ঢাকা ১০:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঘুরে আসুন দেশের একমাত্র “মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর”

মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগরা ইউনিয়নে অবস্থিত মুক্তি সংগ্রাম যাদুঘর। জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিতব্য যাদুঘরটি জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের জায়গা হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা করা যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামালপুর একটি অন্যতম অধ্যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে সারাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। জামালপুরকে ১১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ জেলায় ৫০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন । এতে ৮১ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদৎ বরণ করেন, শহীদ হন প্রায় ১৪০ জন এবং প্রায় ৫০০ জন নিরীহ লোককে গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে। তাছাড়া ৩০০ জন মহিলাকে নির্যাতন করা হয়। বেশীরভাগ যুদ্ধ সংগঠিত হয় ধানুয়া কামালপুর, নারায়নখোলা এবং সরিষাবাড়ীতে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের লাশই পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এবং জামালপুর জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধায়নে দ্বিতল জাদুঘর ভবন ও অডিটরিয়াম করা হয়েছে। এ মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে ব্রিটিশ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রামের নানা ছবি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এছাড়াও জাদুঘরের পক্ষ থেকে মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন স্মারক, তথ্য, উপাত্ত, আলোকচিত্র, দলিলপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের বধ্যভূমির মাটি সংগ্রহ ও সংরক্ষেণের কাজও চলছে।

জামালপুর হচ্ছে দেশের ২০তম জেলা। ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর গঠিত হলেও এই জেলাটি জনবসতি ও জনপদের দিক থেকে অনেক পুরনো। এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, সমাজ ও উৎপাদন ব্যবস্থা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবকিছুতেই রয়েছে প্রাচীনত্বের ছাপ। ১৭৬৩ – ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ বছর এই জনপদ ছিল

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের পর উনিশ শতকে এ অঞ্চলে টিপু পাগলের নেতৃত্বে পাগলপন্থী বিদ্রোহ, দুবরাজ পাথর, জানকু পাথরের নেতৃত্বে আদিবাসী গারো-হাজংদের বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ সহ ছোট বড় নানা ধরনের বিদ্রোহ হয়েছিল।

উপর তলায় রয়েছে অডিটোরিয়াম। অডিটোরিয়ামে মুক্তিযুদ্ধের উপর নানা ধরনের প্রামাণ্য অনুষ্ঠান দেখানো হয়। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিবসে নানা ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠান, নাটক, প্রতিযোগীতাও আয়োজিত হয় অডিটোরিয়ামে। নিচতলাকে জাদুঘরের প্রধান অংশ বলা যায়। এতে প্রবেশ করার পরপরই চোখে পড়বে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভূমির জন্য ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন যারা তাদের তালিকা। এরপরই চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর মানচিত্র ও খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা।

একটু ভিতরে যেতেই দুটি পাথরের টুকরা চোখে পড়বে। পাথর দুটি জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থান গরজরিপার টিপু পাগলের দুর্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ পাথরের টুকরোগুলো মনে করিয়ে দেবে পাগলপন্থী বিদ্রোহের কথা। ইংরেজ শাসন ও জমিদার গোষ্ঠীর শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ অঞ্চলে গারো বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ১৮০২ সালে। সে সময় গারো রাজ্য স্থাপনে গারো সর্দার ছপাতির প্রয়াস ব্যর্থ হলে টিপু পাগলের নেতৃত্বে গারো ও অন্যান্য প্রজারা খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয়। ‘সকল মানুষই ঈশ্বরসৃষ্ট, কেহ উচ্চ, কেহ নীচ এই রূপ প্রভেদ করা সঙ্গত নহে’ – এই পাগলপন্থী ধর্মমতে গারোদের দীক্ষিত ও সংগঠিত করেন টিপু পাগল।

