ঢাকা ১০:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দুর্নীতির দায়ে পদাবনতি, এবার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম জুয়েল দুই হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু, ওয়াসার গাড়িচালক তাজুলের পাঁচতলা ভবনে ১৭ ফ্ল্যাট ডেঙ্গু ঠেকাতে নাগরিকদের বাসাবাড়ি পরিষ্কারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৯০ কোটি টাকার খালি চেক দেওয়ার অভিযোগে দুদকের নজরে খুলনা ওয়াসার রেজাউল ইসলাম বিমান মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী চিকিৎসকদের আত্মত্যাগ দেশের জন্য গর্বের বিষয় : স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামলার আশঙ্কায় পিছিয়ে গেল রোনালদোদের ম্যাচ শেখ হাসিনার দুপুরের খাবারের খরচ ছিল সাড়ে ১০ লাখ, তারেক রহমান খান ১৫০ টাকায় নতুন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল পাকিস্তান ছাত্রলীগের পদের জন্য প্রতিদিন সাদ্দাম-ইনানের পা চাটত সারজিস: রাশেদ খান

দুর্নীতির দায়ে পদাবনতি, এবার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম জুয়েল

ভবন নির্মাণে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় শাস্তি হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয়েছিল তাঁর। একই ঘটনায় চার বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত না হওয়া ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগেও তাঁকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তদবির বাণিজ্য ও বিভিন্ন দপ্তরে হস্তক্ষেপের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে চিঠিও দিয়েছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল। বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুলনা ওয়াসায় বদলি হয়ে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে যোগ দেন তিনি। এবার দুই দফায় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের পর ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের (ফেজ-২) পরিচালকের দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি।

ভবন নির্মাণে অনিয়ম, হয়েছিল পদাবনতি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর হাঁটাচলার সময় ভবনটিতে কম্পন অনুভূত হতে থাকে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটি ভবনের ছাদের চারটি স্থানে স্ল্যাব কেটে পরীক্ষা করে বড় ধরনের অনিয়ম দেখতে পায়।

তদন্তে দেখা যায়, নকশা অনুযায়ী ছাদে কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা ছিল মাত্র ৩ ইঞ্চি, আবার কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি। এতে ভবনের স্থায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়, ছাদ ঢালাইয়ের সময় আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে ফিরে অনুপস্থিতিকালীন নির্মাণকাজের এমবি (মেজারমেন্ট বুক) যাচাই না করেই তাতে স্বাক্ষর করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে সহযোগিতা করেন তিনি।

নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অনিয়মে বাধা না দেওয়া এবং ঠিকাদারের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ওই ঘটনায় সাতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয় এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়।

শাস্তি বাতিল, পদোন্নতি ও প্রেষণ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও অ্যাবের সদস্য বলে জানা গেছে।

একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আগের শাস্তি বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে খুলনা ওয়াসায় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রেষণে পাঠানো হয় তাঁকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা হিসেবে এটিই প্রথম।

মহানগর বিএনপির চিঠিতেও অভিযোগ

একাধিক সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপ শুরু করেন জুয়েল। এ নিয়ে নানা অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৫ সালের ২৬ জুন অ্যাবের সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

চিঠিতে বলা হয়, ‘গত ৭/৮ মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ আসছে, দলের পদ ব্যবহার করে আরিফুল ইসলাম জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি, নিয়োগ-পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেবেন বলে তদবির করছেন। এতে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

চিঠিতে তাঁর অ্যাবের সাধারণ সম্পাদক পদ বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরিফুল ইসলাম জুয়েল। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও শাস্তি দেওয়া হয়। অভ্যুত্থানের পর সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও আমাকে পদোন্নতি দিয়ে ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।’

কর্মস্থলে অনিয়মের অভিযোগ

আরিফুল ইসলাম জুয়েলের আগের কর্মস্থল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়া ও সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সময়ে তিনি একাধিকবার শোকজ পেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে ৫৪ দিনই তিনি দেরিতে অফিসে উপস্থিত হন। এর মধ্যে ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন। গড়ে প্রতিদিন ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন বলে ওই রেকর্ডে দেখা যায়। এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ তাঁকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পরও তিনি নিয়মিত কার্যালয়ে যান না এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

দুই দফায় বদল, এবার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে জুয়েলই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর উদ্যোগ নেন।

গত ২৮ জুন খুলনা ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পর ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার জন্য তিনি তৎপরতা শুরু করেন বলে সূত্রের দাবি। তবে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে।

