায় মাছগুলো একটু নরম হয়েছে। তাই দাম মণপ্রতি গড়ে আট হাজার টাকা করে কমেছে। কিন্তু ছোট মাছের ব্যাপক চাহিদার কারণে দাম তেমন একটা কমেনি। অনেকদিন পর বাজারে ইলিশ এসেছে, তাই তরতাজা ইলিশ দেখার সময় কই, যে যেভাবে পারছে, দরকষাকষি করে ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফিরছে।
বাজার পরিস্থিতি
খুচরা বাজারে বড় ইলিশে লাফিয়ে দাম হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ টাকা পর্যন্ত। এক কেজি ওজনের ইলিশ ২২৫০ থেকে ২৩৫০ টাকা। আর মাঝারি আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৫০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকার আশপাশে।
পোর্টরোডে আমিনুল ইসলাম নামের এক খুচরা বিক্রেতা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বললেন, মাছ নরম ঠিকই, কিন্তু ২২দিন পর মানুষ খুঁজছে ইলিশ। দাম তাই কমার প্রশ্নই আসে না। ঝকঝকে ইলিশের আমদানি হলে বড় আকারের ইলিশের কেজি তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে। পাশেই দাঁড়ানো সাইদুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা রসিকতা করে বললেন, মাছের গায়ে বরফ, অথচ দামে আগুন! কেনার কোনো উপায় দেখছি না।
বাংলা বাজারের ক্রেতা আবু হানিফ বললেন, মাছটা পুরনো বুঝি, কিন্তু কী করব, দামও কমছে না। মাঝারি ইলিশ কেজিপ্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় মাছ দুই হাজার ৪০০ টাকায়ও ছাড় নেই। একই বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ হাওলাদার নামের এক ক্রেতা বললেন, মাছ কিনব না ভাবছি। ইলিশের গায়ে বরফের পানি গড়িয়ে পড়ছে, অথচ দাম শুনলে শরীর গরম হয়ে যায়!
ইলিশের নিষেধাজ্ঞায় বেড়েছে পাঙ্গাশ
ইলিশের পাশাপাশি মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলা নদীতে শনিবার রাতে প্রচুর পাঙ্গাশ মাছ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। সেই পাঙ্গাশ রবিবার পোর্টরোডে বিক্রি হয়েছে। মৎস্য কর্মকর্তা ও মৎস্য গবেষকরা বলছেন ইলিশ মাছ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুফল হিসেবে অন্যান্য বছরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি ও বড় আকারের পাঙ্গাশ মাছ এ বছর ধরা পড়ছে।
বরিশালের হিজলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, অভিযানে ৫০০’র বেশি জেলেকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর জেলেদের অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। মেঘনা এলাকাসংলগ্ন অঞ্চলে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রথম দিনেই অনেক বেশি পাঙ্গাশ ধরা পড়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও কৌলিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, পাঙ্গাশ মাছের বংশবিস্তার পদ্ধতি এবং ডিম পাড়ার সময় অনেকটা ইলিশ মাছের সঙ্গে মিলে যায়। এ কারণে ইলিশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ পাঙ্গাশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিরতিতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার কার্যক্রম টানা কয়েক বছর ধরে বাস্তবায়িত হতে থাকায় ইলিশ মাছের পাশাপাশি পাঙ্গাশের বসবাসের জন্য অনুকূল পরিবেশ নদীতে তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক রাজীব আরো বলেন, ইলিশের মতো গভীর সমুদ্রে না গেলেও পাঙ্গাশ নদীর মোহনা অঞ্চলে থাকে। বছরের এই সময়টায়, যখন ইলিশ ডিম পাড়ার জন্য নদীতে আসে, তখন পাঙ্গাশও নদীতে আসে। আর প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর এই সময়টায় বেশি পরিমাণ বড় আকৃতির পাঙ্গাশ জেলেদের জালে ধরা পড়ে।
বরিশাল প্রতিনিধি 



