বিদ্রোহের মূল ঘাটি ছিল জামালপুরের পার্শ্ববর্তী জেলা শেরপুরের গরজরিপা। ১৮২৫ সালে টিপু পাগলের কাছে জমিদারগণ পরাজিত হয়ে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে কালীগঞ্জে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ডেম্পিয়ারের কাছারি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো। টিপুর নেতৃত্বে শেরপুরে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তবে বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজদের বড় এক সেনা দল রংপুর থেকে জামালপুরে ঘাটি স্থাপন করে। তাদের কাছে টিপু পাগল বন্দী হয়ে কারাবাস করতে থাকেন। কারাগারেই তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে জানকু পাথর ও দেবরাজ পাথরের নেতৃত্বে শেরপুর অঞ্চলে বেশ কিছু গারো বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়েছিল। সত্যিই অবাক হতে হয়, মাত্র দু’টুকরো পাথরের মাঝে এত ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে তা কেবল জাদুঘরে গেলেই বোঝা যায়।

শুধু দু’টুকরো পাথর নয়। এগুলোর পাশেই আছে বিপ্লবী রবি নিয়োগীর চশমা। এই চশমাও জানান দেয় ব্রিটিশ শাসন-শোষণের কিছু অজানা ইতিহাস। ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের জন্য বিপজ্জনক রাজবন্দিদের আন্দামান সেলুলর জেলে পাঠানো হয়েছিল ১৯০৮ সালে। সশস্ত্র বিপ্লববাদের ধারায় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের চার বিপ্লবী রবি নিয়োগী, বিধূভূষণ সেন, নগেন মোদক ও সুধেন্দু দাম। এরা আন্দামান সেলুলর জেলে কারাবন্দি ছিলেন। পরবর্তীতে দেশব্যাপী প্রবল আন্দোলন শুরু হলে ১৯৩৭ সালে সেলুলর জেল থেকে কারাবন্দিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। বিপ্লবী রবি নিয়োগী আন্দামান সহ বিভিন্ন জেলে ৩৪ বছর কারাবন্দি ছিলেন।

জাদুঘরটি দেখতে গেলে ময়মনসিংহের ‘হাতিখেদা’ বিদ্রোহ নামে আরেকটি আন্দোলনের ইতিহাস জানার সুযোগ হবে। সুসঙ্গ পরগণার রাজা কিশোর ১৭৭০ সালে হাজং কৃষকদের জোর করে খেদার সাহায্যে বন্য হাতি ধরার কাজ করাতো। হাতিগুলোকে পোষ মানিয়ে মুর্শিদাবাদ-দিল্লি প্রভৃতি স্থানে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনই ছিল রাজার নেশা। এই বিপজ্জনক কাজে বহু হাজং হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যেত। পরবর্তীতে হাজংরা মনা সর্দাদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা অনেক ‘হাতিখেদা’ ধ্বংস করে দেয়। পাঁচ বছর ধরে চলা বিদ্রোহের কারণে বাধ্যতামূলক খেদার সাহায্যে হাতি ধরার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

জাদুঘরটিতে দেখা যাবে একটি ছোট কালো রংয়ের নৌকা। হক-ভাসানী ও শেখ মুজিবের প্রতীক নৌকাটি জনতার মিছিল হয়ে জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। একটু ভেতরে মাঝের গ্যালারিতে দেখা যাবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের নানা কথা। টেবিলের উপর রাখা আছে জামালপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে পাওয়া বধ্যভূমির মাটি। এগুলোর মধ্যে পি.টি.আই ক্যাম্প বদ্ধভূমি ও আশেক মাহমুদ কলেজ বদ্ধভূমি জামালপুর সদর উপজেলাতেই অবস্থিত। চাইলে সহজেই এ দুটি বদ্ধভূমি দেখা যাবে। এছাড়াও যেতে পারেন পিংনা বদ্ধভূমিতে। পিংনা বদ্ধভূমি জাদুঘর এলাকা থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটির নাম আলাদাভাবে বলার কারণ হচ্ছে এই পিংনায় পূর্বে বন্দর ছিল। যেখানে বড় বড় জাহাজ ভিড়তো। এছাড়াও পিংনা পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব পালনকালে মহাকবি কায়কোবাদ তার মহাশ্মশান কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সেই পোস্ট অফিসটিও দেখার সুযোগ মিলবে।

মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি তথা ‘একাত্তরের বিজয় গাঁথা’ গ্যালারির একটু ভেতরে দেখা মিলবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, রৌমারী-রাজিবপুর থেকে সংগৃহিত মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত মর্টারশেল, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহাব আলীর ব্যবহৃত বল্লম। এই বল্লম জানান দেয় পাকবাহিনীর ভারি অস্ত্র-গোলাবারুদের মুখে দেশীয় অস্ত্রের শক্তি। ঝিনাই নদীর পাড়ে, হাজীপুর বাজার সংলগ্ন মেস্তাপুর গ্রামে পাকবাহিনীকে গ্রামবাসীরা লাঠি, বল্লম, নৌকার বৈঠা ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল। সে সময় হতদরিদ্র ওয়াহাব আলী ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছিলেন। ঝিনাই নদীর পাড়ে অবস্থিত হাজীপুর বাজার, যা জাদুঘর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত।

জাদুঘরের শেষ গ্যালারির দেয়ালে দেখা মিলবে বাঁধাই করা হাতের কারুকাজ। দেখতে অতি কাঁচা হাতের কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে যাবে গ্রাম-বাংলার অতীতে। ভালভাবে দেখলে দেখা যাবে কারুকার্য শিল্পী তার কাজের তারিখ লিখে রেখেছিলেন। জানা যায় কারুকাজটি ১৯৩৬ সালের

মুক্তি সংগ্রামে বাঙালির বহুমাত্রিক ও বর্ণাঢ্য ইতিহাস সংরক্ষণের মহৎ উদ্দেশ্যে ২০০৭ সালে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করার মাধ্যমে অত্র এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যও প্রকাশ করতে পারে এমনই একটি জাদুঘর হচ্ছে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কাপাসহাটিয়া গ্রামের ‘মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর’। যেখানে ভ্রমণ করতে গেলে জামালপুর জেলাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা-উপজেলার নানা অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জানার অনেক সুযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়াও জামালপুরের মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরটিতে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, ফকির বিদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি সম্পর্কেও অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়।

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক কালপর্ব ভিত্তিক ইতিহাস গ্যালারিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ আশ্রম ও জাদুঘর দেখতে চলে আসছে শিক্ষার্থীসহ দর্শনার্থী। নিভৃত পল্লীতে গড়ে উঠা এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিটি পরতে পরতে মিশে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তি সংগ্রামের নানা গল্প। যা থেকে নতুন প্রজন্মের অনেকে এখানে এসে প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছে।

কিভাবে যাবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে জামালপুর সদর উপজেলায় আসতে হবে। এছাড়াও ঢাকা থেকে ট্রেনেও জামালপুর আসা যায়। জামালপুর সদর উপজেলার গেট পার থেকে অটোরিকশা দিয়ে যেতে হবে হাজীপুর বাজার অথবা সরাসরি জাদুঘরেও যেতে পারবেন। জামালপুর সদর উপজেলা থেকে কাপাসহাটিয়া যেতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। রাস্তা সরু হওয়ায় মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় বাস নিয়ে যাওয়া যাবে না।

কোথায় থাকবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে এলাকায় থাকার কোনো সুব্যবস্থা না থাকলেও জামালপুর শহরে অনেক সুন্দর সুন্দর আবাসিক হোটেল রয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে স্বল্প খরচে রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে।

কোথায় খাবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে এলাকায় ছোট ছোট রেস্তোরা পাবেন, সেখানে খুব কমমূল্যে খাবার খেতে পারবেন। এছাড়াও জামালপুর শহরে হোটেল, সম্রাট, তাজ হোটেল নামক কয়েকটি রেস্তোরা সহ অনেক ফাস্টফুডের দোকান আছে, যেখানে আপনি জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাবেন।

দেখতে ভুলবেনা যেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর এর পাশেই অবস্থিত “গান্ধী আশ্রম”। যেখানে বড় টেবিলটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা ধরনের বৈঠকে ব্যবহৃত হয়েছিল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুরে আসুন দেশের একমাত্র “মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর”

