রাজধানীর মিরপুরে সরকারি জমি এখন এক ধরনের “প্রাইভেট কোম্পানির দখলে।” জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) অধিগ্রহণকৃত ১৬৮ একরের মধ্যে প্রায় ১২ একর জমি দখলে নিয়েছে সাগুফতা এন এম হাউজিং লিমিটেড, যা শুধু দখল নয়, সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি পর্যন্ত করছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় কোম্পানিটি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে কাজ করছে। গত বছরের অক্টোবরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ রাজউককে চিঠি পাঠিয়ে সাগুফতার দখলের বিষয়টি তুলে ধরলেও, দীর্ঘ সময় পার হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নিলে কোম্পানির সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালাচ্ছে।
উচ্ছেদ অভিযান ও সন্ত্রাসী হামলা:
২৬ আগস্ট গৃহায়নের মিরপুর অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হোরায়রা চিঠি পাঠিয়ে সাগুফতা এন এম হাউজিংয়ের নিবন্ধন বাতিলের অনুরোধ করেন। ৬ ও ১৬ সেপ্টেম্বর গৃহায়নের কর্মকর্তা, আনসার সদস্য ও শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। হেলমেট পরা ৪০-৫০ জন সন্ত্রাসী গুলি চালায়, ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়েন।
সরকারি জমি দখলের কৌশল :
সাগুফতা হাউজিং দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারি জমি নিজেদের নামে লিখে নিয়ে ফ্ল্যাট ব্যবসা চালাচ্ছে। স্থানীয় ও সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, কোম্পানি মিরপুর বাউনিয়া মৌজার কিছু জমি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রিও করেছে।
অর্থনৈতিক মূল্য :
মিরপুরে প্রতি একর জমির সরকারি মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। সাগুফতা হাউজিংয়ের দখলে থাকা ১২ একর জমির সরকারি মূল্য প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা। বাস্তব বাজারমূল্য সরকারি মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে কোম্পানিটি সরকারি জমি থেকে হাজার কোটি টাকার বেশি লাভ করছে।
প্রশাসনের নীরবতা :
রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠি আসেনি, তাই কিছু বলতে পারছি না।” ফলে, প্রশাসনিক ফাঁকফোকর এবং অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় সাগুফতা হাউজিং দীর্ঘদিন অবৈধভাবে দখল ও নির্মাণ চালাচ্ছে।
সন্ত্রাসী হামলা ও ভয় :
দখলদার কোম্পানির নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান বা ভূমি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের সময় তারা হেলমেট পরা সন্ত্রাসী দিয়ে গুলি চালায়। এতে সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, “সরকারের জমি গায়েব হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন নীরব।”
স্থানীয় হাউজিং প্রতিষ্ঠান, বাসিন্দা ও জমি মালিকরা অভিযোগ করেছেন যে সাগুফতার কর্মকাণ্ডে তারা ভয়ঙ্করভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। জমির আসল মালিকরা লিখিতভাবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছেন, অথচ কোম্পানি তাদের সম্পত্তি দখল করে রেখেছে।
সাগুফতা হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুয়েল মোল্লা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সরকারি জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ আছে, তবে ক্ষমতা থাকলেই দখল করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, “গৃহায়নও জমি দখল করেছে, এই বিষয়ে লিখতে পারবেন।”
মিরপুরের সরকারি জমি দখল, সাগুফতা হাউজিংয়ের সন্ত্রাসী হামলা এবং প্রশাসনের নীরবতা এক ভয়ঙ্কর চিত্র প্রকাশ করছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও আইনানুগ ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ না নিলে, সাধারণ মানুষ এবং সরকারের স্বার্থ দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিরপুর (নিজস্ব প্রতিবেদক) 



