পরে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবিরের মাধ্যমে ফিরোজ শাহকেও দায়িত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করেন জুয়েল। শেষ পর্যন্ত এখন ওই প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

তবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, ‘পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এখানে আমার কিছু বলার নেই।’

রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে অবস্থা আরও নাজুক হবে

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যর্থতা, বিল ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ সব মিলিয়ে ওয়াসা অর্থব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটিকে সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।’

অন্যদিকে, আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাইরে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্যও জানা যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতির দায়ে পদাবনতি, এবার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম জুয়েল

দুর্নীতির দায়ে পদাবনতি, এবার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম জুয়েল

আপডেট সময় ১০:১৫:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ভবন নির্মাণে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় শাস্তি হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয়েছিল তাঁর। একই ঘটনায় চার বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত না হওয়া ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগেও তাঁকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তদবির বাণিজ্য ও বিভিন্ন দপ্তরে হস্তক্ষেপের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে চিঠিও দিয়েছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল। বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুলনা ওয়াসায় বদলি হয়ে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে যোগ দেন তিনি। এবার দুই দফায় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের পর ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের (ফেজ-২) পরিচালকের দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি।

ভবন নির্মাণে অনিয়ম, হয়েছিল পদাবনতি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর হাঁটাচলার সময় ভবনটিতে কম্পন অনুভূত হতে থাকে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটি ভবনের ছাদের চারটি স্থানে স্ল্যাব কেটে পরীক্ষা করে বড় ধরনের অনিয়ম দেখতে পায়।

তদন্তে দেখা যায়, নকশা অনুযায়ী ছাদে কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা ছিল মাত্র ৩ ইঞ্চি, আবার কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি। এতে ভবনের স্থায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়, ছাদ ঢালাইয়ের সময় আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে ফিরে অনুপস্থিতিকালীন নির্মাণকাজের এমবি (মেজারমেন্ট বুক) যাচাই না করেই তাতে স্বাক্ষর করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে সহযোগিতা করেন তিনি।

নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অনিয়মে বাধা না দেওয়া এবং ঠিকাদারের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ওই ঘটনায় সাতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয় এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়।

শাস্তি বাতিল, পদোন্নতি ও প্রেষণ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও অ্যাবের সদস্য বলে জানা গেছে।

একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আগের শাস্তি বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে খুলনা ওয়াসায় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রেষণে পাঠানো হয় তাঁকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা হিসেবে এটিই প্রথম।

মহানগর বিএনপির চিঠিতেও অভিযোগ

একাধিক সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপ শুরু করেন জুয়েল। এ নিয়ে নানা অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৫ সালের ২৬ জুন অ্যাবের সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

চিঠিতে বলা হয়, ‘গত ৭/৮ মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ আসছে, দলের পদ ব্যবহার করে আরিফুল ইসলাম জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি, নিয়োগ-পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেবেন বলে তদবির করছেন। এতে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

চিঠিতে তাঁর অ্যাবের সাধারণ সম্পাদক পদ বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরিফুল ইসলাম জুয়েল। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও শাস্তি দেওয়া হয়। অভ্যুত্থানের পর সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও আমাকে পদোন্নতি দিয়ে ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।’

কর্মস্থলে অনিয়মের অভিযোগ

আরিফুল ইসলাম জুয়েলের আগের কর্মস্থল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়া ও সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সময়ে তিনি একাধিকবার শোকজ পেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে ৫৪ দিনই তিনি দেরিতে অফিসে উপস্থিত হন। এর মধ্যে ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন। গড়ে প্রতিদিন ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন বলে ওই রেকর্ডে দেখা যায়। এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ তাঁকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পরও তিনি নিয়মিত কার্যালয়ে যান না এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

দুই দফায় বদল, এবার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে জুয়েলই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর উদ্যোগ নেন।

গত ২৮ জুন খুলনা ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পর ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার জন্য তিনি তৎপরতা শুরু করেন বলে সূত্রের দাবি। তবে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে।

পরে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবিরের মাধ্যমে ফিরোজ শাহকেও দায়িত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করেন জুয়েল। শেষ পর্যন্ত এখন ওই প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

তবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, ‘পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এখানে আমার কিছু বলার নেই।’

রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে অবস্থা আরও নাজুক হবে

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যর্থতা, বিল ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ সব মিলিয়ে ওয়াসা অর্থব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটিকে সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।’

অন্যদিকে, আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাইরে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্যও জানা যায়নি।