ঢাকা ০৬:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঝালকাঠীতে নবগঠিত যুব রেডক্রিসেন্ট কমিটির শুভেচ্ছা বিনিময় নওগাঁ-নাটোর আঞ্চলিক মহাসড়কে দুটি পুলিশ চেকপোস্টের কার্যক্রম উদ্বোধন বৃদ্ধাকে মারধর, ঘর ভাঙচুর ও টাকা-স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ কালিহাতীতে ছিনতাইকারীদের হামলায় ট্রাকচালক নিহত, আটক ১ শাহজালালে পৃথক অভিযানে ১৩.৮৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার ‘তথ্য দিন, অপরাধ দমনে ব্যবস্থা নেব’-তারাগঞ্জের নবাগত ওসি ইজার উদ্দিন কলাগাছিয়ায় মহিষ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ শিবগঞ্জ সীমান্তে ৪০ ভারতীয় চোরাই মোবাইলসহ যুবক আটক কর্মসংস্থান প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ, তালিকায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী পতেঙ্গা সৈকতে পার্কিংয়ের নামে চাঁদাবাজি, বিএনপি নেতা ও টিআই সেলিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

কর্মসংস্থান প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ, তালিকায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, অপচয় ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নেওয়া এই কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য এবং অন্য জেলার বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রশিক্ষকের সম্মানী, মাঠকর্মীদের বেতন এবং বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের দেখানো হয়েছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশালসহ বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়। এ ছাড়া ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে প্রশিক্ষণার্থী দেখানো এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাত ও অপচয়ের অভিযোগে আদালতে মামলাও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তিন জেলায় শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২৯২ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশাল—এই চার উপজেলায় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয়ের মধ্যে অনিয়ম ও অপচয় হয়েছে। গৌরীপুরে প্রায় ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৪৭ কোটি টাকা, হালুয়াঘাটে ৩৭ কোটি, ফুলবাড়িয়ায় ৪৪ কোটি এবং ত্রিশালে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থের কত অংশ প্রকৃতপক্ষে আত্মসাৎ হয়েছে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ

ত্রিশাল উপজেলায় কর্মসূচির অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে ভুয়া ব্যাংক হিসাব ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায় এবং সরকারি কোষাগারে ৫৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

পরবর্তীতে ত্রিশাল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আবু জুলহাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং তাকে হালুয়াঘাট উপজেলায় বদলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একই দিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য দেখানো হয়েছে। অথচ এসব স্থানের মধ্যে কয়েকশ কিলোমিটার দূরত্ব থাকায় নির্ধারিত সময়ে একজন প্রশিক্ষকের পক্ষে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকা বাস্তবে সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

ভুয়া ক্লাস দেখানোর অভিযোগ

অভিযোগপত্রে ময়মনসিংহের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষকের নামে বিপুলসংখ্যক ক্লাস দেখানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের নামে ত্রিশাল উপজেলায় ৪৫২টি ক্লাস, সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর নামে ৪৩৪টি, জোয়াহের আলী মিয়ার নামে ৪৩৪টি এবং আবু জুলহাসের নামে ৮৩৩টি ক্লাস দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা একাডেমি সুপারভাইজার সাহানা আক্তারের নামে ৪২০টি, চিকিৎসক ওয়াজিদ আহমেদের নামে ৬৬৮টি, উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সপেক্টর মতিউর রহমানের নামে ৫৪৮টি, ত্রিশাল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সাবিনা ইয়াসমিনের নামে ৬৬৮টি এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক বদরুজ্জামান ফকিরের নামে ৭০০টি ক্লাস দেখানোর তথ্য অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ক্লাসের বিপরীতে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এ দাবির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত বেকার যুবক-যুবতীদের পরিবর্তে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ত্রিশালে ১৯৫ জন, ফুলবাড়িয়ায় ২১২ জন, হালুয়াঘাটে ৮৮ জন এবং ফুলপুর-তারাকান্দায় ৩২০ জনকে কর্মসূচির আওতায় দেখানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিবর্তে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগও রয়েছে।

আদালতে মামলা

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ এবং সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে মামলা করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলায় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার উপসহকারী আনিসুর রহমান ও শাহজাহানকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সাবেক উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সরেজমিনে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জেলা প্রশাসন ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেন বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন প্রশ্ন

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে দুটি চিঠি দেওয়া হয় এবং তাকে প্রতিবেদনসহ সচিবের দপ্তরে তলব করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে তদন্ত প্রতিবেদন হারিয়ে যাওয়া এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির পটভূমি

বেকার যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কর্মসূচির আওতায় বেকার যুবক-যুবতীদের তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুই বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে প্রতিদিন ১০০ টাকা ভাতা এবং চাকরিতে যোগদানের পর মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় ১৩ বছরে এ কর্মসূচিতে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং ভুয়া প্রশিক্ষণ দেখানোর মাধ্যমে কর্মসূচির অর্থের একটি অংশ অপচয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগে ময়মনসিংহের সাবেক সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সহকারী পরিচালক মো. জোয়াহের আলী মিয়া, গৌরীপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নন্দন কুমার দেবনাথ, ত্রিশাল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আবু জুলহাস, ফুলবাড়িয়া উপজেলার সাবেক যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আবেদনে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাত ও অপচয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

অভিযোগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও কর্মসূচির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও তদন্ত প্রতিবেদন সংক্রান্ত বিষয়ে যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে তদন্ত প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট সচিবের দপ্তর থেকে গায়েব হয়ে যায় এবং এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথা একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে। তবে সূত্রটির পরিচয় বা দাবির স্বাধীন প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

বক্তব্য মেলেনি

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আবেদনে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার নম্বর ০১/২০২৩।

অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অভিযুক্ত প্রত্যেকের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অনিয়ম হয়ে থাকলে তার পরিমাণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝালকাঠীতে নবগঠিত যুব রেডক্রিসেন্ট কমিটির শুভেচ্ছা বিনিময়

কর্মসংস্থান প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ, তালিকায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী

আপডেট সময় ০৫:১৭:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, অপচয় ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নেওয়া এই কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য এবং অন্য জেলার বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রশিক্ষকের সম্মানী, মাঠকর্মীদের বেতন এবং বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের দেখানো হয়েছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশালসহ বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়। এ ছাড়া ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে প্রশিক্ষণার্থী দেখানো এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাত ও অপচয়ের অভিযোগে আদালতে মামলাও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তিন জেলায় শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২৯২ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশাল—এই চার উপজেলায় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয়ের মধ্যে অনিয়ম ও অপচয় হয়েছে। গৌরীপুরে প্রায় ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৪৭ কোটি টাকা, হালুয়াঘাটে ৩৭ কোটি, ফুলবাড়িয়ায় ৪৪ কোটি এবং ত্রিশালে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থের কত অংশ প্রকৃতপক্ষে আত্মসাৎ হয়েছে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ

ত্রিশাল উপজেলায় কর্মসূচির অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে ভুয়া ব্যাংক হিসাব ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায় এবং সরকারি কোষাগারে ৫৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

পরবর্তীতে ত্রিশাল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আবু জুলহাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং তাকে হালুয়াঘাট উপজেলায় বদলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একই দিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য দেখানো হয়েছে। অথচ এসব স্থানের মধ্যে কয়েকশ কিলোমিটার দূরত্ব থাকায় নির্ধারিত সময়ে একজন প্রশিক্ষকের পক্ষে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকা বাস্তবে সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

ভুয়া ক্লাস দেখানোর অভিযোগ

অভিযোগপত্রে ময়মনসিংহের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষকের নামে বিপুলসংখ্যক ক্লাস দেখানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের নামে ত্রিশাল উপজেলায় ৪৫২টি ক্লাস, সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর নামে ৪৩৪টি, জোয়াহের আলী মিয়ার নামে ৪৩৪টি এবং আবু জুলহাসের নামে ৮৩৩টি ক্লাস দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা একাডেমি সুপারভাইজার সাহানা আক্তারের নামে ৪২০টি, চিকিৎসক ওয়াজিদ আহমেদের নামে ৬৬৮টি, উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সপেক্টর মতিউর রহমানের নামে ৫৪৮টি, ত্রিশাল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সাবিনা ইয়াসমিনের নামে ৬৬৮টি এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক বদরুজ্জামান ফকিরের নামে ৭০০টি ক্লাস দেখানোর তথ্য অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ক্লাসের বিপরীতে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এ দাবির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত বেকার যুবক-যুবতীদের পরিবর্তে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ত্রিশালে ১৯৫ জন, ফুলবাড়িয়ায় ২১২ জন, হালুয়াঘাটে ৮৮ জন এবং ফুলপুর-তারাকান্দায় ৩২০ জনকে কর্মসূচির আওতায় দেখানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিবর্তে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগও রয়েছে।

আদালতে মামলা

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ এবং সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে মামলা করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলায় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার উপসহকারী আনিসুর রহমান ও শাহজাহানকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সাবেক উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সরেজমিনে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জেলা প্রশাসন ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেন বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন প্রশ্ন

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে দুটি চিঠি দেওয়া হয় এবং তাকে প্রতিবেদনসহ সচিবের দপ্তরে তলব করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে তদন্ত প্রতিবেদন হারিয়ে যাওয়া এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির পটভূমি

বেকার যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কর্মসূচির আওতায় বেকার যুবক-যুবতীদের তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুই বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে প্রতিদিন ১০০ টাকা ভাতা এবং চাকরিতে যোগদানের পর মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় ১৩ বছরে এ কর্মসূচিতে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং ভুয়া প্রশিক্ষণ দেখানোর মাধ্যমে কর্মসূচির অর্থের একটি অংশ অপচয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগে ময়মনসিংহের সাবেক সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সহকারী পরিচালক মো. জোয়াহের আলী মিয়া, গৌরীপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নন্দন কুমার দেবনাথ, ত্রিশাল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আবু জুলহাস, ফুলবাড়িয়া উপজেলার সাবেক যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আবেদনে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাত ও অপচয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

অভিযোগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও কর্মসূচির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও তদন্ত প্রতিবেদন সংক্রান্ত বিষয়ে যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে তদন্ত প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট সচিবের দপ্তর থেকে গায়েব হয়ে যায় এবং এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথা একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে। তবে সূত্রটির পরিচয় বা দাবির স্বাধীন প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

বক্তব্য মেলেনি

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আবেদনে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার নম্বর ০১/২০২৩।

অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অভিযুক্ত প্রত্যেকের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অনিয়ম হয়ে থাকলে তার পরিমাণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।