আপডেট সময় ১০:৪৫:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জুন ২০২৩

মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগরা ইউনিয়নে অবস্থিত মুক্তি সংগ্রাম যাদুঘর। জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিতব্য যাদুঘরটি জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের জায়গা হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা করা যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামালপুর একটি অন্যতম অধ্যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে সারাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। জামালপুরকে ১১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ জেলায় ৫০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন । এতে ৮১ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদৎ বরণ করেন, শহীদ হন প্রায় ১৪০ জন এবং প্রায় ৫০০ জন নিরীহ লোককে গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে। তাছাড়া ৩০০ জন মহিলাকে নির্যাতন করা হয়। বেশীরভাগ যুদ্ধ সংগঠিত হয় ধানুয়া কামালপুর, নারায়নখোলা এবং সরিষাবাড়ীতে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের লাশই পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এবং জামালপুর জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধায়নে দ্বিতল জাদুঘর ভবন ও অডিটরিয়াম করা হয়েছে। এ মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে ব্রিটিশ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রামের নানা ছবি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এছাড়াও জাদুঘরের পক্ষ থেকে মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন স্মারক, তথ্য, উপাত্ত, আলোকচিত্র, দলিলপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের বধ্যভূমির মাটি সংগ্রহ ও সংরক্ষেণের কাজও চলছে।

জামালপুর হচ্ছে দেশের ২০তম জেলা। ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর গঠিত হলেও এই জেলাটি জনবসতি ও জনপদের দিক থেকে অনেক পুরনো। এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, সমাজ ও উৎপাদন ব্যবস্থা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবকিছুতেই রয়েছে প্রাচীনত্বের ছাপ। ১৭৬৩ – ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ বছর এই জনপদ ছিল

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের পর উনিশ শতকে এ অঞ্চলে টিপু পাগলের নেতৃত্বে পাগলপন্থী বিদ্রোহ, দুবরাজ পাথর, জানকু পাথরের নেতৃত্বে আদিবাসী গারো-হাজংদের বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ সহ ছোট বড় নানা ধরনের বিদ্রোহ হয়েছিল।

উপর তলায় রয়েছে অডিটোরিয়াম। অডিটোরিয়ামে মুক্তিযুদ্ধের উপর নানা ধরনের প্রামাণ্য অনুষ্ঠান দেখানো হয়। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিবসে নানা ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠান, নাটক, প্রতিযোগীতাও আয়োজিত হয় অডিটোরিয়ামে। নিচতলাকে জাদুঘরের প্রধান অংশ বলা যায়। এতে প্রবেশ করার পরপরই চোখে পড়বে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভূমির জন্য ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন যারা তাদের তালিকা। এরপরই চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর মানচিত্র ও খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা।

একটু ভিতরে যেতেই দুটি পাথরের টুকরা চোখে পড়বে। পাথর দুটি জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থান গরজরিপার টিপু পাগলের দুর্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ পাথরের টুকরোগুলো মনে করিয়ে দেবে পাগলপন্থী বিদ্রোহের কথা। ইংরেজ শাসন ও জমিদার গোষ্ঠীর শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ অঞ্চলে গারো বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ১৮০২ সালে। সে সময় গারো রাজ্য স্থাপনে গারো সর্দার ছপাতির প্রয়াস ব্যর্থ হলে টিপু পাগলের নেতৃত্বে গারো ও অন্যান্য প্রজারা খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয়। ‘সকল মানুষই ঈশ্বরসৃষ্ট, কেহ উচ্চ, কেহ নীচ এই রূপ প্রভেদ করা সঙ্গত নহে’ – এই পাগলপন্থী ধর্মমতে গারোদের দীক্ষিত ও সংগঠিত করেন টিপু পাগল।

