চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের সুপারিশ এক মাসের বেশি সময় পরেও কার্যকর হয়নি। এখনো বহাল রয়েছেন এস এম মনিরুজ্জামান। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ইজারার নামে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিক সংগঠনের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করে আসছেন। গত ১৬ আগস্ট তাঁকে নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে নিয়ে নতুন একজনকে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান করার সুপারিশের পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে দীর্ঘ এক মাস পরেও চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন শ্রমিক নেতারা। তাঁদের প্রশ্ন, মনিরুজ্জামানের খুঁটির জোর কোথায়?
জানা গেছে, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির সে সময়কার ভিসি রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রস্তাব দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রেষণে এ নিয়োগের বিষয়ে মতামত দিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতামত ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত ১৬ আগস্টের চিঠিতে ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে প্রেষণে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চিঠির সংযুক্ত তালিকায় প্রস্তাবিত পদ হিসেবে ‘চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম’ এবং নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়’ উল্লেখ করা হয়। এ নিয়োগের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের বদলি বিষয়ে কোনো আদেশ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বন্দরের সচিব।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের শীর্ষ নেতাসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন আন্দোলনে নামে। বন্দর রক্ষা পরিষদ, চট্টগ্রামের নেতারা বন্দর ইজারার নামে বিদেশিদের হাতে বন্দরের স্থাপনা তুলে দিতে বর্তমান চেয়ারম্যানের অতিউৎসাহী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি করে আসছেন। তবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় শ্রমিক নেতারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
এনসিটি ইজারার বিরোধিতা করে বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও ধর্মঘটের সময় কয়েক দিন চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সময়ে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আন্দোলন চলাকালে শ্রমিক নেতাদের গণহারে বদলি ও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনায় বন্দর চেয়ারম্যানকে দায়ী করেন শ্রমিক নেতারা।
এদিকে, এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে চীন থেকে জাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যভর্তি প্রায় ২৫০ কনটেইনার গায়েবের ঘটনাও ঘটে। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে নথিপত্র যাচাই শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনিয়ম ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমে ইতিমধ্যে বেশ কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকে আসা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং প্রকল্পসহ বন্দরের বিভিন্ন টেন্ডারে অনিয়ম করা হয়েছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং প্রকল্প-সংক্রান্ত অনুমোদনপত্র, আর্থিক বরাদ্দ, টেন্ডার ও চুক্তির নথিপত্রসহ এস এম মনিরুজ্জামান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য তলব করা হয়। তবে এসব বিষয়ে এস এম মনিরুজ্জামানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