বিদ্রোহের মূল ঘাটি ছিল জামালপুরের পার্শ্ববর্তী জেলা শেরপুরের গরজরিপা। ১৮২৫ সালে টিপু পাগলের কাছে জমিদারগণ পরাজিত হয়ে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে কালীগঞ্জে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ডেম্পিয়ারের কাছারি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো। টিপুর নেতৃত্বে শেরপুরে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তবে বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজদের বড় এক সেনা দল রংপুর থেকে জামালপুরে ঘাটি স্থাপন করে। তাদের কাছে টিপু পাগল বন্দী হয়ে কারাবাস করতে থাকেন। কারাগারেই তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে জানকু পাথর ও দেবরাজ পাথরের নেতৃত্বে শেরপুর অঞ্চলে বেশ কিছু গারো বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়েছিল। সত্যিই অবাক হতে হয়, মাত্র দু’টুকরো পাথরের মাঝে এত ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে তা কেবল জাদুঘরে গেলেই বোঝা যায়।

শুধু দু’টুকরো পাথর নয়। এগুলোর পাশেই আছে বিপ্লবী রবি নিয়োগীর চশমা। এই চশমাও জানান দেয় ব্রিটিশ শাসন-শোষণের কিছু অজানা ইতিহাস। ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের জন্য বিপজ্জনক রাজবন্দিদের আন্দামান সেলুলর জেলে পাঠানো হয়েছিল ১৯০৮ সালে। সশস্ত্র বিপ্লববাদের ধারায় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের চার বিপ্লবী রবি নিয়োগী, বিধূভূষণ সেন, নগেন মোদক ও সুধেন্দু দাম। এরা আন্দামান সেলুলর জেলে কারাবন্দি ছিলেন। পরবর্তীতে দেশব্যাপী প্রবল আন্দোলন শুরু হলে ১৯৩৭ সালে সেলুলর জেল থেকে কারাবন্দিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। বিপ্লবী রবি নিয়োগী আন্দামান সহ বিভিন্ন জেলে ৩৪ বছর কারাবন্দি ছিলেন।

জাদুঘরটি দেখতে গেলে ময়মনসিংহের ‘হাতিখেদা’ বিদ্রোহ নামে আরেকটি আন্দোলনের ইতিহাস জানার সুযোগ হবে। সুসঙ্গ পরগণার রাজা কিশোর ১৭৭০ সালে হাজং কৃষকদের জোর করে খেদার সাহায্যে বন্য হাতি ধরার কাজ করাতো। হাতিগুলোকে পোষ মানিয়ে মুর্শিদাবাদ-দিল্লি প্রভৃতি স্থানে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনই ছিল রাজার নেশা। এই বিপজ্জনক কাজে বহু হাজং হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যেত। পরবর্তীতে হাজংরা মনা সর্দাদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা অনেক ‘হাতিখেদা’ ধ্বংস করে দেয়। পাঁচ বছর ধরে চলা বিদ্রোহের কারণে বাধ্যতামূলক খেদার সাহায্যে হাতি ধরার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

জাদুঘরটিতে দেখা যাবে একটি ছোট কালো রংয়ের নৌকা। হক-ভাসানী ও শেখ মুজিবের প্রতীক নৌকাটি জনতার মিছিল হয়ে জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। একটু ভেতরে মাঝের গ্যালারিতে দেখা যাবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের নানা কথা। টেবিলের উপর রাখা আছে জামালপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে পাওয়া বধ্যভূমির মাটি। এগুলোর মধ্যে পি.টি.আই ক্যাম্প বদ্ধভূমি ও আশেক মাহমুদ কলেজ বদ্ধভূমি জামালপুর সদর উপজেলাতেই অবস্থিত। চাইলে সহজেই এ দুটি বদ্ধভূমি দেখা যাবে। এছাড়াও যেতে পারেন পিংনা বদ্ধভূমিতে। পিংনা বদ্ধভূমি জাদুঘর এলাকা থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটির নাম আলাদাভাবে বলার কারণ হচ্ছে এই পিংনায় পূর্বে বন্দর ছিল। যেখানে বড় বড় জাহাজ ভিড়তো। এছাড়াও পিংনা পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব পালনকালে মহাকবি কায়কোবাদ তার মহাশ্মশান কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সেই পোস্ট অফিসটিও দেখার সুযোগ মিলবে।

মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি তথা ‘একাত্তরের বিজয় গাঁথা’ গ্যালারির একটু ভেতরে দেখা মিলবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, রৌমারী-রাজিবপুর থেকে সংগৃহিত মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত মর্টারশেল, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহাব আলীর ব্যবহৃত বল্লম। এই বল্লম জানান দেয় পাকবাহিনীর ভারি অস্ত্র-গোলাবারুদের মুখে দেশীয় অস্ত্রের শক্তি। ঝিনাই নদীর পাড়ে, হাজীপুর বাজার সংলগ্ন মেস্তাপুর গ্রামে পাকবাহিনীকে গ্রামবাসীরা লাঠি, বল্লম, নৌকার বৈঠা ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল। সে সময় হতদরিদ্র ওয়াহাব আলী ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছিলেন। ঝিনাই নদীর পাড়ে অবস্থিত হাজীপুর বাজার, যা জাদুঘর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত।

জাদুঘরের শেষ গ্যালারির দেয়ালে দেখা মিলবে বাঁধাই করা হাতের কারুকাজ। দেখতে অতি কাঁচা হাতের কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে যাবে গ্রাম-বাংলার অতীতে। ভালভাবে দেখলে দেখা যাবে কারুকার্য শিল্পী তার কাজের তারিখ লিখে রেখেছিলেন। জানা যায় কারুকাজটি ১৯৩৬ সালের

মুক্তি সংগ্রামে বাঙালির বহুমাত্রিক ও বর্ণাঢ্য ইতিহাস সংরক্ষণের মহৎ উদ্দেশ্যে ২০০৭ সালে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করার মাধ্যমে অত্র এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যও প্রকাশ করতে পারে এমনই একটি জাদুঘর হচ্ছে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কাপাসহাটিয়া গ্রামের ‘মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর’। যেখানে ভ্রমণ করতে গেলে জামালপুর জেলাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা-উপজেলার নানা অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জানার অনেক সুযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়াও জামালপুরের মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরটিতে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, ফকির বিদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি সম্পর্কেও অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়।

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক কালপর্ব ভিত্তিক ইতিহাস গ্যালারিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ আশ্রম ও জাদুঘর দেখতে চলে আসছে শিক্ষার্থীসহ দর্শনার্থী। নিভৃত পল্লীতে গড়ে উঠা এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিটি পরতে পরতে মিশে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তি সংগ্রামের নানা গল্প। যা থেকে নতুন প্রজন্মের অনেকে এখানে এসে প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছে।

কিভাবে যাবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে জামালপুর সদর উপজেলায় আসতে হবে। এছাড়াও ঢাকা থেকে ট্রেনেও জামালপুর আসা যায়। জামালপুর সদর উপজেলার গেট পার থেকে অটোরিকশা দিয়ে যেতে হবে হাজীপুর বাজার অথবা সরাসরি জাদুঘরেও যেতে পারবেন। জামালপুর সদর উপজেলা থেকে কাপাসহাটিয়া যেতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। রাস্তা সরু হওয়ায় মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় বাস নিয়ে যাওয়া যাবে না।

কোথায় থাকবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে এলাকায় থাকার কোনো সুব্যবস্থা না থাকলেও জামালপুর শহরে অনেক সুন্দর সুন্দর আবাসিক হোটেল রয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে স্বল্প খরচে রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে।

কোথায় খাবেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে এলাকায় ছোট ছোট রেস্তোরা পাবেন, সেখানে খুব কমমূল্যে খাবার খেতে পারবেন। এছাড়াও জামালপুর শহরে হোটেল, সম্রাট, তাজ হোটেল নামক কয়েকটি রেস্তোরা সহ অনেক ফাস্টফুডের দোকান আছে, যেখানে আপনি জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাবেন।

দেখতে ভুলবেনা যেন:

মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর এর পাশেই অবস্থিত “গান্ধী আশ্রম”। যেখানে বড় টেবিলটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা ধরনের বৈঠকে ব্যবহৃত হয়েছিল।